অরূপ গঙ্গোপাধ্যায়
কমলকুমার ১০০ • ‌সম্পাদনা প্রশান্ত মাজী • প্রতিভাস • ৫০০ টাকা
তিনি দয়াময়ী • প্রশান্ত মাজী •‌ 
বৈ–‌চিত্র প্রকাশন • ২০০ টাকা
প্রশান্ত মাজীর সম্পাদনায় ‘‌প্রতিবিম্ব’‌ দীর্ঘদিন ধরে লিটল ম্যাগাজিন জগতে এক অন্য কণ্ঠস্বর। বিশেষত ৩০ বছর ধরে তাঁদের গভীর কমলকুমার চর্চা। পত্রিকার ‘‌কমলকুমার ১০০’‌ সংখ্যাটি সম্প্রতি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়ে ইতিমধ্যেই পাঠকমহলে সাড়া ফেলেছে।
বইটির প্রথম অংশে রয়েছে কমলকুমারের শেষ সাক্ষাৎকার (‌উষ্ণীষ পত্রিকার সৌজন্যে)‌। অগ্রন্থিত গল্প (‌‌কেরানীর জীবন‌, অমুদ্রিত শব্দকোষ চয়ন (‌যা আসলে শব্দ ও অর্থকে আদি ও প্রবহমান পরম্পরায় জুড়ে দেওয়া ও সজীব প্রান্তর থেকে আনা বিচিত্র অভিজ্ঞতালব্ধ আকর–সংগ্রহ)‌, ডায়েরির ছিন্ন পাতা, অপ্রকাশিত ও অগ্রন্থিত চিঠিপত্র, স্কেচ, শ্যাম নৌকা উপন্যাসের সংযোজিত অংশ, এমনকি নিজ হাতে স্কেচ করা ও হাতে লেখা বিবাহের কার্ড। আবার গ্রন্থের দ্বিতীয় অংশে বিষয়:‌ কমলকুমার যা তাঁর স্ত্রী দয়াময়ী ও অন্য অনুরাগীদের স্মৃতিচারণে, সমীক্ষায়, সৃজনশীল ভাবনায় পাঠকের কাছে এক অফুরান সম্পদ বলে মনে হয়। সাহিত্য, আর্ট, নাট্যভাবনা থেকে অঙ্কভাবনা পর্যন্ত।
কমলকুমারের সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে গৌতম ঘোষ জানান, ‘‌কমলদা, নিশ্চিতভাবে আমরা জানি আমাদের সাহিত্যের উঠোনে এক বিরল প্রজাতির অর্কিড।’‌ আবার বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের নিজস্ব অনুভব হল, কমলদা বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছেন একটি এক্সটেনডেড রিয়েলিটি যা আসলে ম্যাজিক রিয়েলিজম। কমলকুমার তাঁর উত্তরসূরিদের চোখে এক উজ্জ্বল উদ্ধার, শুধু ভাস্কর্যময় ভাষা নির্মাণে নয়, তাঁর অনবদ্য কথনভঙ্গিতে। সুনীলের দৃষ্টিতে তিনি দুর্বোধ্য তবু রোমাঞ্চকর। সাহিত্য সমীক্ষায়, কমলকুমারের সাহিত্যের অনুবাদ–সম্ভাবনার কথা প্রসঙ্গে কবি শঙ্খ ঘোষ মতামত দিয়েছেন:‌ এমন একজন লেখকের রচনা বাঙালী পাঠক ছাড়া আর সকলেরই কাছে অনধিগম্য থেকে যাবে, যদি তার ঠিক ঠাক স্বাদ পেতে হয়।


কমলকুমার চলে গেছেন ১৯৭৯ সালে। স্ত্রী দয়াময়ীর সঙ্গে ৩২ বছরের জীবন কাটিয়ে। নিঃসন্তান ছিলেন ওঁরা কিন্তু ওঁদের জীবনে মাধব এসেছিলেন সন্তানরূপে। একটা নিছক কিউরিও অথচ দয়াময়ীর আজীবন সঙ্গী মাধব আসলে গোপালের একখানি সুন্দর ধাতুমূর্তি। ‘‌তিনি দয়াময়ী’‌ গ্রন্থের জীবনীকার হলেন প্রশান্ত মাজী। কমলকুমার–গবেষণার সূত্র ধরে ওই একফালি ফ্ল্যাটে প্রবেশ ঘটে প্রশান্তর এবং ক্রমশ তিনি বুঝতে পারেন কমলকুমার একা নন, তাঁর অবর্তমানে পরিপূরক ও প্রতিনিধি হিসেবে রয়ে গেছেন প্রকৃত অর্থে সহধর্মিনী দয়াময়ী মজুমদার। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভাষ্যে যিনি ছিলেন ক্রিয়েটিভ স্বামীর অন্তরালবর্তিনী, পর্দার আড়াল থেকে যিনি মামলেট ও চায়ের কাপ বাড়িয়ে দিতেন অতিথিদের উদ্দেশে, তিনি যে কমল–‌প্রয়াণের পর স্বামীর অসমাপ্ত কাজের দায়িত্ব নিয়ে নেবেন, এটা কেউ আশা করেননি। কৃত্তিবাস পত্রিকায় লিখলেন নিজেদের নিয়ে:‌ আমাদের কথা। প্রশান্ত বলেছেন, ‘‌আমাদের কথা’‌ সংগ্রহ করে তিনি সুনীলের হাতে তুলে দেন এবং এরপর থেকেই ওঁর বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত শুরু হয়।
উনি চাইতেন না। উনি বলতেন তুমি যদি লেখো কি হবে জানো, লোকে বলবে ব্যাটা নিজে টুইস্ট করে লেখে। এখন স্ত্রীর নাম দিয়ে সহজ করে লিখছে। সত্যি ভাবা যায় না শুধুমাত্র স্বামীর একটি কথায় কলম ধরেননি ৩২ বছর। তারপর যে কাণ্ডটি তিনি ঘটালেন, সেটা আরও বিস্ময়কর। কমলকুমারের ড্রয়িং, স্কেচ, উডকাট, সংগৃহীত কিউরিও এবং নিজের সূচিকর্ম নিয়ে করলেন যৌথ প্রদর্শনী। জীবদ্দশায় কেন কমলকুমারের কোনও ছবির প্রদর্শনী হয়নি, তা জানা যায় দয়াময়ীর সঙ্গে লেখকের আলাপচারিতায়।
‘‌তিনি দয়াময়ী’‌ গ্রন্থটি লেখকের আরেকটি স্বাদু গদ্যের নমুনা। এটা বললে অবশ্য সবটা বলা হয় না। এমন এক আন্তরিক ও মর্মস্পর্শী স্মৃতিচারণ যা প্রায় রুদ্ধশ্বাসে পড়ে যেতে হয়। এতে রয়েছে নানান প্রামাণ্য তথ্য, দয়াময়ীর চিঠিপত্র ও মৃত্যু–পূর্ব তিনটি ঘোষণা, এ ছাড়া দয়াময়ীর লেখা মোট আটটি বইয়ের পরিচিতি এবং তাঁর সূচিকর্মের আলোকচিত্র। প্রচ্ছদে দয়াময়ীর যৌবনের একটি স্নিগ্ধ ছবি পাঠকের মন ভরিয়ে দেবে।‌‌‌‌ ■
 

জনপ্রিয়

Back To Top