সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিন উপলক্ষে নতুন বই নিয়ে লিখলেন উদ্দালক ভট্টাচার্য

১৯৫০ সালে তৈরি আকিরা কুরোসাওয়ার ছবি ‘‌রশোমন’–এর সেই দৃশ্যটির কথা মনে পড়ে। যখন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ক্যামেরাকে আড়াআড়ি অতিক্রম করে সরে যায় একটি চরিত্র। গাছের আবডাল থেকে সরতে সরতে ক্যামেরার সামনে এসে আবারও মিলিয়ে যায় জঙ্গলে। মনে পড়ে ‘‌পথের পাঁচালী’‌। সর্বজয়া জল ভরে আনছেন, অমনই গাছের আবডাল থেকে ক্যামেরা ট্রলি করে এসে ধরে সর্বজয়াকে। দৃষ্টিতে মিলে যায় জাপান ও ভারত। 
এমনই কতবার নিওরিয়ালিজমের কেতাবি সংজ্ঞা ছেড়েও নিজেকে একের পর এক নতুন বৃত্তে সংযুক্ত করে গেছেন সত্যজিৎ রায়। শুধু ভিত্তোরিও ডি সিকার ‘‌বাইসাইকেল থিভস’‌ নয়, বরং, তাঁর ছবিতে বিশ্বজনীন এক চিত্রমালা যেন এসে ধরা দিয়েছে। তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক। এত কিছুর মাঝেই আজীবন তিনি এক বিনি সুতোর মালায় জড়িয়ে থেকেছেন এশিয়ার সিনেমাচর্চার পীঠস্থান জাপানের সঙ্গে। 
যে কোনও গবেষণাগ্রন্থের প্রাথমিক বৈশিষ্ট্য, তথ্য জড়ো করা, আর তা পৌঁছে দেওয়া মানুষের কাছে। তথ্য আপাত–‌নিরস এক বস্তু, যাতে কতিপয়ের আগ্রহ থাকে, মানুষ গল্প পড়তে বেশি ভালবাসেন। তাই যে গবেষণাগ্রন্থের আদলে থাকে গল্পবলার কৌশল, তা পাঠকের আগ্রহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রবীরবিকাশ সরকারের ‘‌সূর্যোদয়ের দেশে সত্যজিৎ রায়’‌ কিছুটা তেমনই, গল্প করে বলা বাস্তবের এক কাহিনী। যেখানে জাপান আর সত্যজিতের মধ্যে যে এক আশ্চর্য সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, তা বলেছেন লেখক। 
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে জাপানের এক যোগসূত্র ছিল। বিশ্বভারতীর কলাভবনের ছাত্র, শিক্ষক ও চিত্রশিল্পী বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় ও তাঁর শিক্ষক নন্দলাল বসু জাপান ভ্রমণও করেছিলেন। সেই সুতোয় বাঁধা পড়েছিলেন সত্যজিৎ। শিক্ষকদের কাছ থেকে আহরণ করেছিলেন জাপানি শিল্পকলার নানা দিক।

