রামদুলাল বসু
‌‌‌ডুয়ার্স থেকে দিল্লি • দেবপ্রসাদ রায় 
এখন ডুয়ার্স • ১৫০ টাকা
‘‌ডুয়ার্স থেকে দিল্লি’‌ বইটি উৎসাহের সঙ্গে পড়ে ফেললাম। এমন নয় যে লেখক আমার পরিচিত এবং আমি রাজনীতির মানুষ। আসলে সাহিত্যের ছাত্র হলেও ইতিহাস এবং মূলত সামাজিক ইতিহাস আমার ভাল লাগে। দেবপ্রসাদ রায়ের নাম শুনেছি। তবে একজন লেখক হিসেবে নয়, শুনেছি  বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ হিসেবে। বইটি পড়ে মনে হল, তিনি একজন পুরো সময়ের লেখকও হতে পারতেন, কেননা তাঁর বইটার পরতে পরতে সাহিত্যের গন্ধ। কিছু কবিতা ও ছড়াও পেলাম। এটা অতিরিক্ত।
আমি দেবপ্রসাদের রাজনৈতিক জীবনের উত্থানের যে চিত্র এই বইয়ে পেলাম সেটার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের নীতি–নিষ্ঠার পরিচয় থাকলেও তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের উন্মোচনের কাহিনীটি কম চমকপ্রদ নয়। সেই সূত্রে সেকালের কংগ্রেসি রাজনীতির অভ্যন্তরীণ ধারাটিও সমান্তরালভাবে বিন্যস্ত হয়েছে। কংগ্রেস যেহেতু দেশচালকের ভূমিকায় ছিল, তার মেজাজ ও মর্জির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলার ব্যাপারটিও বইয়ে ফুটে উঠেছে। গণতান্ত্রিক ভিত যে শক্তপোক্ত এই আমলেই হয়ে উঠেছিল, তার উদাহরণ ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রতি আস্থা ও স্বাধীনতাহরণের খেসারতস্বরূপ ক্ষমতাচ্যুতির ইতিহাস প্রমাণ দেয়। বাংলাদেশের গঠনপর্বে ইন্দিরাজির রাজনৈতিক ভূমিকা যেমন তাঁকে ভারতের শিরোপায় নতুন পালক যুক্ত করেছিল, তেমনি বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রশংসা ও সমালোচনার কারণ হয়ে উঠেছিল। অবশ্য ঝড় থেমে যাওয়ার পর স্থিতাবস্থায় ফিরে এলে প্রশংসার মাত্রাই তাঁকে অনন্যতা দিয়েছে। এই ইন্দিরাই অনতিকালের মধ্যে নিন্দিত ও পরিত্যক্ত হলেন, গণতন্ত্রের প্রতি চরম বিশ্বাসভঙ্গের জন্য। এই কাল দেবপ্রসাদের সদ্য‌–যৌবনের রাজনৈতিক শিক্ষার কাল। এই পর্বে দেখা যায় যিনি তাঁকে কুলভ্রষ্টতার হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন তিনি তাঁর ‘‌রাজনৈতিক গুরু’‌ স্বপ্নদর্শী অনতি–যুবক প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি। যাঁর নামে তিনি বইটি উৎসর্গ করেছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, নকশাল আন্দোলন, সাঁইবাড়ি হত্যার ঘটনা সেকালের যুব–মনে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। এ সব ঘটনাধারার হাত থেকে কংগ্রেসি যুব সমাজকে সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছিলেন প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি। কংগ্রেসি যুবসমাজ নিঃশর্তভাবে প্রিয়রঞ্জনকেই গ্রহণ করেছিল তাদের ফ্রেন্ড, ফিলজফার ও গাইড হিসাবে। 
দেবপ্রসাদ এই পর্বেরই ইতিহাস তাঁর আত্মস্মৃতির মধ্য দিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে বিবৃত করেছেন। অবশ্য এই রচনা তাঁর পরিণত বয়সের। বয়সের আবেগ উত্তেজনা এখানে অনেকখানি শৃঙ্খলিত। তথাপি সেকালের সামাজিক প্রেক্ষিতে দেবপ্রসাদের কর্মনিষ্ঠা, আনুগত্য এবং সর্বোপরি স্বার্থত্যাগের মধ্য দিয়ে উঁচু মাথায় এগিয়ে যাওয়ার এই কাহিনী অবশ্যই ভাল লাগে। এই সঙ্গে সামাজিক জীবনটাও উন্মুক্ত হয়ে পড়ে।
এই আত্মজীবন কাহিনী তাই সমাজের সঙ্গে যুক্ত থেকে নতুন মাত্রা পেয়েছে। কেন্দ্রে দেবপ্রসাদ থাকলেও তিনি একমাত্র উপজীব্য নন। কংগ্রেসি রাজনীতির এক সময়ের এই কাহিনী লেখকের বর্ণনার গুণে সামগ্রিকতা পেয়েছে। এখানেই এই গ্রন্থের সাফল্য। এ কারণেই গ্রন্থটি সর্বজনপাঠ্যের যোগ্যতা অর্জন করেছে। লেখক যে সাহিত্যিক হতে পারতেন,এই বইয়ে সেই পরিচয় আছে। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক সত্তা প্রাধান্য পেয়েছে তাঁর সাহিত্যিক সত্তার ঊর্ধ্বে। 
‘‌দিল্লি থেকে ডুয়ার্স’‌‌‌ একটি সময়ের দলিল। মনোগ্রাহী, সুখপাঠ্য। ■

জনপ্রিয়

Back To Top