মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়
আধুনিক ভারতীয় দর্শন • সম্পাদনা সেবন্তী ভট্টাচার্য • এবং মুশায়েরা • ৩০০ টাকা‌‌
ভারতীয় দর্শন ঘরানা–আশ্রয়ী আর পাশ্চাত্য দর্শন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত— এরকম একটা ধারণা বেশ চালু আছে। কিন্তু ভারতীয় দর্শনের প্রখ্যাত ভাষ্যকারদের যুক্তিপ্রস্থানকেও কি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত বলা যায় না? শঙ্করাচার্য বেদান্তের যে ভাষ্য রচনা করেন তা নিঃসন্দেহে একটি পৃথক দর্শনের মর্যাদা লাভ করতে পারে। তাঁর ‘অদ্বৈতবাদ’ বা ‘নির্গুণ ব্রহ্মবাদ’ একটি বিশেষ দর্শন, কারণ তার যুক্তিপ্রস্থানে রয়েছে স্বতন্ত্র পদ্ধতিতন্ত্র। অন্যদিকে, পশ্চিমেও ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের মতো ঘরানা–আশ্রয়ী দর্শনের নিদর্শন মেলে একালে। আসলে এই দুই গোলার্ধের দার্শনিক বিচার প্রণালীর পার্থক্যের ইতিহাসটা অন্যত্র নিহিত। ভারতবর্ষে ধর্ম আর দর্শনের সম্পর্কটা ছিল পরস্পর ওতপ্রোত। রাধাকৃষ্ণন রবীন্দ্রনাথের চিন্তার মধ্যে এমন একটা কাঠামো দেখতে পেয়েছিলেন। কিন্তু যদি বাবাসাহেব আম্বেদকরের চিন্তাকাঠামোর হালহদিশ ব্যতিরেকে তাঁর সংগ্রামী জীবনের আলেখ্যই শুধু আমরা রচনা করি, তবে তাঁকে ‘দার্শনিক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা বোধহয় মুশকিল হয়! যে–কোনও মনীষীর কর্মজীবন ও ভাবজীবনের মধ্যে নিহিত একটা স্ট্রাকচার নজর করা এক্ষেত্রে খুব জরুরি। সেবন্তী এবং তাঁর নির্বাচিত আলোচকেরা অবশ্য যথাসাধ্য তা করেছেন।
আলোচনার জন্য সেবন্তী নির্বাচন করেছেন রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, গান্ধীজি, শ্রীঅরবিন্দ, ইকবাল, রাধাকৃষ্ণন ও বাবাসাহেব আম্বেদকরকে। তালিকায় রাহুল সাংকৃত্যায়নের মতো আরও কিছু নাম নিশ্চয় যুক্ত হতে পারত, কিন্তু যে ‘সপ্তর্ষি’কে তিনি বেছে নিয়েছেন তা–ও সুবিবেচনাপ্রসূত। বিশেষ করে ইকবাল এবং আম্বেদকরের জন্য তিনি অবশ্যই ধন্যবাদার্হ। এঁদের প্রত্যেকের চিন্তাপ্রস্থান নিয়েই আলাদা আলাদা বই হতে পারে। রবীন্দ্রনাথের মতো চিন্তকের চিন্তাকাঠামোর ব্যাপ্তি ও বহুস্তরিকতা একটিমাত্র প্রবন্ধে আঁটানো নিশ্চয়ই দুঃসাধ্য। সেবন্তী স্বয়ং সেই দুরূহ কাজটি করেছেন যোগ্যতার সঙ্গে। এ ছাড়া রয়েছে যথাক্রমে সর্বানী ব্যানার্জি, অপর্ণা ব্যানার্জি, ইন্দ্রাণী সান্যাল, ভূমিকা কাঞ্জিলাল, নির্মাল্য নারায়ণ চক্রবর্তী এবং কৃষ্ণা দাশগুপ্তের মননশীল আলোচনা। নির্মাল্য নারায়ণবাবু ছাড়া বাকিরা সবাই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ডক্টরেট। আবশ্যিক না হলেও লেখক নির্বাচনের ক্ষেত্রে এই একক প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক কনস্টেলেশনটা এড়াতে পারলেই বোধহয় ভাল হত।
এড়াতে পারলে ভাল হত বইটির বেশ কিছু মুদ্রণপ্রমাদ। তবে ফরাসি পল এবং মীরা রিশার যে ‘রিচার্ড’ (পৃ. ৮৩) হয়েছেন তা বোধকরি মুদ্রণপ্রমাদজনিত নয়!‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top