প্রশান্ত মাজী: ‘‌শব্দকে ভালোবাসে সে। বাড়ি বানানোর স্বপ্ন দেখত। শব্দে গেঁথে তুলত আশ্চর্য ঘরদোর আর দেখত ধূ ধূ কথাদের মেঘ জমে যাচ্ছে ছাদে।’‌ এই শব্দশিল্পীই শ্রুতি, শ্রুতিধর মুখোপাধ্যায়। তার রচনাসংগ্রহের মুখবন্ধে লিখেছে তারই ঘনিষ্ঠ কোনও এক বন্ধু, নাম উহ্য রেখে। শ্রুতি মূলত কবি। এই রচনাসংগ্রহে রয়েছে তাঁর অগ্রন্থিত গদ্য— উপন্যাস একটি, দুটি বড় গল্প আর আটটি গল্প। এর আগে আমরা তার একটি উপন্যাস, একটি গল্পগ্রন্থ আর একটি কাব্যগ্রন্থ, কাব্যপুস্তিকা পেয়েছি। সব মিলিয়ে ইছামতীর তীরে বেড়ে ওঠা শ্রুতিরই জীবনকাহিনি যেন দেখতে পেয়েছি এই রচনাগুলিতে। শ্রুতির সম্পাদিত পত্রিকা ‘‌সহযাত্রী’‌ যার এক প্রকাশ অনুষ্ঠানে আমরা তার পাশে অল্প সময়ের জন্য একদা দাঁড়িয়েছিলাম। সে প্রতি মুহূর্ত ঢেকে দিতে চাইছিল তাঁর দুরারোগ্য ব্যাধির বিষণ্ণতাকে। পারেনি। লম্বা লম্বা পা ফেলে সে চলে গেল বড় তাড়াতাড়ি। কিন্তু সে তো আসলে যায়নি। আমরা তাকে এই যে পাচ্ছি— রচনাসংগ্রহে তার প্রয়াণের পর তার নিকট–বন্ধুরা কারও সাহায্য না নিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে নিজেরাই প্রকাশ করেছে ঝকঝকে ছাপায় প্রায় তিনশো পৃষ্ঠার এই চমৎকার গ্রন্থটি। শাশ্বত প্রকাশনী থেকে। উৎসর্গীকৃত হয়েছে ভালবাসার মানুষজনদের উদ্দেশে— সে যা চেয়েছিল। একবার সে বলেছিল, ‘‌‌আমার নয়, শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর দমবন্ধ হয়ে এল’—‌ তাই যেন সত্য হয়ে দাঁড়াল। শ্রুতির বিয়াল্লিশ বছরের রণরক্ত সফলতা বিফলতা— ছোট্ট জীবনের পথের পাঁচালি গীত হয়েছে যেন এই সংগ্রহে। শ্রুতির ‌সহযাত্রী‌ পত্রিকা, গল্প, উপন্যাস, কবিতা, বসিরহাট, ইছামতী, বিদ্যাধরী, তার গ্রাম— সব মিলেমিশে এক মোহনায় যেন মিশেছে এই রচনাগুলিতে। ভালবাসা ছাড়া শ্রুতির আর দেওয়ার কী ছিল?‌ ছিল এই রচনাসংগ্রহের প্রতিটি ছত্রে সেই ভালবাসা।
ন্যারেটিভে লেখা। নিজের এক গদ্যরীতি, ফরম প্রস্তুত করেছিল শ্রুতি। এক সুখপাঠ্য আর ঝরঝরে ভাষায় সে লিখেছে ‘‌বাস স্টপে একজন’‌–‌এর মতো গল্প। গল্পের একজন নীলু নিজেকে ভাবত এক নির্জন বাস স্টপের মতো, যেখানে কেউ নামা–ওঠা করে না। সেই নীলুর অবশেষে ডাক একদিন এল দু’‌জনের কাছ থেকে আন্তরিক আহ্বানে। শেষ পর্যন্ত তা–ও যখন প্রতারণা করতে উদ্যত, এল সেই মুহূর্ত, যার জন্য এতদিন নীলু অপেক্ষাই করে গেছে। কবি নীলুর হাত ভরে গেছে কবিতায়, যা তার কাছে সব।
 সব গল্প অবলীলায় লিখেছেন শ্রুতিধর। আর ছোট্ট বলয়ে উঠে এসেছে বসিরহাট–‌ইছামতীর ধারে আধা গ্রাম আধা শহরের মানুষজন, তাদের চাওয়া–পাওয়া, ছলনা। বড় গল্প ‘‌টোপ’‌ সেরকমই এক রোমহর্ষক গল্প। ডাকাতি, ছুরি, ছিনতাই করা মানুষদের নিয়ে। আঞ্চলিক ভাষা, কথোপকথন, প্রকৃতি, মনুষ্যচরিত সব নিখুঁত নিপুণ তুলিতে এঁকেছেন শ্রুতিধর।
আর ‘‌যুগলকিশোর হে’‌— বড় পটভূমিতে এই সংগ্রহের একমাত্র উপন্যাসে শ্রুতিধরের শক্ত কলমের পরিচয় পাওয়া যায়। গল্প বা বড়গল্প যদি তার ছোট্ট উঠোন হয়, ‘‌যুগলকিশোর হে’‌ শ্রুতিধরের সেই উন্মুক্ত আকাশ, যেখানে উড়ছে তার দেখা ও যাপিত জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের আঁকা জলছবির ড্রয়িং। লৌকিক ছড়া–গান, কৌতুক, ভালবাসা–মন্দবাসা চিরায়ত হয়ে ধরা দিয়েছে এই উপন্যাসের পরতে পরতে। লেখক উত্তীয়র উপন্যাস যেন ক্রমে বিস্তার লাভ করেছে এই কাহিনির বিচিত্র সব চরিত্রের মাধ্যমে। খালপাড়ের মাচাবুড়ির ঝুপড়ির পাশাপাশি লাবণ্য অ্যাপার্টমেন্টের ঊষশীর সজনে ফুলের মতো ঝরে পড়া হাসি আর সঙ্গ বা যুগলকিশোর সম্প্রদায়ের সঙ্গে নিজের দুই সত্তার প্রেম আর শরীরী সম্পর্কের সাদৃশ্য— সবই উত্তীয়র জীবনকে পূর্ণ করে তোলে।
শ্রুতিধরের বন্ধুদের সমবেত প্রয়াসে এই রচনাসংগ্রহের প্রকাশ পাঠকের কাছে এক উন্মোচন। সেই উন্মোচন শুধু এক সম্প্রদায় নয়, বহু সম্প্রদায় আর প্রেম–‌অপ্রেমের রসে সিঞ্চিত জীবনকাহিনি পাঠককে চিরায়তর স্পর্শ দেয়। পাঠক সমৃদ্ধ হয়। শুভাশিস চক্রবর্তীর প্রচ্ছদ আর কবি মণিদীপা বিশ্বাস কীর্তনিয়ার তত্ত্বাবধানে প্রস্তুত এই প্রকাশনা রীতিমতো উচ্চমানের। ■
রচনা সংগ্রহ •‌ শ্রুতিধর মুখোপাধ্যায় • শাশ্বত প্রকাশনী •‌ ২৫০ টাকা

জনপ্রিয়

Back To Top