দেবাশিস দত্ত: নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। অগত্যা  নিজের কাছেই প্রশ্ন করেছিলেন, ঠিক শুনেছেন তো?‌ একটু আগে ১৭১ রানে ভারতের ইনিংস শেষ হয়েছে। তিনি আউট হয়েছেন শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে। বেঙ্কটেশ প্রসাদকে সঙ্গে নিয়ে প্রবেশ করেছিলেন এক নীরবতার চাদরে ঢাকা ড্রেসিংরুমে। এবার প্যাড খোলার পালা। কিন্তু, হঠাৎই কঁাধে পেলেন এক হাতের স্পর্শ, ‘‌প্যাড খুলো না। অস্ট্রেলিয়া আমাদের ফলো অন করাচ্ছে। তুমি যাবে তিন নম্বরে ব্যাট করতে।’‌ রাহুল দ্রাবিড়কে সরিয়ে তিন নম্বরে?‌ কোচ জন রাইটের এই কথাগুলোকে বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না।
তিন নম্বরে গিয়ে ২৮১ রানে অপরাজিত থেকে ভারতের সামনে হঠাৎই খুলে দিয়েছিলেন ম্যাচ জেতার চওড়া রাস্তা। সঙ্গে ছিলেন রাহুল দ্রাবিড়। এ সব ঘটনা আপনাদের জানা। এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরে গিয়েছেন যে, আমরা কোন টেস্টের আলোচনা পেশ করছি পাঠকের সামনে। ভিভিএস লক্ষ্মণের অবিস্মরণীয় ইনিংসের সহায়তায় ফলোঅন করে ম্যাচ জেতার যে অনন্য রেকর্ড তৈরি করেছিল সৌরভ গাঙ্গুলির ভারত, আমাদের কলকাতার ইডেনে, তা তো আমরা সবাই তারিয়ে তারিয়ে এখনও উপভোগ করি। ভিভিএস লক্ষ্মণও করেন। এ কথা তিনি নিজের বইয়ে স্বীকার করে নিতে দ্বিধাবোধ করেননি। প্রথম পরিচ্ছেদের শিরোনাম হল— যে ইনিংসটা আমার জীবনের গতিপথকে পাল্টে দিয়েছিল। এ কারণেই বইয়ের নামকরণ করেছেন যথাযথ ভঙ্গিতে— ‘‌281 and Beyond’‌‌।
৬৯৯ টাকা দামের এই বইয়ের প্রধান গুণ হল ঝরঝরে ইংরেজি এবং তিরতিরে গতি। কোনও ঝটাকসে ভাব নেই, নিজের ব্যাটিং ঘরানার মতো। শান্ত, নির্লিপ্ত ভঙ্গি। যেভাবে শীতের রোদের দুপুর বা গনগনে রোদের উত্তাপে নিজের ব্যাটকে তুলির মতো করে দুনিয়ার বিভিন্ন মাঠে বোলারদের অবহেলায় বাউন্ডারিতে পাঠিয়েছেন দিনের পর দিন, ঠিক সেভাবেই নিজের কলমকে ব্যবহার করেছেন লক্ষ্মণ আলতো স্পর্শে। তাড়াহুড়োর বালাই নেই। গল্প বলার ভঙ্গিতে লিখে গেছেন শব্দের পর শব্দ। এবং প্রায় প্রতি পরিচ্ছেদেই সযত্নে তুলে ধরেছেন নানা চমৎকার অকথিত কাহিনী। পড়তে ভাল লাগবেই। শচীন–‌সৌরভদের জমানায় বহু ম্যাচ জিতিয়েছেন একেবারে লক্ষ্মণসুলভ ভঙ্গিতে। তবু থেকে গিয়েছিলেন একটু যেন পেছনের সারিতেই। যদিও ফ্যাব ফাইভের কথা যখন ওঠে, তিনিও থাকেন সেই তালিকায়। পেছনে থাকলে কী হবে, ওই সময়ের নানা কাহিনী যে তিনি নিজের মনের নোটবুকে তুলে রেখেছিলেন সযত্নে যা তিনি নিজের বইয়ে লিখে পাঠকদের মন জয় করে নিচ্ছেন। সব সম্পাদক বলে থাকেন, গল্প চাই, গল্প। অন্তর্নিহিত গল্প। অন্দরমহলের অজানা কাহিনী চাই। ভিভিএস লক্ষ্মণ এই বইয়ে কিন্তু বিতর্কিত বিষয়গুলিকে চমৎকারভাবে ছঁাকনিতে বাদ রেখে যে মজার গল্পগুলি তুলে এনেছেন, তা পড়তে, জানতে ভাল লাগতে বাধ্য। একটি উদাহরণ। তঁার ২৮১ রানের ইনিংসের পর বীরেন্দ্র শেহবাগ তঁাকে বলেছিলেন, ‘‌সেবার ইডেন টেস্টের শেষ দিনে সকালে যে ১ ঘণ্টা ব্যাট করেছিল ভারত, তাতে লক্ষ্মণের উচিত ছিল ৩০০ রান করে ফেলা।’‌ (বীরু যোগ করেছিলেন যে, তিনিই প্রথম ভারতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে ট্রিপল সেঞ্চুরি করবেন। করেওছিলেন।)‌। লক্ষ্মণ ওই ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বইয়ে লিখেছেন:‌ ‘‌অবাক হয়ে গিয়েছিলাম বীরুর ওই কথা শুনে। যে ছেলেটা সবে ভারতীয় দলে এসেছে, তার মুখে কিনা প্রথম ভারতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে তিনশো রান করার কথা!‌’‌
ভিভিএস বীরুর ওই কথাটা যে শুধু মনে রেখেছেন তা নয়, স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, ‌আবার যদি ওইরকম পরিস্থিতিতে ব্যাট করতে হয়, তা হলেও তিনি নিজের ট্রিপল সেঞ্চুরির কথা না ভেবে পরিস্থিতি অনুযায়ী যেভাবে ব্যাট করা উচিত, তা–‌ই অনুসরণ করবেন। নিজের জীবনকে চমৎকারভাবে বিশ্লেষণ করার সঙ্গে সঙ্গে আমরা কিন্তু এই বইয়ে লক্ষ্মণের জীবনদর্শনের প্রতিফলনও দেখতে পাই।
পুনশ্চ:‌ সুদর্শন চেহারা। মিষ্টি মুখ। কিন্তু প্রচ্ছদে দেখা যাচ্ছে গালে তিন–‌চারদিনের না–‌কামানো দাড়ি, এমনকি গেঁাফের রেখাও। প্রচ্ছদের ছবিতে কি ঝকঝকে গাল দেখানো যেত না?‌ হায়দরাবাদের বাড়ি থেকে এই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বইয়ের লেখক বলে উঠলেন, ‘‌পাবলিশার চেয়েছে, কভারে যেন এমন ছবি থাকে, যাতে কিনা প্রাক্তন ক্রিকেটারের ছাপ থাকে। তাই সচেতনভাবেই ক’‌দিন দাড়ি রেখে ওই ছবি তোলা হয়েছিল।’‌ পাবলিশার চাইলে আপনি, আমি বা লক্ষ্মণ নিজে, কী–‌ই বা করতে পারেন!‌‌‌ ■
টু এইট্টি ওয়ান অ্যান্ড বিয়ন্ড • ভিভিএস লক্ষ্মণ
ওয়েস্টল্যান্ড স্পোর্ট • ৬৯৯ টাকা‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top