তাঁকে অবাক করেছিল ‘‌উকিইয়োএ’‌–এর কাঠখোদাই শিল্পকলা। জাপানি শিল্পকলার কদর এর আগেও করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাপানযাত্রী–তে তিনি লিখেছেন, ‘‌ইতিমধ্যে য়োকোহামায় একজন ধনী এবং রসজ্ঞ ব্যক্তির আমরা আতিথ্য লাভ করেছি। তাঁর এই বাগানটি নন্দনবনের মতো এবং তিনিও সকল বিষয়ে এখানকারই যোগ্য। তাঁর নাম হারা। তাঁর কাছে শুনলুম, য়োকোয়ামা টাইক্কান এবং তানজান শিমোমুরা আধুনিক জাপানের দুই সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পী। তাঁরা আধুনিক য়ুরোপের নকল করেন না, প্রাচীন জাপানেরও না। তাঁরা প্রথার বন্ধন থেকে জাপানের শিল্পকে মুক্তি দিয়েছেন। হারার বাড়িতে টাইক্কানের ছবি যখন প্রথম দেখলুম, আশ্চর্য হয়ে গেলুম। তাতে না আছে বাহুল্য, না আছে শৌখিনতা। তাতে যেমন একটা জোর আছে, তেমনি সংযম।’‌ 
সত্যজিতের ছবি এই জন্যই জাপানের দর্শক, সমালোচক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা মহলে এতটা স্থান করে নিতে পেরেছে। জাপানের একাধিক দৈনিক থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র বোদ্ধারা বারবার স্বীকার করেছেন, ‘‌অপু’‌ সিরিজের ছবিগুলি অসামান্য। কেউ কেউ জাপানের দৃশ্যপটের সঙ্গেও এর তাঁর মিল পেয়েছেন। এই বইয়ে, এসব নিয়েই বিস্তৃত হয়েছে আলোচনা। সত্যজিৎকে নিয়ে জাপানিদের চিন্তার ছাপ মেলে সে দেশের প্রথম বিশ্বকোষে। লেখকও সে কথা বলেছেন। সত্যজিতের সেই পরিচিতি লিখেছিলেন, উদগাওয়া কোওয়োও। এরপর জাপানের দৈনিকে প্রকাশিত হয় সত্যজিতকে নিয়ে বিস্তারিত লেখা। সেখানে লেখা হয়, কীভাবে ‘‌পথের পাঁচালী’‌র পরিবার, মানে সর্বজয়া, হরিহর, ইন্দির, অপু–‌দুর্গার পরিবার জাপানের গ্রাম্য পরিবারের সঙ্গে মিলেমিশে যায়। পাশাপাশি, তত্ত্বগত দিক থেকে কীভাবে সত্যজিতের সঙ্গে নিওরিয়ালিজমের যোগসূত্র তৈরি হয়েছিল, তাও প্রকাশিত হয় জাপানের দৈনিকে।
মানে যেটা দাঁড়ায়, তা হল, জাপানিদের সঙ্গে সত্যজিৎ নামটা জড়িয়ে পড়ে। সেখানকার একেবারে সাধারণ মানুষ না হলেও, বুদ্ধিজীবী শিল্পীদের মধ্যে সত্যজিতের ছবি পাকাপাকি জায়গা করে নেয়।

 
শুধু সিনেমার প্রসঙ্গ নয়, এই বইতে উঠে এসেছে সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে জাপানের সিনেমা জগতের নানা মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া সম্পর্কের কথাও। কীভাবে সেখানকার মানুষ আপ্লুত হয়ে সত্যজিতকে গ্রহণ করেছিলেন, সেকথা লেখা আছে। বিজয়া রায়ের স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে ‘‌মাদাম কাওয়াকিতা’‌র নাম। সত্যজিৎ রায়ের বিদেশি বন্ধুদের মধ্যে কাওয়াকিতার সঙ্গে বিজয়ার প্রথম আলাপ হয়। তিনি সে কথা লিখেছেন। সেই প্রসঙ্গ মনে করিয়ে দিয়েছেন লেখক।
রয়েছে অসংখ্য দুর্লভ ছবিও। আকিরা কুরোসাওয়া, মাদাম কাওয়াকিতার সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের নানা মুহূর্তের ছবি এই বইয়ে প্রকাশ পেয়েছে। সত্যজিতের ছবিতে অভিনয় করেছিলেন যে অভিনেতারা, ছবিতে তাঁরাও রয়েছেন। রয়েছে জাপানি ভাষায় মুক্তি পাওয়া সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ছবির পোস্টার। এছাড়া, কাওয়াকিতাকে লেখা বিজয়া রায়ের চিঠির ছবিও রয়েছে এই বইয়ের পাতায়। 
শেষে ফিরে যেতে হবে প্রথম কথায়। গবেষণাগ্রন্থকে সরস করে তোলা বড়ই কঠিন। লেখক তা সফলভাবে পেরেছেন। আর পেরেছেন বলেই কেবল তথ্য আর অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরতে এই না পড়লেও চলে। নেহাত গল্পের ছলে এক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উত্তাপ প্রবীরবাবুর লেখায় ধরা আছে। পাঠকের তা পছন্দ হবেই।
লেখক প্রবীরবিকাশ সরকার, জাপানের বাসিন্দা। সে দেশের সঙ্গে ভারতের যোগসূত্র নিয়ে নানা আঙ্গিকে তাঁর রচনা প্রকাশ পেয়েছে। ‘‌জানা অজানা জাপান’‌ (‌দুই খণ্ডে)‌, ‘‌রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জাপান:‌ শতবর্ষের সম্পর্ক’‌ (‌ইতিহাস সংকলন/‌বিবেক বার্তা, ‌জাপান, ‌২০১১)‌, ‘‌জাপানে রবীন্দ্রনাথ’‌ ‌(‌ইতিহাস সংকলন/‌হাতেখড়ি, ঢাকা, ‌২০১৬), এমনই অসংখ্য বই রয়েছে তাঁর। শুধু বাংলা নয় ইংরাজিও প্রকাশিত হয়েছে তাঁর বই। সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে এই বইটি প্রকাশ করেছে আত্মজা পাবলিকেশন। 

জনপ্রিয়

Back To Top