গৌতম ঘোষদস্তিদার
‘প্রবাসী’র নাট্যচর্চা • সম্পাদনা শম্পা ভট্টাচার্য 
পত্রলেখা • ৩০০ টাকা

বাংলা সাহিত্যচর্চায় ‘প্রবাসী’ পত্রিকার স্থানাঙ্কনির্ণয় ইতিমধ্যেই সুসম্পন্ন। বিদ্যায়তনিক পরিসরে বহু–বিদ্যাজীবীর গবেষণায় বিধৃত হয়েছে বিষয়টি। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৬৫–১৯৪৩) ব্রাহ্মবাদী নৈতিকতানির্ভর দৃষ্টিভঙ্গিতে পত্রিকাটি সম্পাদিত হলেও, বৃহত্তর–মনীষাক্ষেত্রে প্রবাসীর গুরুত্ব অপরিসীম। নাট্যবিদ শম্পা ভট্টাচার্য তাঁর ‘‘প্রবাসী’র নাট্যচর্চা’ গ্রন্থে চিরায়ু–সবুজপত্রটির আরও–একটি নববাতায়ন উন্মুক্ত করলেন। বিভিন্ন কালসীমায় প্রবাসী পত্রিকায় (১৯০১–১৯৬৫) প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ ছত্রিশটি নাটকালোচনা এক–মলাটে সুগ্রন্থিত করে আগ্রহী–পাঠকের মননসন্তুষ্টি ঘটিয়েছেন তিনি।
সকলেই জানি, রবীন্দ্রনাথ–রামানন্দের সখ্য ঐতিহাসিক। প্রবাসী পত্রিকার প্রথম সংখ্যাটির সূচনা হয়েছিল রবিকবিতায়। তারপর আজীবন তিনি ছিলেন প্রবাসীর প্রধান–লেখক। তার মধ্যে নাটকবিষয়ক রচনাও কম নয়। কিন্তু, এই গ্রন্থে তাঁর মাত্রই তিনটি–রচনা সঙ্কলিত। অবশ্য, রবীন্দ্রনাটক বিষয়ে সঙ্কলনস্থ হয়েছে ভিন্ন–আটটি রচনা। রবীন্দ্রনাথের দুটি–রচনাও স্বনাটক সম্পর্কে। তাঁর অন্যান্য নাটক বা নাটকভাবনা নিয়ে লিখেছেন সারদারঞ্জন পণ্ডিত, মণি বর্দ্ধন, মুহম্মদ (গ্রন্থে ‘মহম্মদ’) শহীদুল্লাহ, বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়, শান্তা দেবী, বিমলচন্দ্র কুণ্ডু, বিনায়ক সান্যাল। প্রতিটি রচনাই গভীরতাবিস্তারী। রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ও প্রকাশিত হয়েছিল ১৩৩১ সালে প্রবাসী–র আশ্বিনসংখ্যায় অবনীন্দ্রনাথের অলঙ্করণশোভিত হয়ে। ১৩৩২ সালে ঘরোয়াভাবে নাট্যায়নের আগে নাটককার যে–নান্দীমুখটি করেছিলেন, গ্রন্থে তার মুদ্রিত–রূপটি নাটক ও নাট্যের এক যুগান্তকারী অভিজ্ঞান। লক্ষণীয়, ওই অভিভাষণে নাটককার স্বয়ং তাঁর প্রণয়নটিকে ‘পালা’ রূপে চিহ্নিত করেছেন।
রবীন্দ্রনাটকভিন্ন নাট্যশাস্ত্র, মৃচ্ছকটিকম্, রামলীলা, বিলাতি থিয়েটার, এস্কাইলাস, যাত্রাগান, ভিয়েনার ছায়ানাট্য, ভাস, আধুনিক সংস্কৃত নাটক, মধুসূদন ইত্যাদি বিষয়ের ঐতিহাসিক আলোচনার সন্নিবেশ অবশ্যই সঙ্কলনগ্রন্থটির উজ্জ্বল–উদ্ধার। রচনাগুলি লিখেছেন অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, বিজয়চন্দ্র মজুমদার, গিরিজাকুমার ঘোষ, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ, কালিদাস নাগ, চারুচন্দ্র রায়, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, যোগেশচন্দ্র বাগল প্রমুখ কৃতবিদ্য। রচনাগুলিতে প্রতীয়মান হয় তাঁদের প্রসারিত–মনীষায় নাটকের গুরুত্ব।
‘প্রবাসী’র সময়সীমায় কলকাতায় সাধারণ–রঙ্গালয়ের পত্তন হয়ে গেছে। গৃহস্থবাড়ির অভিনেত্রীর অভাবে মঞ্চে অবতীর্ণ হয়েছেন গণিকাভিনেত্রীরা। তখন অনেকেই সেই প্রথার বিরোধিতা করেছেন। নাট্যকলার সে এক যুগসন্ধিক্ষণ। সঙ্কলনের চারটি রচনাও সেই ইতিহাসের সাক্ষ্য দেয়। এমনকী, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও গান্ধীজির মতোই গণিকাভিনেত্রীদের মঞ্চাবতরণে সায় দেননি। তিনি ‘কলকাতার পেশাদার থিয়েটার’ শীর্ষক রচনাটিতে বিষয়টিকে সামাজিক–নৈতিকতার দৃষ্টিতেই দেখেছেন। স্বভাবতই, রামানন্দও সমকালীন গিরিশচন্দ্র, অমৃতলাল, অমরেন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল, শিশিরকুমারের নাট্যচর্চা সম্পর্কে ছিলেন বীতস্পৃহই। কিন্তু, ততদিনে স্টার, এমারেল্ড, মিনার্ভার যবনিকা–উত্তোলনে উত্তর কলকাতা তোলপাড়। রামকৃষ্ণদেব নটী বিনোদিনীর অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছেন, বলেছেন ‘নাটকে লোকশিক্ষে হয়’। কিন্তু, রামানন্দ ব্রাহ্ম–নৈতিকতায় সে–দিকের ভ্রুক্ষেপও করেননি। পরিবর্তে, যবদ্বীপ–বলিদ্বীপের নাটক বিষয়ে গভীরভাবিত হয়েছেন।
সঙ্কলক–সম্পাদক বিপুল–শ্রম ও অগাধ–মেধায় প্রস্তুত করেছেন গ্রন্থটি। কিন্তু, গ্রন্থের নামকরণ থেকে সর্বত্রই অকাতরে ‘নাট্য’ শব্দটি ব্যবহার সামান্য–অপ্রযুক্ত মনে হয়। শম্ভু মিত্র মহাশয় আমাদের শিখিয়েছিলেন, লিখিত–নাটক অভিনীত হলে তা ‘নাট্য’। সেক্ষেত্রে গ্রন্থে মাত্র–একটিই নাট্যালোচনা লিপিবদ্ধ। 

জনপ্রিয়

Back To Top