জাহিরুল হাসান
লালপরি নীলপরি • নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর শিশুসাহিত্য বিশেষ সংখ্যা • সম্পাদক আসরফী খাতুন • ৩০০ টাকা

কে যেন বলেছিলেন, ‘‌কবিতা বোঝার নয়, বাজার’‌— এবং সেই থেকে কথাটা চালুও হয়ে গেছে। আর, যেন এই যুক্তিতেই পাঠকের মাথায় ঢুকুক বা না–‌ই ঢুকুক, অপাঠ্য দুর্বোধ্য কবিতা লিখে চলেছেন অনেকে। কী হয় এ সব লিখে!‌ নব্বইয়ের দশকে একটা সিলিং ফ্যানের বিজ্ঞাপন খুব দেখতাম— সেটা নাকি বিশেষ একটি প্রযুক্তিতে চলে!‌‌ কিন্তু ‘‌বিশেষ প্রযুক্তি’‌টি যে কী তা কোথাও লেখা থাকত না। এই নিয়ে বিজ্ঞাপনে একটা কৌতুকও ছিল। যেন কেউ খুব বোকা প্রশ্ন করেছেন, ওটা কী?‌ অমনি পেছন থেকে একদল মানুষ আঙুল তুলে, আরে, এ এই জিনিসটাও জানে না!‌ তা–‌ই হয়, কবিতা না বুঝলে বিনা প্রশ্নে পাতা উল্টে যান পাঠক। প্রশ্ন করলে পাছে অজ্ঞতা ধরা পড়ে!‌ কিন্তু বাংলা সাহিত্যে যেসব কবি শ্রেষ্ঠর মর্যাদা পেয়েছেন, তাঁরা সকলেই কবিতা লেখেন সহজ ভাষায়, তার মধ্যেই শিল্পনৈপুণ্য, ব্যঞ্জনা এ সবও থাকে। অর্থাৎ তাঁদের কবিতা বোঝারও, বাজারও। বয়সে খুবই প্রবীণ কবিদের অন্যতম নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতাও সেই শ্রেণির। তাঁর নানা পরিচয়— কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, শিশুসাহিত্যিক, ভ্রমণলেখক, ছান্দসিক, বানানবিশারদ, সম্পাদক, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির প্রাক্তন সভাপতি ইত্যাদি। মানুষ হিসেবেও সুরসিক, আড্ডাপ্রিয়, আবার সেই সঙ্গে জায়গা মতো অনমনীয় এবং গুরুগম্ভীর।
২০১৭ সালে তাঁকে নিয়ে বিশেষ সংখ্যা করেছে দুটি পত্রিকা। অনেক সময় দেখা যায় বিশেষ সংখ্যাতেও মূল বিষয়ের সঙ্গে বিষয়–‌বহির্ভূত প্রচুর লেখা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু নীরেন্দ্রনাথকে নিয়ে এই সংখ্যা দুটিতে তা ঘটেনি। বিষয় হিসেবে নীরেন্দ্রনাথের এমনই গুরুত্ব। আসরফী খাতুন সম্পাদিত ‘‌লালপরি নীলপরি’‌ ওই দুই পত্রিকার একটি এবং এই আলোচনার লক্ষ্য। এর ৪২২ পৃষ্ঠার ৩৮১ পৃষ্ঠাই নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর শিশুসাহিত্য নিয়ে। পত্রিকাটিও শিশুসাহিত্য বিষয়ক। এর প্রকাশস্থল বর্ধমান শহর। পত্রিকায় পাঠানো শুভেচ্ছাবার্তাতে কবি জানিয়েছেন, তিনি বড়দের জন্য যত কবিতা লিখেছেন, ছোটদের জন্য ছড়া তার চেয়ে কিছু কম লেখেননি। শুধু তো ছড়া নয়, শিশু–‌কিশোরদের জন্য গল্প, রহস্যকাহিনী, এ সবও বিস্তর লিখেছেন।

