পবিত্র সরকার
আমার নাই বা হল পারে যাওয়া জ্যোতির্ময় দত্ত 
সম্পাদনা প্রভাতকুমার দাস
অন্বয় • ৩৫০ টাকা
মানুষের সমাজে, হয়তো ‘জিন’-ঘটিত ষড়যন্ত্রে, এমন কেউ কদাচিৎ দেখা দেয়, যার অন্যরকম হওয়ার তীব্র ‘পাগলামি’ তাকে কীসে কীসে আর কোথায় কোথায় যে নিয়ে যায়, তার নিজেকে আর পাশাপাশি অন্যদের ওলট-পালট করার বেপরোয়া ঝুঁকি নিয়ে, তার হিসেব করা সম্ভব নয়। এই আত্মজীবনীর লেখককে এই নানা প্রবল ঝুঁকি নেওয়াতে প্রণোদিত করেছে তাঁর পিতৃসূত্রে প্রাপ্ত দুঃসাহস, আর তাঁকে হয়তো সহজ করেছে তাঁর হাতের এক ব্রহ্মাস্ত্র— পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ভাষা ইংরেজি বলা ও লেখার অনায়াস দক্ষতা। চিন্তায় মার্কসবাদ দিয়ে শুরু করে, (আমাদের মতে) তার মূল না ছেড়েও কখনও প্রাণঘাতী রকমের গান্ধীবাদী, সেই সঙ্গে বান্ধবতা আর জীবিকার সূত্রে ‘সিআইএ–র লোক’ হিসেবে কারও-কারও কাছে ‘অনুমিত’ হওয়া, সামাজিক-বৈষয়িকভাবে সাংবাদিকতার মামুলি অলিগলি থেকে বেরিয়ে পড়ে গ্লাইডারে ওড়া,  বঙ্গোপসাগরে ইলিশের সন্ধান, নৌকো চালিয়ে আন্দামান পাড়ি দেওয়া, রেসের ঘোড়ার জকি হওয়ার প্রশিক্ষণে ঘোড়ার বেয়াদবিতে হাতের কনুই ছিটকে যাওয়া, হইচই-ফেলা লিটল ম্যাগাজিনের প্রকাশনা আর সম্পাদকত্ব, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়ানো, সিকিমের মার্কিন রানির অনুমোদনে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের ছোটদের বইয়ের ইলাস্ট্রেটরের দায়িত্ব পাওয়া, আমেরিকার আইওয়াতে কবিতার কর্মশালাতে যোগ দেওয়া, ময়দানে ক্ষণস্থায়ী ‘মুক্তমেলা’র আহ্বান করা, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পরে স্বয়ং ইন্দিরা গান্ধীর সাক্ষাৎকার নেওয়া, আবার জরুরি অবস্থার সময়ে সেই ইন্দিরা  গান্ধীর জেলখানাতেই বন্দিত্ব— আর এরই পাশাপাশি, অতি গুরুত্বপূর্ণভাবে, বুদ্ধদেবের জ্যেষ্ঠা কন্যা মীনাক্ষী বসুর সঙ্গে এক জেদি ও নাছোড়বান্দা প্রেমপর্বের পর তাঁকে বহু প্রার্থীর মধ্য থেকে জিতে নেওয়া এবং টলোমলো সংসার পাতা— জীবনের প্রথম চল্লিশ বছরের মধ্যেই এত সব কাণ্ড ঘটিয়ে এত সব আত্মপরিচয় গড়ে তুলেছেন জ্যোতির্ময়— আর এও স্পষ্ট যে, সব আত্মপরিচয় পরস্পরের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল না। এর জন্য তাঁকে আর তাঁর কাছের লোকেদের যথেষ্ট মাশুল দিতে হয়েছে।     
ভৌগোলিকভাবেও আনাড়ির ঠুকে-দেওয়া ক্যারমের ঘুঁটির মতো তিনি ছিটকে এখান থেকে ওখানে গেছেন, ওডিশা-অন্ধ্র সীমান্তের রায়গাডা, কর্ণাটকের হসপেট, সেখান থেকে কলকাতা, কলকাতাতে অজস্র ঠাঁইনাড়া, সুন্দরবনের সীমান্ত; কিশোর বয়সে বাড়ি থেকে পালানো, আইওয়া, শিকাগো, আবার কলকাতা। ডায়মন্ড হারবার, রানাঘাট, তিব্বত তাঁর কাছে কিছুই নয়! একটা সময় এমনও ছিল যখন কলকাতার বড় বড় সংবাদপত্রে ইংরেজি-বাংলায় তাঁর লেখা আর কীর্তিকলাপের খবর বেরোত, তাঁকে নিয়ে মধ্যবিত্ত বাঙালি পাঠক তোলপাড় হত।  