আকাশ বিশ্বাস
বঙ্কিমকে আক্ষেপ করে লিখতে হয়েছিল:‌ ‘.‌.‌.‌বাংলার ইতিহাস চাই, নহিলে বাঙ্গালার ভরসা নাই। কে লিখিবে? তুমি লিখিবে, আমি লিখিব, সকলেই লিখিবে.‌.‌.‌।’‌ 
নিঃসন্দেহে সে–দায়িত্ব বাঙালি পালন করেছে এবং করে চলেছে। যদুনাথ সরকার থেকে রণজিৎ গুহের মতো স্বনামধন্যরা যেমন করেছেন, করছেন, তুলনায় অনেক অল্পখ্যাত জন,  আঞ্চলিক ইতিহাসের বহু অনামা  বাঙালি লেখকও করে চলেছেন সেই একই কাজ। কথাগুলি উঠছে  কারণ , আমরা এমন একটা বই নিয়ে আলোচনা করছি যার নাম ‘বাংলা প্রকাশনার সেকাল ও একাল’ । লেখক মুকুল গুহ। 
বইটি লেখার কাজ শুরু সেই আশির দশকে। যখন এক পত্রিকার সাহিত্য বিভাগের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন মুকুলবাবু। ‘প্রাক্‌-কথন’-এ মুকুলবাবু জানিয়েছেন, ‘সেই সময় প্রতি সপ্তাহেই ‘আলাপ’ কিংবা ‘লেখার অন্দর’ ইত্যাদি বিষয়ে আমার লেখাগুলি পত্রিকাটিতে প্রকাশিত হতে থাকে। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই একই রকম বিষয়ে অন্যান্য পত্রিকাগুলিতেও আমার লেখা প্রকাশিত হয়। লেখাগুলি একত্রে সংকলন করে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করার ইচ্ছে আমার তখনই হয়েছিল।’‌ 
ইতিমধ্যে যেহেতু পেরিয়ে গেছে অনেকটা সময়; লেখকই বলছেন, ‘গ্রন্থটির পরিকল্পনায় কিছু কিছু পরিবর্তন করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। সেইসব পরিবর্তন করতে গিয়ে গ্রন্থটির সম্ভাব্য সূচির কিছুটা অদল বদল ঘটাতে হল।…সেইসূত্রে বৈদ্যুতিন মিডিয়ার প্রত্যক্ষ প্রভাবের কথাও বিষয়সূচিতে স্বাভাবিকভাবে চলে এল।’
ধরতে গেলে প্রায় চল্লিশ বছর ধরে লেখা এই বই। বাংলা প্রকাশনার অতীত থেকে বর্তমান। খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সেই অতীত; যখন কবি রচনা করতেন কাব্য আর কথকের, গায়েনের কণ্ঠ বা গলায় ভর করে যা পৌঁছে যেত শ্রোতার কানে। কিন্তু এই চিরন্তন ছবিটাই একদিন রাতারাতি পাল্টে গিয়েছিল শ্রীরামপুর মিশনারির হাত ধরে যেদিন মুদ্রণযন্ত্র এসে পৌঁছল এদেশে। যদিও আলোচ্য বইটির সূত্রেই জানতে পারছি, ‘ভারতে না এলেও পর্তুগিজ কলোনি গোয়াতে ছাপার যন্ত্র এসে পৌঁছল ১৫৫৬ সালে। তারও প্রায় ২২২ বছর পরে সেই ছাপার যন্ত্র পৌঁছল বাংলায়, ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বঙ্গদেশ দখল নেওয়ার ২১ বছর পর।’
কিন্তু সে যাই হোক–না–কেন এই  সূত্রেই সেদিন প্রথম সম্ভব হয়েছিল গদ্য রচনা। শ্রোতার পরিবর্তে জন্ম হয়েছিল পাঠকের, সাহিত্যের বাহন হিসেবে কথকঠাকুরের বদলে আর্বিভাব ঘটেছিল সাময়িক পত্র-পত্রিকা সমূহের। চণ্ডীমণ্ডপ নয় সাহিত্য হয়ে উঠেছিল দিগ্‌দর্শন, সমাচার দর্পণ-এর সম্পত্তি। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের পথচলা শুরু হয়ে গিয়েছিল এই সব সংবাদপত্র, সাময়িকপত্রকে ভর করেই—যেদিন প্রথম ছাপাখানার কলে মুদ্রিত হয়েছিল দিগ্‌দর্শন। আলোচ্য বইটি সেই সময় থেকে এসে পৌঁছেছে এই সময়ে। এই বই যতটা ইতিহাসের, ততটাই সমাজতত্ত্বের। শুধু বিবৃতি নয়, বক্তব্যও রেখেছে এখানে। 
সংযোজিত অংশটি ছাড়াও আরও সাতটি ভাগে বিভক্ত। তার মধ্যে বিবিধ উপপর্যায়ের ভাগ। লেখক সবিনয় বলতে চেয়েছেন, ‘বাংলা প্রকাশনার সেকাল ও একাল  গ্রন্থটি একটি প্রাথমিক দলিল হিসেবেই প্রস্তাবিত। একটি বিশেষ সময়কালের প্রতিচ্ছবি হিসেবে একে উপস্থাপন করাতেই আমার আগ্রহ ।’ 
লেখক বঙ্গীয় প্রকাশনার কালি ঝুলি মাখা কুঠুরিতেই আলো ফেলে গেছেন। ঊনবিংশ থেকে এই একবিংশ পর্যন্ত ইতিহাসের মূল পালাবদলের বিন্যাসটাকে ধরতে চেয়েছেন। হয়ে উঠেছেন ইতিহাসের লিপিকর।
একাধিক ছোট-ছোট নিবন্ধের সঙ্কলন এই বই কিন্তু সেখানে প্রথম প্রকাশের সময় উল্লেখ প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেইটুকু প্রয়োজন যদি অপূর্ণও থাকে পাঠকের তাতে কি প্রাসঙ্গিকতা হ্রাস পায় বইটির? পায় না। এক বিরাট সময়ের সমুদ্রকে সিন্ধুপ্রতিম পরিসরেই ধরতে চেয়েছেন লেখক। নয় দরজার দৃশ্যকে হস্তধৃত আমলকীর মতো ধরতে গেলে একটা মাধ্যম লাগে। লেখক মাধ্যম করেছেন ছাপাখানাকে। যে মাধ্যমে ভর করেই বস্তুত গোটা মধ্যযুগ পা বাড়ানোর সাহস পেয়েছিল আধুনিকের দিকে। ■
বাংলা প্রকাশনার সেকাল ও একাল • মুকুল গুহ 
সাহিত্যলোক • ৫৫০ টাকা

জনপ্রিয়

Back To Top