অরূপ বসু: ঢোঁড়াই হয়েছিল বেশ মোটাসোটা। রংটাও মাজা মাজা। তার মাকে বাপ বলত বুঝলি বুধনি;‌ এই ছোঁড়া বড় হয়ে রামায়ণ পড়তে শিখবে, দশ জনকে শোনাবে। ধাঙরটুলি, মরগামা কত দূর দূর থেকে লোক আসবে খাজনার রসিদ পড়াতে.‌.‌.‌।
বলা হয়, তুলসীদাসের রামচরিত মানস ভারতবর্ষে সবচেয়ে বেশি পঠিত বই। রামচরিত্রও মানস সরোবরের ন্যায় বিশাল। 
ঢোঁড়াই চরিত্র নিম্নবর্গের মানুষের কাছে যেন মানস সরোবরের মতো বিশাল। 
কংগ্রেস কর্মী, প্রশাসনের দক্ষ চাকুরে, বাবু ভাইয়াদের একজন দরদি মানুষ সতীনাথ ভাদুড়ী সেই বাংলার প্রান্তিক মানুষের জীবনগাথা লিখেছেন— ঢোঁড়াই চরিত মানস।
স্বাধীনতার তিরিশ বছর আগে সতীনাথ যেখানে যা দেখেছেন, স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরেও সেখানে সেরকমই দেখেছি। পূর্ণিয়ায় সতীনাথের বসতবাড়ি কুঁয়োতলার কিছুটা বদলে গেছে মাত্র। 
যে পটভূমিতে লেখা রাম চরিত মানস প্রায় সে পটভূমিতেই লেখা ঢোঁড়াই চরিত মানস। ঢোঁড়াইয়ের আদিকাণ্ড এরকম.‌.‌.‌ অযোধ্যাজি নয় এখনকার জিরানিয়া। রাম চরিতে লেখা আছে ‘‌জীর্ণারণ্য’‌ তখনও যা ছিল এখনও তাই। বালিয়াড়ি জমির ওপর ছেঁড়াছেঁড়া কুলের জঙ্গল। রেলগাড়ি ইস্টিশানে পৌঁছবার আগে ঘুমন্ত যাত্রীদের ঠেলে তুলে দিয়ে লোকে বলে জঙ্গল আগেয়া। জিরানিয়া আগেয়া। তাঁতমাটুলির লোকেরা একেই বলে টৌন। শহরের বাবু ভাইয়ারা সব বাঙ্গালি–‌ওকিল, মুখতার, ডক্টর।
জিরানিয়া আর তাঁতমাটুলির মধ্যে কোনও গাঁ নেই। টুলির পশ্চিমে শিমুল গাছ ভরা বকরহট্টার মাঠ, তারপর ধাঙরটুলি, দক্ষিণে মজা নদী, কারাকোশী। মাঠের বুক চিরে কোশী শিলিগুড়ি রোড। লোকেরা বলে পাক্কি।
তাঁতমারা জাতে তাঁতি। কেউ কোনও দিন তাঁত বুনতে দেখেনি। একবেলার বেশি খেতে চায় না। দ্বারভাঙা জেলায় সেটুকুও জোটেনি বলেই তো ধন্না দিয়েছিল ফুকন মণ্ডলের কাছে। অসুখে–বিসুখে রোজা বা গুনিনের কাছে যায়। রোজগার বলতে ঘরামির কাজ ও কুঁয়োর বালি ছেঁচা।
জিরানিয়ার বেশিরভাগ বাড়িতে খোলার চাল, কুঁয়ো। লেখাপড়া জানে না কিন্তু রামায়ণের নজির মুখে মুখে।
এই সমাজ, সময় থেকেই উঠে এসে ঢোঁড়াই একদিন গান্ধীর ডাকে স্বদেশিতে নাম লেখাল।
তারপর নানা ঘাট ঘুরে–ফিরে এল মাটির টানে। বাবুলালের পাক্কা বাড়ির উত্তরাধিকার তার। ঢোঁড়াইয়ের কিন্তু সেদিকে মন নেই। এসডিও সাহাবের কাছে সালেন্ডার করতে চলেছে ঢোঁড়াই। বগলে কম্বলে মোড়া রামায়ণ।
