সাবর্ণি চট্টোপাধ্যায়: বাংলা নাট্যচর্চার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ বই ‌বিনোদিনী দাসীর (নটী বিনোদিনী) লেখা ‘আমার কথা ও অন্যান্য রচনা’। একজন প্রবঞ্চিত নারীর নয়, একজন প্রবঞ্চিত মানুষের আত্মকথন পড়তে পড়তে মনে হবে, শিল্পীর মর্যাদা কি আমরা সেভাবে দিতে পেরেছি!
সমাজে তাঁর ঠিক কী অবস্থান ছিল দ্বিধাহীনভাবে বলেছেন বিনোদিনী দাসী। লুকোচুরির চেষ্টা নেই। গিরিশচন্দ্র ঘোষের পরিচর্যায়–শিক্ষায় কীভাবে তিনি মঞ্চের জনপ্রিয়তম অভিনেত্রী হয়ে উঠেছিলেন, সেই অভিজ্ঞতা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন— ‘‌গিরিশবাবু মহাশয় ততই যত্নে আমায় নানাবিধ সৎশিক্ষা দিয়া কার্য্যক্ষম করিবার যত্ন করিতে লাগিলেন।’‌
ঝরঝরে সাধুভাষায় লেখা বইটি একাধিকবার পড়া যায়। নটী বিনোদিনীর জীবনকে ছোঁয়ার জন্য নয়, তদানীন্তন নাট্যশালা, অভিনয়ের ধারা, দর্শকদের পছন্দ, নির্দেশনা, মঞ্চের পিছনের রাজনীতি জানারও নির্ভরযোগ্য দলিল এটি। দু–একটি তথ্যগত ত্রুটি আছে; কিন্তু সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও নির্মাল্য আচার্য— দুই সম্পাদকের মুখবন্ধে সব নিরসন ঘটেছে।
শুধু গদ্য নয়, এই বইয়ের কবিতাগুলিও উচ্চমানের। এখানে তাঁর জীবনদর্শন ও সৌন্দর্যপিয়াসী মনের পরিচয় পাওয়া যায়। আর গদ্যাংশ জুড়ে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে রয়েছে বিনোদিনীর প্রত্যাশা, প্রতিশ্রুতি পেয়েও তা ভেঙে যাওয়া, সমাজে ‘বারাঙ্গনা’ বলে পরিচিত অভিনেত্রীর নামে রঙ্গালয়ের নামকরণ করা হতে পারে না— এইসব। শেষাংশে আছে লেখকের আত্মবিশ্লেষণ আর অনুশোচনা।
আত্মকথায় জীবন অনেক সময় আসল মানুষকে ছাপিয়ে যায়; কিন্তু ‘আমার কথা ও অন্যান্য রচনা’য় একজন অভিনেত্রী বারবার নিজেকে হীন বলে উল্লেখ করে মহানুভবতারই পরিচয় দিয়েছেন। তখনকার নাট্যসংসারের ইতিহাসের পাশাপাশি সহায়সম্বলহীন এক নারীর লড়াই, দর্শকদের অকুণ্ঠ ভালবাসা, খ্যাতির চূড়ান্ত শিখরে থাকতেই অভিনয় জগৎ থেকে বিদায় গ্রহণ আরও অনেক কিছুই এই বইয়ের সম্পদ।
‘‌সুবর্ণরেখা’র ২৫০ টাকা দামের বইটি যতটা সমাদর ও গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল, ততটা পায়নি। প্রবঞ্চিত এক শিল্পীর জীবনের মতো এই বইটিও উদাসীনতা আর উপেক্ষার শিকার। সাহিত্যে উপেক্ষিত হলেও আবার পড়া যায় । ■

জনপ্রিয়

Back To Top