মনসিজ মজুমদার
ছবি ও লেখা:‌ মিল–অমিলের দ্বন্দ্ব • 
সুমিতা চক্রবর্তী • কারিগর • ৪৫০ টাকা

প্রধান শিল্পরূপগুলির মধ্যে সাহিত্য ও দৃশ্যকলা যে ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী তা নানাভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে— কখনও নন্দনতত্ত্বের আলোচনায় বা লেখক–‌কবিদের বিচ্ছিন্ন, স্পষ্ট বা ব্যঞ্জনাময় মন্তব্যে। ছবি–‌প্রণোদিত কবিতা এবং শিল্পকলার ইতিহাসে সাহিত্য–অনুপ্রাণিত ছবি ও ভাস্কর্যের দৃষ্টান্ত অজস্র, অন্তত প্রাক্‌ আধুনিক কাল পর্যন্ত। কিন্তু লেখা ও ছবির মধ্যে মিল–‌অমিল নিয়ে আলোচনা বাংলাভাষায় এই প্রথম। মোট চারটি বড় প্রবন্ধ এবং পরিশেষে প্রবন্ধগুলিতে উল্লিখিত কবি–‌শিল্পী–‌লেখকদের পরিচিতি— সব নিয়ে বইটি কলারসিক সাহিত্য–‌পাঠকের অবশ্যপাঠ্য।
গভীর মনন ও নিরলস গবেষণার ফসল প্রথম প্রবন্ধটি, যার নামেই বইয়ের নাম। সাদৃশ্য ও ভিন্নতা থাকায় এই দুই কলারূপের মধ্যে যে দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক আছে তা বহুদিন পর্যন্ত কলাবেত্তাদের স্বীকৃতি পায়নি। লেখিকা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের তাবড় সাহিত্য ও নন্দনতত্ত্বের পণ্ডিতদের মন্তব্যে ও তাত্ত্বিক দলিলগুলি—‌ গ্রিক কবি সাইমোনিডেস, অ্যারিস্টোটল, হোরাস, হিঙ্কেলমান, লেসিঙ, এডমান্ড বার্ক, ম্যাথ্যু আর্নল্ড, আমাদের দেশের ষড়ঙ্গদর্শন, কামসূত্র, কূট্টনীতম, বিষ্ণুধর্মোত্তর, সমরাঙ্গনসূত্রধার, বঙ্কিমচন্দ্র এবং রবীন্দ্রনাথ— সব সযত্নে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন দুই কলারূপের মধ্যে তুল্যমূল্যের বিচার বা সাদৃশ্য নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে ভিন্নতা নিয়ে তত হয়নি। ব্যতিক্রম কেবল জার্মান নন্দনতত্ত্ববিদ লেসিঙ ও রবীন্দ্রনাথ। লেসিঙই প্রথম কাব্যকলা ও চিত্রকলার মৌলিক বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করে দুটির অনতিক্রম্য সীমা ও ভিন্নতা সুনির্দিষ্ট করেন। কিন্তু কাব্যকলা সম্পর্কে পক্ষপাতিত্ব তাঁরও ছিল, লেখিকার ভিন্নমত সত্ত্বেও। তা ছাড়া, শিল্পকলায় যন্ত্রণাদীর্ণ মুখব্যাদানে নরনারীকে হাস্যকর দেখায়— ‌‌এই ধারণা যে