অশোক দাশগুপ্ত: ‘‌শৈশবে অবহেলা, পারিবারিক হিংসা প্রভাব ফেলেছে হিটলারের মনের গভীরে। তার থেকে জন্মেছিল নৃশংসতা ও নিষ্ঠুরতার প্রবণতা। শিক্ষায় ব্যর্থ মনোরথ হয়ে সেই শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষিত সমাজের প্রতিই তার অনাস্থা জড়ো হয়।.‌.‌.‌ সহায় সম্বলহীন ভবঘুরে জীবনযাপনের মধ্যেই সে ক্ষমতার লোভ ও লালসায় আকৃষ্ট হয়।.‌.‌. ‌রাজনীতির চোরাপথে শঠতা, মিথ্যাচার ছিল তার নিত্যসঙ্গী।.‌.‌. যে–‌কোনও স্তরের ছাত্রছাত্রীর মধ্যে তার স্থান ছিল মধ্যমেধারও নিচে। কোনও স্কুলের কোনও সার্টিফিকেট তার ছিল না।.‌.‌. ‌হিটলারের উগ্র জাতীয়তাবাদ, জাতিগত বিদ্বেষ তাকে কঠোর কাজে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম করে তুলেছিল।.‌.‌. ‌তার বিশেষ ধরনের বাগ্মিতা। বক্তৃতায় ঘৃণার উদ্রেক ঘটিয়ে শত্রুপক্ষকে সে ছিন্নভিন্ন করতে পারত।’‌
কোনও নতুন চমকপ্রদ ব্যাখ্যা–‌বিশ্লেষণ হাজির করার দায় থেকে ‘‌নাৎসি জার্মানির জন্ম ও মৃত্যু’‌ বইটি লেখেননি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে জানার, পড়ার আগ্রহ তঁার তরুণ বয়স থেকেই ছিল। দশ বছর আগে হলে মোটাসোটা একটা বই অনায়াসে লিখতে পারতেন। সে উদ্দেশ্যে আলোচ্য বইটি লেখা হয়নি। সংক্ষিপ্ত ও সহজভাবে নাৎসি জার্মানির, হিটলারের উত্থান ও পতনের ইতিহাস সামনে এনেছেন। সহজ কথা যায় না বলা সহজে। সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ বুদ্ধদেব। ভূমিকায় লিখেছেন, ‘‌বিংশ শতাব্দীতে নাৎসি জার্মানির বিস্ময়কর উত্থান ও বিপর্যয়ের ইতিহাস আমাদের দেশে পরিচিত হলেও সেভাবে প্রসারিত ও আলোচিত নয়।’
তিনি জানেন, অনেক বামকর্মী ও গণতন্ত্রপ্রেমিক মানুষও হিটলারের হয়ে–‌ওঠা এবং উত্থানপতন নিয়ে অবহিত নন। হিটলার নৃশংস, হিটলার খারাপ, হিটলার বীভৎস স্বৈরতন্ত্রী, জানেন অনেকে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, উত্থান ও পতনের ন্যূনতম ইতিহাসটুকু জানেন না। সেই অগণিত মানুষের কাছে সহজবোধ্য ও সহজপাঠ্য ইতিহাস পৌঁছে দিতে চেয়েছেন লেখক।

চরম অসুস্থতা নিয়েও কাজটা করেছেন গভীরে প্রোথিত সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে।
নাটক লিখেছেন। চমৎকার অনুবাদ করেছেন। এবং দারুণ কাজ করেছেন জীবনানন্দ দাশ ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে। সেই দুটি বই অনুধাবন ও বিশ্লেষণে অসাধারণ। বরেণ্য সাহিত্যিক দেবেশ রায় চিঠি লিখে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। চিঠিটা যদি বুদ্ধদেবের কাছে থাকে, তা অবশ্যই প্রকাশযোগ্য। কিন্তু আলোচ্য চটি বইটি, আগেই বলেছি, নতুন ব্যাখ্যা–‌বিশ্লেষণের উদ্দেশ্যে লেখা নয়।
একটা চোখ অনেক বছর আগে থেকেই কার্যত কাজ করে না। দ্বিতীয়টিও শোচনীয় জায়গায়। যে–‌মানুষটা প্রবল ব্যস্ততার মধ্যেও গভীর রাতে অন্তত দু–‌ঘণ্টা পড়তেন, তঁার সেই দরজাটা বন্ধ হয়ে গেছে। এই বইটির জন্য নিজে কলম ধরতে পারেননি। বলে গেছেন প্রদোষকুমার বাগচীকে। হাতে প্রিয় কলম নেই। প্রয়োজনীয় রেফারেন্স মিলিয়ে দেখার উপায় নেই। ভরসা স্মৃতি, চর্চার স্মৃতি। অসুস্থ বুদ্ধদেবকে পাম অ্যাভিনিউ–‌এর ছোট্ট ফ্ল্যাটে দেখতে গিয়ে বিস্মিত হয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি। এত অসুস্থ, তবু ঘরভর্তি বই, পড়ার উপায় নেই, ধুলো জমছে, তবু বই–‌বিসর্জনের ইচ্ছা নেই। বই ঘিরে থাকুক, চান বুদ্ধদেব। মমতা বারবার আন্তরিক অনুরোধ করেছেন, চিকিৎসার জন্য ভাল কোথাও ভর্তি হয়ে যান, দায়িত্ব আমার। আর এই বাড়িটা ছাড়ুন। সে দায়িত্বও আমার। ধন্যবাদ জানিয়ে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অসম্মতি জানিয়ে দিয়েছেন। নিকটজনেরাও তঁাকে নড়াতে পারেননি। ‘‌অসুস্থতার জন্য কাজ করতে পারছি না, বেরোতেই পারছি না, তাই বলে কি কিছুই করব না?‌’‌— সেই মানসিকতা থেকে লেখা এই বই।
পুজোয় স্টলে দিতে হবে, সেই তাড়াহুড়ো থেকে প্রকাশিত প্রথম সংস্করণের কিছু তথ্য ও মুদ্রণভ্রান্তি পরের সংস্করণে ঠিক করে নেওয়া হয়েছে। অক্টোবরে প্রথম সংস্করণ, নভেম্বরেই তৃতীয় সংস্করণ। তিনি লক্ষ্যভ্রষ্ট হননি। ইতিহাসে নথিবদ্ধ থাকল, তিনি দায়বদ্ধ।‌‌‌‌‌ ■
নাৎসি জার্মানির জন্ম ও মৃত্যু • বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য 
ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড • ১০০ টাকা

জনপ্রিয়

Back To Top