কৃষ্ণরূপ চক্রবর্তী
খুচরো কথা • স্বপ্নময় চক্রবর্তী 
 কৃতি •‌ ৩০০ টাকা
যদি বলি স্বপ্নময় চক্রবর্তী এ–যুগের সব থেকে শক্তিশালী কথাসাহিত্যিক, তা হলে এই প্রান্তিক মন্তব্যের জন্য নিশ্চয়ই সাবধানী অনেকেই ভুরু কুঁচকবেন। তবু এই মন্তব্যের দায় আমি স্বীকার করি এবং সত্যিই মনে করি যে, যাঁদের পঞ্চাশের দশকের লেখকগোষ্ঠী বলা হয় সেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, মতি নন্দী, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, দেবেশ রায়— এঁদের পরবর্তীকালে যাঁরা বাংলা গল্প লিখেছেন, স্বপ্নময় বোধ করি তাঁদের মধ্যে সব থেকে সম্ভাবনা নিয়ে এসেছিলেন। ভাবনার এতরকমের বিস্তার ও চকিত গভীরতা তাঁর লেখায় এত মুহুর্মুহু ধরা পড়ে যে, সতর্ক পাঠক খুব ধীরে ধীরে প্রতিটি বাক্য ধরে ধরে এমনকী শব্দেরও স্বাদ চেটেপুটে নিয়ে পরবর্তী ধাপে এগোন। এগোতে পারেন। তবে এ কথাও বলব যে, তিনি যত বড় গল্প‌লেখক তত বড় ঔপন্যাসিক নন। তা সে কথা তো কমবেশি প্রায় সমস্ত বাঙালি কথাসাহিত্যিক সম্পর্কেই খাটে। এমনকী রবীন্দ্রনাথও যতটা বৈচিত্র্য ও ব্যঞ্জনা ‘‌গল্পগুচ্ছ’‌র পাতায় পাতায় হাজির করতে পেরেছেন, উপন্যাসে তত নয়। ‘‌চতুষ্পাঠী’‌ ও তাঁর অন্যান্য দু–‌একটি উপন্যাস যা আমি পড়েছি তা থেকে মনে হয় স্বপ্নময় চক্রবর্তী সম্বন্ধেও কথাটা সত্য। উপন্যাস রচনার শেষ দিকে এসে তিনি অনেক সময় এমন অধৈর্য হয়ে পড়েন যে, অনেকাংশে সেই রচনা শেষ পর্যন্ত মাটি হয়। তখন লেখকের কী অবস্থা হয় জানি না, কিন্তু ইতিমধ্যে তাঁর যে স্বল্পসংখ্যক কিন্তু কমিটেড পাঠককুল গড়ে উঠেছে, তাদের খানিকটা হতাশ হতেই হয়।
‘‌খুচরো কথা’‌ অবশ্য না–‌গল্প, না–‌উপন্যাস। এই বইয়ে যে–‌উনতিরিশটি রচনা স্থান পেয়েছে, তাদের ইংরেজিতে ‘‌পারসোনাল এসে’‌ বলে, বাংলায় রম্যরচনা। বঙ্কিমের ‘‌কমলাকান্ত’‌, রবীন্দ্রনাথের ‘‌পঞ্চভূত’‌ বা ‘‌বিচিত্র প্রবন্ধ’‌ অবশ্য যে–‌জাতের রচনা— এ তা নয়। স্বপ্নময়ের রম্যরচনা পড়তে গিয়ে আমি যাঁর লেখার সঙ্গে খুব মিল পাই তিনি পরিমল রায়। বুদ্ধদেব বসুদের বাল্যবন্ধু, অর্থনীতিবিদ। তাঁর ‘‌ইদানীং’‌ বইটি যাঁরা পড়েছেন তাঁরা আমার কথা বুঝতে পারবেন।
লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, কল্পনাশক্তি এবং বোধ আর বুদ্ধির সমানুপাত মিশ্রণ ‘‌খুচরো কথা’‌কে পাঠকের কাছে একই সঙ্গে উপাদেয় ও ভাবনার আকর রূপে হাজির করবে। ‘‌পারসোনাল এসে’‌ বা ‘‌বেলে লেতারস’‌–জাতীয় রচনায় যাঁর নাম প্রথমেই মনে পড়ে তিনি চার্লস ল্যাম(‌ব্‌)‌। তাঁর ‘‌ড্রিম থর্প’‌ বা ‘‌সুপার অ্যানুয়েটেড ম্যান’‌–‌এ অবশ্য ডকুমেনটেশন কম, কল্পনার সূক্ষ্ম বিস্তার ও অনুভূতির সৌন্দর্যই প্রধান। কিন্তু আলোচ্য বইয়ে কবির কল্পনা অপেক্ষা গদ্যকারের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ, সামাজিক বিভিন্ন অসঙ্গতির প্রতি তীব্র অঙ্গুলিসঙ্কেত লক্ষ্য করা যায়। যেমন ধরুন ‘‌খরগোশের চোখ’‌ রচনাটি। ‘‌তেলেঙ্গানার খাম্মাম জেলায় তিন বছরে ১০ থেকে ১৪ বছরের ১৫০০ মেয়েকে ক্যান্সার প্রতিরোধক টিকা দেওয়া হয়েছে এবং ওদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। আমরা এখনও জানি না, আগামী দিনে ওদের কী অবস্থা হবে।’