শান্তনু বসু: রবীন্দ্রনাথের গানের ভুবন • দীপান্বিতা সেন পারুল • ১৫০ টাকা
রবীন্দ্রসংগীতের পাঁচ জ্যোতিষ্ক 
দীপান্বিতা সেন • একুশ শতক • ১০০ টাকা
প্রবহমান বাংলা গান ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে স্পর্শ পায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। তাঁর ছোঁয়ায় নবরূপে সেজে উঠল বাংলা গান। গানের জগতে সংযোজিত হল আর এক ধারা— ‘‌রবীন্দ্রসংগীত’‌। বাংলার সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠতম সেই সম্পদ অর্থাৎ রবীন্দ্রসংগীতের প্রাসঙ্গিক প্রায় সব দিকের অন্তর্বলীন নানান তত্ত্বের সন্তোষজনক আলোচনার নব–সঙ্কলন পারুল প্রকাশনীর ‘রবীন্দ্রনাথের গানের ভুবন’। লিখেছেন দীপান্বিতা সেন।
এই গ্রন্থে আলোচনার শুরু হয়েছে ‘রবীন্দ্রসংগীতে বাণী ও সুরের মিলন মাধুরী’ দিয়ে। আর একেবারে শেষ পর্বে রয়েছে ‘রবীন্দ্রগানে মৃত্যুচেতনা’। মাঝের পর্বগুলিতে দীপান্বিতা আলোকপাত করেছেন ‘রবীন্দ্রসংগীতে পাশ্চাত্য প্রভাব’, ‘ধ্রুপদ অঙ্গের রবীন্দ্রসংগীত’, ‘রবীন্দ্রসংগীতে তাল বৈচিত্র’, ‘রবীন্দ্রসংগীতে বাউলের প্রভাব’সহ নানা প্রয়োজনীয় ও আকর্ষণীয় বিষয় অভিমুখে। দীপান্বিতা ও তাঁর পরিশ্রমের প্রতি আশীর্বাদস্বরূপ বইয়ের শেষ তিনটি পর্ব সংশোধন করে দিয়েছেন কবি শঙ্খ ঘোষ। যা অবশ্যই এক পরম পাওয়া।
শঙ্করীপ্রসাদ বসু, সুচিত্রা মিত্র, সুবিনয় রায়, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ যশস্বীদের ভাললাগা এই বইয়ের শুরুতে শিক্ষাবিদ অরুণকুমার বসু বলেছেন, ‘এই গ্রন্থে কোনো অভিমতই আবিষ্কার নয়, সবই পূর্বজ্ঞাত তথ্যের উপস্থাপনা। সবই বিশেষজ্ঞের আলোচনার সারসংক্ষেপ। তবু সেগুলির বিন্যাসের মধ্যে নিহিত রয়েছে দীপান্বিতার নিজস্ব বিচার বুদ্ধি।’
কিছু মুদ্রণপ্রমাদ ও সর্বক্ষেত্রে সাধারণ পাঠকের রসসমৃদ্ধ না হলেও, শুধু কবির গান শুনে যাঁদের প্রাণ ভরে না, যাঁরা যেতে চান সেই গানের গভীরে, খুঁজতে চান গানের ওপারে দাঁড়িয়ে রয়েছেন যিনি সেই পরমকে, দীপান্বিতা সেনের ‘রবীন্দ্রনাথের গানের ভুবন’ গবেষণাগ্রন্থটি অবশ্যই তাঁদের জন্য।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানের নিজস্বতা এবং গায়কী নিয়ে যে অত্যন্ত চিন্তিত ও সজাগ ছিলেন, নানাভাবে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। তাঁর গানের বিকৃত গায়কী সম্পর্কে বলতে গিয়ে কখনও তিনি বলেছেন, ‘গায়কের কণ্ঠের উপর রচয়িতার জোর খাটে না, সুতরাং ধৈর্য ধরে থাকা ছাড়া অন্য পথ নেই।’ কখনো বলেছেন, ‘আমার গান যাতে আমার গান ব’লে মনে হয় এইটি তোমরা কোরো।’ কখনো আবার বলেছেন, ‘আমার গানে যাতে একটু রস থাকে, তান থাকে, দরদ থাকে ও মীড় থাকে, তার চেষ্টা করো।’ গান নিয়ে কবিগুরুর মনের এই অবস্থানকে একনিষ্ঠ ভাবে স্মরণ করে পরবর্তী সময়ে যে–সমস্ত শিল্পী রবীন্দ্রনাথের গানকে প্রাণিত করেছেন, দিয়েছেন মায়াময় রূপ;‌ রবীন্দ্রসঙ্গীতের জনপরিচিতির ক্ষেত্রে অনস্বীকার্য অবদান সমৃদ্ধ সেইরকমই পাঁচজন শিল্পী দেবব্রত বিশ্বাস, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবিনয় রায়, সুচিত্রা মিত্র ও দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়। রবীন্দ্রসংগীতের সুবিশাল জ্যোতির্মণ্ডলের এই মাত্র পাঁচ নক্ষত্রের জীবনকথা ও গুরুসম তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধানিবেদনের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে শিক্ষিকা ও সংগীত শিল্পী দীপান্বিতা সেনের আরও একটি বই ‘রবীন্দ্রসংগীতের পাঁচ জ্যোতিষ্ক’। মা ভারতী সেনের প্রেরণা ও উৎসাহেই তাঁর এই ভাবনার প্রকাশ।
‘তাঁদের উদ্দেশ্যে দীপান্বিতা সেন বিনম্র ভক্তি এবং কৃতজ্ঞতা উজাড় করে দিয়েছেন পাঁচটি রবীন্দ্রগীতির চরণকে কখনও পূর্ণ, কখনও–বা অপূর্ণভাবেও অবলম্বন করে। পাঁচটি শিরোনামেই তাঁর অনুভবের পূর্ণায়ত আত্মপ্রকাশ ব্যঞ্জিত হয়েছে। .‌.‌.‌আর প্রত্যক্ষে–পরোক্ষে এঁরা সবাই তাঁর ‘‌সুরের গুরু’‌ .‌.‌.‌সবার কাছেই তো তিনি দীক্ষিত। সবার কাছেই তাঁর ঋষিঋণ! দীপান্বিতার এই বই সেই ঋণেরই দলিলনামা।’ বইটির শুরুতে এমনটাই জানিয়েছেন সাহিত্যিক ও অধ্যাপক পল্লব সেনগুপ্ত। যদিও রবীন্দ্র–আকাশমণ্ডলে এই পঞ্চমুখ ছাড়া আর কেউ নেই বা তাঁদের প্রতি কোনো শ্রদ্ধা নেই এমনটি ঘোষণা করা যে এই গ্রন্থ বা গ্রন্থকারের অভিরুচি নয়— এ কথা ধরেই নেওয়া যায়।
রবীন্দ্রনাথের গান ও সেই গানের পাঁচজন বিশিষ্ট শিল্পীর জীবনগাথা সমৃদ্ধ দীপান্বিতা সেনের আলোচিত বই দুটি সুন্দর সর্বাঙ্গীন গঠন দিয়ে প্রকাশের জন্য ‘পারুল’ ও ‘একুশ শতক’ পাঠকদের ধন্যবাদ প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হবেন বলে মনে হয় না। ■

জনপ্রিয়

Back To Top