গৌতম ঘোষদস্তিদার
রানাঘাট লোকাল • জয় গোস্বামী • 
দে’জ পাবলিশিং • ৩০০ টাকা 
‘রক্তমাংস’ পত্রিকায় ১৯৮৯ সালে জয় গোস্বামী জীবনের প্রথম সাক্ষাৎকারে সবিনয়ে জানিয়েছিলেন, গদ্যরচনায় তাঁর তেমন–আত্মবিশ্বাস নেই। দেখা গেছে, সাগরময় ঘোষের আমন্ত্রণেও তিনি শারদসংখ্যায় উপন্যাস লিখে উঠতে পারেননি। পরে সাধারণ–সংখ্যায় বিশেষভাবে বেরিয়েছে তাঁর প্রথম কথাসাহিত্য ‘মনোরমের উপন্যাস’।
তারপর প্রায় তিরিশ–বছর যায়। ‘রৌদ্রছায়ার সংকলন’, ‘গোঁসাইবাগান’–এর মতো কবিতাপ্রবণ গদ্য ছাড়াও তিনি সংবৎসর একটি করে শারদ–উপন্যাস লিখেছেন, লিখেছেন সংবাদপত্রের বিষয়নির্দিষ্ট ফিচার, প্রচ্ছদকাহিনী, ধারাবাহিক রচনা, বেরিয়েছে ‘ফেসবুক’ নামে একটি ভিন্নমাত্রিক গ্রন্থ। বক্ষ্যমাণ গদ্যগ্রন্থ ‘রানাঘাট লোকাল’ তেমনই অতুলনীয় রচনাবলি। বোঝা যায়, তিন–দশকে জয় নিশ্চিতভাবেই তৈরি করে নিয়েছেন নিজস্ব গদ্যভূমি, যা তাঁর কবিতার মতোই বেদনাবিধুর, লাবণ্যময়, তানবিস্তারী, সময়সূচক, আত্মসংশয়ী।
আমরা যারা জয়ের রচনার সামান্য–অনুসরণকারী, তারা জানি, জয়ের গদ্যরচনার সিংহভাগ জুড়েই আছে চূর্ণীনদীবেষ্টিত রানাঘাট নামে এক রহস্যসঙ্কুল জনপদ। বলা যায়, ওই স্থানমাহাত্ম্য জয়েরই প্রণয়ন। এখানে কলকাতা–রানাঘাটের দৈনন্দিন যোগাযোগবাহী ওই লোকারণ্য ট্রেনটি একটি নির্জনতম প্রতীকের মতো সূচনা থেকেই পাঠককে অধিকার করে। রানাঘাট থেকে গেদে বা বনগাঁগামী ট্রেনগুলিও রানাঘাট–লোকাল। কিন্তু, রানাঘাট–শিয়ালদা–রানাঘাটেই জড়িয়ে আছে জয়ের জীবনের স্মৃতিসত্তাসমগ্র। এই গ্রন্থে আমরা তাঁর সহযাত্রী।
জয়ের উপন্যাস প্রায়শই আত্মজৈবনিক হলেও, তাঁর এইজাতীয় উপন্যাসগর্ভ ব্যক্তিগতগদ্যে কাহিনীর আবডাল নেই। প্রখ্যাত–অখ্যাত চরিত্রেরা সেখানে স্বনামেই উদ্ভাসিত। প্রবেশকগদ্যটি জয়ের লবণহ্রদের অভিজাত আবাসন ‘শ্রাবণী’র (‘যেখানে পদস্থ অফিসাররা থাকেন’) প্রেক্ষিতে প্রণীত। আবাসনের–বাগানে খসে–পড়া কাকশিশু তার বিভাব। দীনদরিদ্র জয়ের জীবন ও সাফল্য রানাঘাটের সিদ্ধেশ্বরীতলা থেকে পৌঁছেছে মহার্ঘতর শ্রাবণীতে। কিন্তু, ওই রানাঘাট তার ভিতরে থেকে গেছে অন্ধ, কালো, কুরূপা ট্রেনগায়িকা ‘মনেরো কথা’র গানকলিরই মতো। এই গদ্যে সেই দুই–প্রান্ত একাকার হয়ে যায়। ওই ভিখারিনিই যেন তাঁকে নিয়ে যায় তামাম ধ্রুপদীশিল্পীদের কাছে, রাগানুরাগের গভীরে, নিবিড়–শ্রোতার ভূমিকায়। মাঝখানে থাকেন আরেক অস্ফুট অন্ধগায়ক–ফেরিওয়ালা নিমাই দাস, যিনি সন্ধেবেলা সুরক্ষিত–আবাসনে আসতেন মশলা বিক্রি করতে। যুগপৎ জয়ের হৃদয়ে ফুটে ওঠেন রানাঘাটের বেহালাবাদক ব্যাঁকা খগেনদা ও তবলাবাদক গণেশমামাও। কিন্তু, সেখানে অনুক্ত থেকে যায় কুড়ি–বাইশের গানপাগল বন্ধুর নাম। সে–কেবল জয়ের সাইকেলবাহক, অবিখ্যাত।
এই বই আসলে ধারণ করে জয়ের সম্পূর্ণ জীবনেরই একাংশ, যেখানে জাঁ জাঁক রুশো, পিরানদোল্লা, জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, প্রতিমা ঘোষ, মীনাক্ষী চট্টোপাধ্যায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (প্রথমদর্শন), সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখ উজ্জ্বলতম চরিত্র থেকে রানাঘাটের অসংখ্য আপাততুচ্ছ চরিত্র— মা, বাবা, মৃত্যু, মায়ামাসি, কাবেরী, বুকুন, পাড়া–বেপাড়া বিজড়িত হয়ে আছে পরম মমতায়। পাশাপাশি, সুবিখ্যাত চরিত্রের আধারে রচনান্তরে ওতপ্রোত হয়ে আছে স্বপ্ন সঙ্গীত কবিতা শিল্প ক্রিকেট ক্ষমতা— অবিকল পড়শির মতো। সর্বোপরি, সুখদুঃখের স্মৃতিমালার সঙ্গে  জয় বুনেছেন বহুকথিত বন্ধুত্বতিক্ততা অপমান ও বিশ্বাসঘাতকতা, অনুজের ধৃষ্টতা আর অনাচরণ। লিখেছেন চিরকালীন স্বীকারোক্তি, আর্থিক ও পরমার্থিক দুর্নীতি, অসংশোধনীয়, যা রচনাগুলিকে বেঁধেছে একসূত্রে। কিন্তু, জয় লেখেননি অগ্রজ অনুজ ও সতীর্থদেরও প্রীতি–মুগ্ধতা। লেখেননি, এমনকী, রানাঘাট–স্টেশনের পাঁচ–ছয় নম্বর নির্জন ও পরাবাস্তব প্ল্যাটফর্মেরও কথা, যেখানে রানাঘাট লোকাল আসে ও যায়, যেখানে অনেক অতীত কেটেছে তাঁর বহু সতীর্থের সঙ্গে, অনাবিল বন্ধুতায়ই। সব মিলে এই বই পূর্ণ–অপূর্ণের এক মহাকুম্ভ।‌‌‌‌‌‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top