যথার্থ নয় তার প্রমাণ ম্যাসাচ্চিওর ‘‌ইক্সপালসন’‌ (‌১৪২৫)‌ ও বেরনিনির ‘‌এক্সট্যাসি অভ সেন্ট টেরেসা’‌ (‌১৬৫২)‌। রবীন্দ্রনাথের তাত্ত্বিক ভাবনার গভীর অনুধাবন করে লেখিকা নিশ্চিত হয়েছেন যে, কবি এই দুই কলার সাদৃশ্য ও স্বাতন্ত্র‌্য সম্বন্ধে কবি সমান সচেতন ছিলেন। দ্বিতীয় প্রবন্ধ ‘‌তুলি ও কলমের সমবায়’‌–‌এর বিষয় দুই শিল্পরূপের মিথ‌ষ্ক্রিয়া বা পরস্পর নির্ভরতা। দেশ বিদেশের সাহিত্য ও শিল্পকলা থেকে নানা শিল্পী ও তাঁদের সাহিত্য–‌প্রণোদিত কাজের দৃষ্টান্ত দিয়েছেন লেখিকা। এমন শিল্পকৃতিও আছে যার ‘‌আস্বাদন সাহিত্যের আস্বাদনের সঙ্গে মিশে যায়’‌ বা যেখানে ‘‌সাহিত্য এবং অন্য শিল্পের অনুষঙ্গ ব্যতিরেকে’‌ ছবি বোঝা দুঃসাধ্য। সাহিত্য–‌নির্ভর সব ছবি, লেখিকা মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘‌প্রকৃত চিত্রকলা’‌ হয়নি। সেসব ছবি নিছক অলঙ্করণ, কিন্তু ‘‌নন্দলালের হরিপুরা পোস্টার...‌‌অসাধারণ অলঙ্করণ।’‌ কবিতা–‌প্রসূত ছবির আদর্শ দৃষ্টান্ত রবীন্দ্রনাথের ‘‌নদী’‌ কবিতার সঙ্গে অবনীন্দ্রনাথের আঁকা ‘‌নদী–‌চিত্রমালা’‌ যা অনেকদিন লোকচক্ষুর আড়ালে ছিল। ‘‌ছবি যতটা সাহিত্য–নির্ভর তার অনেক বেশি ছবি–‌নির্ভর হল সাহিত্য।’‌ বরং চিত্রকলা অনেক সময় অনন্যনির্ভর যেমন, ‘‌মোনালিসা’‌। ছবি–‌প্রণোদিত কবিতার কথা এই প্রবন্ধে নেই। কবিতার ভাষা এমনিতেই চিত্রোদ্দীপক, আর কবিরা ছবি ‘‌লিখে’‌ই বিমূর্ত ভাব–‌অনুভব মূর্ত করেন। ‘‌শুধু অবন ঠাকুরই ছবি লেখেন না, বিশ্বের সব সাহিত্যেই ‌‌ছবি লেখা হয়।’‌ (‌এক সময় ছবি ‘‌লেখা’‌ই হত, ছবি তাই আলেখ্য)‌ লেখিকা জীবনানন্দের কবিতার অনবদ্য দৃষ্টান্ত দিয়েছেন।
‘‌কবিতায় চিত্র–‌প্রতিভাস’‌ শিরোনামে তিনটি রচনায় বিষ্ণু দে, জীবনানন্দ আর অমিয় চক্রবর্তীর কবিতায় সমকালীন শিল্পীদের নামোল্লেখ ও তাঁদের চিত্রকলার অনুষঙ্গে ঋদ্ধ নানা চিত্রকল্পের উদ্ধৃতি দিয়ে এই তিন কবিদের শিল্পকলার সঙ্গে যে নিবিড় পরিচয় ছিল তার চমৎকার বিশ্লেষণ করেছেন লেখিকা।