২০০৪ সালের কথা। বিহারের রাজনৈতিক নির্বাচনী পটভূমি বুঝতে হাটে–বাজারে এক্সপ্রেসে চড়ে কাটিহারে যখন নামলাম, তখন ভোর।
শুনলাম কাছেই পূর্ণিয়া। সেখানে সতীনাথ ভাদুড়ীর ভিটেবাড়ি। 
পূর্ণিয়ায় এই বাড়ি বানিয়েছিলেন। সতীনাথের বাবা কৃষ্ণনগরের ভিটে ছেড়ে এসে। পেশায় আইনজীবী, ছেলেকেও আইনজীবী করার জন্য পাটনায় পড়িয়েছিলেন। সেই যখন রেল লাইনের হাত ধরে হিন্দিভাষী ভারতে নানা পেশার বাঙালির অভিযান চালাল তখন থেকে সতীনাথের পরিবার পূর্ণিয়ায়। তুলসীদাসের রামায়ণ যেখানে, মহাত্মা গান্ধীর রামরাজ্যও সেখানে। এখানেই ১৯০৬ সালের সেপ্টেম্বরে সতীনাথের জন্ম। মৃত্যু ১৯৬৫ সালের মার্চে। সতীনাথ গান্ধীর ডাকে কংগ্রেসে যোগ দেন। বিয়াল্লিশের আন্দোলনে শামিল হন। তাঁর ঢোঁড়াই গান্ধী বাওয়ার ডাকে বেরিয়ে পড়ে। ’‌৪২–‌এর আন্দোলনে শামিল হয়। তারপর একদিন হতাশ হয়ে আপন দেশে ফিরে আসে। এসডিও সাহাবের কাছে সালেন্ডার করতে যায়। তাঁতমাটুলির চোখে তখন সে কংগ্রেসের কায়ার। তাঁতমাটুলিতে আজও ঢোঁড়াইয়ের নামে মন্দির আছে। লোকে পুজো দেয়।
সতীনাথের ধ্যানভূমির কুঁয়োতলার কাছে দাঁড়ালাম। মলিন লাল রঙের বাড়ি। শুনলাম বার বার বলা সত্ত্বেও অসুস্থ শরীর নিয়ে এই জায়গাটি ছেড়ে জ্ঞাতিদের কাছে চলে যাননি সতীনাথ। একদিন সকালে লোকে দেখে কুঁয়োতলায় অসুস্থ সতীনাথ পড়ে আছে।
কুঁয়োতলার কাছে একতলার বসার ঘর। এখানেই ছিল সতীনাথের লেখার টেবিল। শনি–রবির বিকেলে সাহিত্যের আড্ডা বসত। নিয়মিত আসতেন ফণীশ্বরনাথ রেণু। 
তাঁর লেখার ঘরে গিয়ে দাঁড়ালাম। একজন বললেন, এই সেই চেয়ার। আর একজন অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা বললেন— আমরা যখন তরুণ। এই ঘরে রবীন্দ্রজয়ন্তী উপলক্ষে সাহিত্য–আড্ডার আয়োজন। দুটো চেয়ার রাখা হযেছে। বাকিটা মাটিতে বসার ব্যবস্থা। সতীনাথ তখনও ঘরে আসেননি। ফণীশ্বর এলেন। অন্যদিনের মতোই মাটিতে বসতে যাচ্ছিলেন। আমরা বাধা দিলাম। বললাম, আজ তো দুটো চেয়ার রেখেছি। চেয়ারে বসুন।
ফণীশ্বরনাথ রেণু সোজা আমাদের দিকে তাকালেন। ধীরে ধীরে বললেন, এ ঘরে চেয়ারে বসেন সতীনাথ ভাদুড়ী। আমরা কি সেই উচ্চতায় বসতে পারি?‌‌‌‌‌‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top