জ্যোতির্ময় দত্ত। বুদ্ধদেব বসুর জামাতা। শুধু এইটুকু যারা জানে, তারা তাঁর কিছুই জানে না। ফলে আত্মজীবনী লেখার এক্তিয়ার যদি কেউ অর্জন করে থাকেন, তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য একজন জ্যোতির্ময় দত্ত। যাঁরা তাঁকে বাইরে থেকে জেনেছেন তাঁরা এবার তাঁকে ভিতর থেকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে জানবার সুযোগ পাবেন, এই সুযোগটা পাওয়ার জন্য কৃতজ্ঞ থাকবেন এবং এও বুঝতে পারবেন তাঁরা তাঁকে কত কম জেনে এসেছেন এতদিন। সমস্ত খণ্ডিত এবং আরোপিত জ্ঞান এক ফুৎকারে উড়ে যাবে এই বইটি পড়লে।  তাঁর সঙ্গে আরও বহু চেনা-অচেনা মানুষকে, আর জ্যোতির্ময়ের সময়কেও জানবেন পাঠক।   
পাঠক, আপনার প্রতি শুধু সেই শিক্ষামূলক বিবেচনা নিক্ষেপ করছি না আমরা। যে মানুষ শৈশবে-কৈশোরে স্কুলে বাংলা পড়েনি, সেই  মানুষের উপার্জন-করা অসাধারণ বাংলা গদ্য পড়বার আনন্দ পাঠকের কাছে উপরি-পাওনা হবে। কবি এবং সমালোচক হিসেবে তাঁর পরিচয় অনেকে জানে, কিন্তু এই আখ্যানে তাঁর বাবা, মা, বুদ্ধদেব, প্রতিভা বসু, হামদি বে, বিনয় মজুমদার এবং তাঁর পিতা, ক্লিন্ট সিলি ইত্যাদির চরিত্রচিত্রণ দেখে আমাদের মনে হয়, গল্পকার-ঔপন্যাসিক হওয়ার আর-একটি বড় প্রকোষ্ঠ তাঁর পদপাতের জন্য অপেক্ষা করছিল, তিনি কেন যে তেমন করে তার চৌকাঠ পেরোলেন না তা আমাদের প্রশ্নাক্রান্ত করে।    
সুপ্রকাশিত এবং সুমুদ্রিত এই গ্রন্থটিতে কিছু ছাপার ভুল আছে, খুব মারাত্মক নয়। দুটি -একটির সংশোধন জরুরি, যেমন ২৬ পৃষ্ঠায় ‘সুড়ঙ্গের মুখেই’ দিয়ে শুরু বাক্যটিতে ‘রেলব্রিজের’ পরে ‘অবস্থান’ বা ওই জাতীয় একটা শব্দ বাদ গেছে। বা ১৫৭ পৃষ্ঠায় ‘পাল’ হয়ে আছে ‘পা’। ১৬৫-তে ‘সভ্যতার সংকট’–এর প্রকাশ তারিখ হবে ১৯৩৭ নয়, ১৯৪১। বইয়ের শেষদিকে বিশ্লেষণ একটু বেশি জায়গা পেয়েছে বলে মনে হয়।      
একটি ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ। তাঁর বহুকৌণিক জীবনের কাছে এই অধম সমালোচকের জীবন কিছুই না, অতিশয় সাদামাঠা এবং মামুলি। আমাদের যাপন আর বিশ্বাসের জগৎও অনেকটাই আলাদা। কিন্তু বিস্মিত পুলকের সঙ্গে আবিষ্কার করি, তাঁর শিকাগো ত্যাগের পরেই আমি শিকাগোতে যাই, এবং দক্ষিণ এশিয়া বিভাগে তাঁর অভাব কিছুটা পূরণ করি। তাঁর অনেক বন্ধু আমারও বন্ধু, এবং তাঁর পুত্রের জন্মদান করেন উডলন হাসপাতালের যে ডা.ওয়াখটেল, বিচিত্র সমাপতনে তিনিই ছিলেন আমারও জ্যেষ্ঠা কন্যার জন্মের অভিভাবক।    
এখন জ্যোতির্ময় একটু নিঃশব্দ, তিনি যে কলকাতায় আছেন তা-ই লোকে জানে না— এইটেই আমাদের কাছে বিপুল বিস্ময়  বলে মনে হয়। আত্মজীবনীর পরের খণ্ডের জন্য আমরা গভীর আগ্রহ নিয়ে আছি। ‌■

জনপ্রিয়

Back To Top