‌ বিজ্ঞানের অগ্রগতির জন্য গরিব মানুষকে গিনিপিগের মতো ব্যবহার করার পিছনে এই যে উদাসীন নির্মমতা, তা কিন্তু আমাদের চোখ এড়িয়ে গেছে, লেখকের নজর এড়ায়নি।
‘‌খুচরো কথা’‌র ‘‌মুঠোফোন’‌ রচনাটি একই সঙ্গে পর্যবেক্ষণ–‌গুণ, কল্পনাশক্তি, ব্যক্তিনিরপেক্ষ মন্তব্য ও ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণে মিলে ভরপুর–‌রসের খোরাক হয়ে উঠেছে। প্রথম অনুচ্ছেদে সাধারণ কিছু মন্তব্য:‌ ‘‌অপুর চোখের ভিতরে ভরা বিস্ময়। আমরাও শৈশবে অল্পবিস্তর অপুর চোখ পেয়েছিলাম। জানি না এখনকার শিশুরা কতটা পায়।.‌.‌.‌’‌ এই ধরনের আপ্তবাক্যের পরেই স্বপ্নময় আমাদের হাত ধরে macro ছেড়ে micro‌–‌তে ঝপ করে নেমে আসেন এবং বলেন, ‘‌কালো রঙের টেলিফোন জীবনে প্রথম দেখি আমার পিসেমশায়ের বাড়ি।’‌ সঙ্গে সঙ্গে পাঠক উৎকর্ণ হয়ে ওঠেন গল্পের আশায়, জীবনকাহিনী আস্বাদের জন্য। আর তখনই বুঝতে পারি, এই বইয়ের লেখক মূলত প্রাবন্ধিক নন, তিনি আসলে গল্প‌লেখক। যতই তাঁর লেখায় ডকুমেনটেশন থাক, আসলে তিনি বিশেষ একটি সময়ের বিশেষ ‌এক সমাজবৃত্তের মধ্যকার একটি মানুষের স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের কথাকেই বলবেন। বলবেন মজা করে কিন্তু সেই মজার মধ্যেই লুকিয়ে থাকবে নিজেকে বেঁটে দেওয়ার চোখের জল। প্রসঙ্গত, এই লেখাতেই স্বপ্নময় ‘‌রেলের হুইসল’‌–‌এর ধ্বনিতে রহস্যের কথা বলেছেন। পাঠক হিসেবে আমার অবশ্য রেল ‌ইঞ্জিন নয় বরং স্টিমার বা জাহাজের কথা মনে হল। কারণ, সে যেন এক নিশির ডাক— বিষণ্ণ গম্ভীর, উদাত্ত, বহুদূর থেকে ভেসে আসা এক আহ্বান। ‘‌মুঠোফোন’‌–‌এর শেষে লেখক বলছেন, ‘‌প্রযুক্তি সব দিয়েছে। কিন্তু কেড়ে নিয়েছে সেই মধুর অন্তরাল।’‌ এই স্মার্ট লেখাটির শেষ বাক্যই লেখক ও মরমি পাঠকের যোগসূত্র, মায়াবী অন্তরঙ্গ।
‘‌খুচরো কথা’‌র ভাষা ঝরঝরে, ফুরফুরে, হালকা চালে অন্তর্ভেদী হওয়ার লক্ষ্যে টানটান। এই ঠোঁট–‌টেপা হাসি বা ড্রাই হিউমারই বোধকরি রম্যরচনার যোগ্য প্রকাশভঙ্গি। মুজতবা আলী‌র কথা মনে পড়ায়। মজবুত, সুগঠিত এই ২৩২ পৃষ্ঠার বইয়ে এত মুদ্রণপ্রমাদ কেন?‌ মাঝে ‌মাঝে তো বাক্যের অর্থ খোঁজাই দায় হয়, দু–‌একটি শব্দছাড়ও দুর্লক্ষ্য নয়। তবে স্বপ্নময় তাঁর পাঠককে এমনভাবে চলার পথের সঙ্গী করে নেন যে, ও সব অকিঞ্চিৎকর ফাঁকফোকর তাঁরা নিজেরাই ভর্তি করে এগিয়ে যান। পরবর্তী কথার উদ্দেশে। ‌‌‌‌প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ দেবাশিস দেব। 

জনপ্রিয়

Back To Top