পত্রিকার বিভিন্ন অংশে স্থান পেয়েছে নীরেন্দ্রনাথ সম্পর্কে তাঁর আপনজন ও ঘনিষ্ঠদের ব্যক্তিগত গদ্য, তাঁর লেখা সম্পর্কে বিভিন্ন জনের মূল্যায়ন, তাঁকে কেন্দ্র করে ছড়া ও কবিতা, ছবি, সাক্ষাৎকার ও গ্রন্থপঞ্জি এবং তাঁর নিজের ‘‌বিলুর ভাবনা’‌ বইটির পুনর্মুদ্রণ। এই সঙ্গে লেখক অনুমোদিত সংক্ষিপ্ত জীবনী ও জীবনপঞ্জি দেওয়া দরকার ছিল। এগুলি থাকলে পরে খুব মূল্যবান প্রমাণিত হয়। সংখ্যাটি শিশুসাহিত্য বিষয়ক তাই এখানে সেটা হয়ত মানাত না, কিন্তু অন্যত্র প্রকাশিত সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের গদ্য ‘‌নীরেনদা’‌র প্রথম দুটি লাইন পড়লে বোঝা যায় এই আপাতগম্ভীর মানুষটির মধ্যে লুকিয়ে আছে একটি শিশু। যাঁরা বড় হয়েও শিশুমনকে বাঁচিয়ে রাখেন, তাঁরাই বড় শিল্পী হতে পারেন। সিরাজ লিখেছেন, ‘‌এক জ্যোৎস্নার রাতে পুনে শহরের প্রান্তে মূলামুঠা নদীর তীরে নীরেনদার সঙ্গে নেচে নেচে কোরাস গেয়েছিলাম মনে পড়লেই নিজেকে বলি, যাঃ কী বাজে বকছিস?‌’‌
আলোচ্য সংখ্যায় লেখকপুত্র ও স্বয়ং লেখক কৃষ্ণরূপ চক্রবর্তী তাঁর পিতার একটি অন্তরঙ্গ আলেখ্য রচনা করেছেন। একসময় তাঁরা থাকতেন টালা পার্ক অঞ্চলে। তখন এত নামী–নামী লেখক সেখানে থাকতেন যে, সেটা প্রায় এক লেখক–কলোনিই ছিল। লেখকেরা সাধারণত লেখকদের সঙ্গেই আড্ডা দিতে বেশি ভালবাসেন এবং বড় লেখকদের ঘিরে একটা আড্ডার গোষ্ঠীও গড়ে ওঠে। এ ব্যাপারে নীরেন্দ্রনাথ কিছুটা পৃথক। তিনি লেখক এবং অলেখক সকলের সঙ্গেই মেশেন। টালা ছেড়ে বাঙ্গুরে আসার পর তাঁর দ্বিতীয় সঙ্গটাই বেড়েছে!‌ কৃষ্ণরূপের এই লেখাটি ভবিষ্যৎ–নীরেন–গবেষকদের জন্য সম্পদ হয়ে থাকবে।
প্রবন্ধ অংশে আছে মোট ৪৬ জনের লেখা। নীরেন্দ্রনাথ–রচিত শিশুসাহিত্যের নানা দিক নিয় আলোচনা করেছেন তাঁরা। ৪৬ জনের কারও আলোচনার বিষয় এক নয়। আলোচকদের মধ্যে বিষয়–বণ্টনের ক্ষেত্রে সুষ্ঠু পরিকল্পনার ছাপ আছে। সাক্ষাৎকারটি সংক্ষিপ্ত, সম্পাদক নিজেই নিয়েছেন। বিষয়ীর জীবনের কিছু মোটা মোটা ঘটনা, তারিখ জেনে নিয়েছেন তিনি। তবে কোনও অকথিত কাহিনী, বিরল তথ্য বা চমক নেই তাতে। গভীরভাবে নীরেন–চর্চা করেছেন এমন কাউকে সাক্ষাৎকার গ্রহণের দায়িত্ব দেওয়া উচিত ছিল। এটা অভিযোগ নয়, এত সুপরিকল্পিত একটি সংখ্যা বলেই প্রত্যাশাটাও বড়। আসরফী খাতুন নিজেও বাংলা সাহিত্যের গবেষক, বলা যায় গোটা কাজটি সেই মনোভাবেই করেছেন তিনি। তাঁকে অভিনন্দন।‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top