তবে তাঁদের কবিতায় ডাডাইস্ট, ইম্প্রেশনিস্ট বা স্যুররিয়ালিস্ট চিত্রকল্প চিহ্নিত করা যাবে কি না তা নির্ভর করে, এই সব কলা–‌আন্দোলন এবং কলাশৈলীর কোন মৌল লক্ষণ পাঠক সেগুলিতে দেখেছেন তার ওপর। ‘‌সানরাইজ, অ্যান ইম্প্রেশন’‌–এর বাংলা করেছেন লেখিকা ‘‌সূর্যোদয়:‌ একটি অনুভব’‌ (‌পৃ ২২)‌ এবং বলেছেন ‘‌উপলব্ধির আভাস রচনা... ‌‌ইম্প্রেশনিজমের মূল কথা’‌। কিন্তু অনুভব বা উপলব্ধি বিশুদ্ধ মানস–‌প্রক্রিয়া এবং যে কোনও কলাসৃষ্টির মূলই অনুভব। মতান্তরে ইম্প্রেশনিস্টদের আঁকার বিষয় ছিল চোখের রেটিনায় ধৃত দৃশ্যজগতের প্রতিফলিত ছায়া (‌ইম্প্রেশন)‌। তাঁদের আঁকার প্রকরণও ছিল সেইমতো। আবার ডাডাইজমের মতো সংগঠিত সোচ্চার নঞর্থক নৈরাজ্য— লেখিকার ভাষায় ‘‌উদ্ভটের সমন্বয়’‌— জীবনানন্দের মতো নির্জনতম কবির কবিতায় এক আশ্চর্য আবিষ্কার। ততটা নয় নিমগ্নচিত্ত কবির চিত্রকল্পে স্যুররিয়ালিস্ট শৈলীর সাদৃশ্য। কিন্তু স্যুররিয়ালিস্ট চিত্রকল্পের কোনটি সুনিশ্চিত লক্ষণ— অনন্বিত শব্দবিন্যাস বা চিত্রোপাদান, নাকি অবচেতনের অসংলগ্নতা?‌ ‘‌অমিয় চক্রবর্তীর কবিতায় পরিব্যাপ্ত ইমপ্রেশনিস্ট ল্যান্ডস্কেপের ধরনটি’‌ আর চলচ্চিত্রের মতো চলিষ্ণু দৃশ্যবলি। ফোবিস্ট শিল্পীদের চড়া অবাস্তব বর্ণপ্রয়োগের উদ্দামতা বিষ্ণু দে–র কবিতায় পেয়েছেন লেখিকা।
গ্রন্থের সবশেষ প্রবন্ধ, ‘‌ছবি–‌কবিতা:‌ ভাষার অতীত ভাষ্য’‌–‌এ লেখিকা ছবি ও লেখার সম্পর্ককে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন। ছবি এখানে কবিতার পরিপূরক বা ভাষ্যকারের ভূমিকায়। দৃষ্টান্ত মূলত শিশুসাহিত্য থেকে হলেও এডওয়ার্ড লিয়র, রবীন্দ্রনাথ, সুকুমার রায়ও আছেন। শিশুসাহিত্য ছবি–‌নির্ভর কারণ শিশুদের কাছে ছবিই প্রধান আকর্ষণ। সবচেয়ে আনন্দময় উল্লেখ যোগীন্দ্রনাথ সরকারের ছড়া ও ছবি, যেখানে ছবি বাদ দিলে ছড়া–‌পড়ার মজা সম্পূর্ণ হয় না। বরং রবীন্দ্রনাথের ‘‌সে’‌–‌র কবিতাগুলি ছবির মুখাপেক্ষী নয়।
কয়েকটি রঙিন ছবির সংযোজনে বইটি সমৃদ্ধ হয়েছে। কিন্তু দুটি–‌একটি তথ্যপ্রমাদ সাধারণ পাঠকের নজর এড়িয়ে যেতে পারে। ‘‌দ্য পিলগ্রিমস প্রগ্রেস’‌–‌এর (‌পৃ ১২৬)‌ লেখক জন বানিয়ন, (‌১৬২৮–‌১৬৮৮)‌, প্রথম ইমপ্রেশনিস্ট প্রদর্শনীর তারিখ (‌পৃ ১১২)‌ ১৮৭৪ আর সেজানের শিল্পী পরিচিতি প্রধানত পোস্ট–‌ইস্প্রেশনিস্ট (‌পৃ ৭৯)‌‌।‌‌‌‌‌‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top