অঞ্জন সাহা

বাঙালি রয়েছে বিশ্বজুড়ে। কর্মসূত্রে, লেখাপড়ার জন্য, কখনও বা বৈবাহিক সূত্রে।  বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠানে বাঙালিরা প্রতিষ্ঠিত। কেউ বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন, কেউ কর্পোরেটের উচ্চপদে আসীন, কেউ নামকরা হাসপাতালের চিকিৎসক, কেউ আবার নিজেই ব্যবসা করছেন। বাঙালির বিশ্বজয় আজ নতুন নয়‌। সাগরে পাল তুলে সে বাণিজ্যেতে বেরিয়ে পড়েছিল কয়েকশো বছর আগেই। সেই ট্র‌্যাডিশন নানা চেহারায় আজও চলেছে। গর্বের সঙ্গে বলা যায়, বাঙালি কোথায় নেই?‌ পাহাড়ের বরফ থেকে মরুভূমির বালি সবখানেই সে বিরাজমান। 
তবে বাঙালি যেখানেই থাকুক, মাতৃভূমিকে কখনও ভোলে না। সে স্বদেশেই থাকুক অথবা বিদেশে থাকুক। প্রবাসী বাঙালি বাংলার উৎসবে–‌পার্বণে এককাট্টা হয়। দুর্গাপুজোর সময় সাধ্যমতো আয়োজন করে। দিল্লি থেকে ডেনমার্ক, মুম্বই থেকে মিশিগান— সর্বত্র একই আনন্দ। বাংলা থেকে দূরে থাকলেও মনেপ্রাণে বাঙালি।
এবারে পুজোয় এমনই একটা মন ভাল করা এবং মন কেমন করা সঙ্কলন প্রকাশিত হয়েছে। চমৎকার বই। চমৎকার উদ্যোগ। প্রবাসী মহিলারা লিখেছেন, তাঁদের পুজো অভিজ্ঞতার কথা। দিল্লি, মুম্বইয়ের কথা যেমন আছে, তেমন আছে আমেরিকা, ডেনমার্ক, নাইরোবি, কুয়েত, মস্কোর পুজোর কথাও। তাঁরাই লিখেছেন ছোটবেলার স্মৃতি, লিখেছেন বাংলার বাইরের পুজো আয়োজন আর আনন্দের কথা।
সৈয়দ তনভীর নাসরিন এই সঙ্কলনের সম্পাদক। সতেরোজন প্রবাসিনীর লেখা একত্রিত করে গোটা বিশ্বের একটা ছবি তুলে ধরবার চেষ্টা করেছেন। বাংলা থেকে বহু দূরে থেকেও বাংলার সবথেকে বড় ঊৎসব কেমন ভাবে পালন করা হয় তার ছবি। শুধুমাত্র পুজোর উৎসব, হল্লোড়, সাজগোজের বর্ণনা জানাতে নয়, এই সঙ্কলন বাঙালির সাংস্কৃতিক ইতিহাসচর্চার প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ। যদি এই ধরনের বিষয় নিয়ে কেউ ভবিষ্যতে গবেষণা করেন, এই সঙ্কলটির প্রয়োজন হবে। বইটির নাম ‘‌পুজো আই মিস’‌। প্রকাশক ইন্ডিপেন্ডেন্ট জার্নালিস্ট সোসাইটিজ, মিরাকেল ইনফোয়েব প্রাইভেট লিমিটেড। 
মোট সতেরোজন লেখিকা। অনেকেই লিখেছেন ইংরেজিতে। খুশির খবর, কেউ কেউ মনের কথা জানিয়েছেন বাংলাতেও। দু পক্ষকেই অভিনন্দন। যাঁরা লিখেছেন তাঁদের পরিচয়টা একবার দেখে নেওয়া যাক। এঁরা অবশ্যই গর্ব হবেন।
আত্রেয়ী সেন, ডেনমার্কের কোপেনহেগেন। কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপিকা; সঙ্ঘমিত্রা কাঞ্জিলাল–‌ভাদুড়ি পর্তুগালের আলবুফেইরা। অর্থনীতির স্বাধীন গবেষক;‌ জয়শ্রী মজুমদার, ফ্রান্সের প্যারিস। এক বহুজাতিক সংস্থার ম্যানেজার, সঙ্গীতের অধ্যাপকও;‌ রিয়া রায়, বাহরিন। এক ব্রিটিশ কারিকুলাম স্কুলের শিক্ষক‌; রানি সিন্‌হা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক। লেখিকা; রুমনা লাহিড়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটেল। ব্যাঙ্কের সিনিয়র মর্টগেজ প্রসেসর;‌ সরিতা রায়, মুম্বই। চিত্রশিল্পী;‌ কেয়া গুহরায়, দিল্লি। নাট্যকার, সঙ্গীতশিল্পী; ঊর্মিলা চক্রবর্তী, ইতালির মিলান। মিলান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতত্ত্বের অধ্যাপিকা; শ্রবন্তী ভৌমিক সেন, কুয়েত। বহুজাতিক সংস্থার কমার্শিয়াল ম্যানেজার; পুবালি ব্যানার্জি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনা। ওয়েস্টার্ন গভর্নর্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা; সুচরিতা সরকার, মুম্বই। ইংরেজির সহযোগী অধ্যাপিকা; কুমকুম বাগচী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড। তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী;‌ সুবর্ণা ব্যানার্জি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেট্রয়েট। নাসায় কর্মরতা;‌ নন্দিনী চ্যাটার্জি, লন্ডন। এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সিনিয়র লেকচারার;‌ মৌসুমি চৌধুরি, কেনিয়ার নাইরোবি। লেখিকা; স্মিতা সেনগুপ্ত, রাশিয়ার মস্কো‌‌। লেখিকা।
জয়শ্রী মজুমদার থাকেন প্যারিসে। ‘‌প্যারিসের দুর্গাপুজো পা দিল ৩২ বছরে’ শিরোনামে লিখেছেন সেখানে পুজো শুরুর কথা— ‘‌পরপর দুটো পুজো চলে গেল, দেশের পুজোর ঢাকের বাজনা মনের স্মৃতির সঙ্গে মিশিয়ে বাজিয়ে নিতাম। প্রতি বছর তো পুজো উপলক্ষে দেশে যাওয়া হয়ে ওঠে না, আর সম্ভবও না। অনেক দূরে বসে ঘটে পুজো দেখলাম’। মস্কোবাসী স্মিতা সেনগুপ্ত ওদেশে জন্মানো ছেলের সঙ্গে বাঙালির দুর্গাপুজোর পরিচয় করিয়ে দিতেই কোমর বাঁধেন। বাঙালিদের সঙ্গে অন্য বিদেশিরাও যোগ দেন— ‘‌বিদেশবিভুঁইয়ে আয়োজিত দুর্গাপুজোয় শুধু বাঙালিরাই নন, ভারতের অন্য রাজ্যের মানুষ, এমনকী বিদেশিরাও মনেপ্রাণে জড়িয়ে পড়লেন।’‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top