অর্ণব হালদার
রাষ্ট্রীয় মদতে কিছু প্রাচীন ভ্রান্তবিশ্বাসকে অপবিজ্ঞানের মোড়কে হাজির করার অভিসন্ধির সময়কালে দাঁড়িয়ে অতীত ভারতের যথার্থ গৌরবময় ঐতিহ্যকে জনসমক্ষে প্রকাশ করা অত্যন্ত জরুরি। চিকিৎসাবিজ্ঞান তথা ভেষজবিদ্যার ক্ষেত্রে স্বয়ম্ভর প্রাচীন ভারতকে সারা বিশ্ব শ্রদ্ধা করত। এই জ্ঞানকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে ব্যবহার করে ওষুধ সংশ্লেষণের আধুনিক পথ দেখিয়েছিলেন রসায়ন বিজ্ঞানী অসীমা চট্টোপাধ্যায়। ভাটনগর পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রথম মহিলা বিজ্ঞানী, পদ্মভূষণ, ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের সভাপতি। ২০১৭ সালে তাঁর জন্মশতবর্ষ স্মরণ করে জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখক অধ্যাপক শ্যামল চক্রবর্তী ১৮৪ পাতার বইয়ে বিজ্ঞানীকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। শুরুতেই অসীমা চট্টোপাধ্যায়ের কন্যা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতপূর্ব অধ্যাপক জুলি ব্যানার্জি লিখেছেন— “‌কী লড়াই করে মা ‘‌বিজ্ঞানী অসীমা চট্টোপাধ্যায়’‌ হয়ে উঠেছিলেন, বইটি পড়লে আমাদের ছেলেমেয়েরা জানতে পারবে।”‌ বইটিতে এই কথারই প্রতিফলন ঘটেছে। এক নারীর বিজ্ঞানসাধনা, গবেষণার প্রতি উৎসর্গীকৃত মন, কর্মনিষ্ঠা ও বিজ্ঞানকে দেশের মানুষের হিতার্থে প্রয়োগের অভীপ্সা যে–কোনও তরুণ গবেষক কিংবা ছাত্রছাত্রীর প্রেরণা হতে পারে। ছাত্রছাত্রীদের কাছে ‘‌মাস্টার’‌ বলে পরিচিত বিজ্ঞানীর সংক্ষিপ্ত জীবন–‌পরিচয়, একাধিক আলোকচিত্র, সম্মাননাপ্রাপ্তি ও গবেষণাপত্রের তালিকার সঙ্গে সমাজের বিশিষ্টদের শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছাবার্তার প্রতিলিপি বইটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। জীবন–‌পরিচয়ে জানা যায় বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু প্রতিষ্ঠিত ‘‌বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ’‌ থেকে প্রকাশিত ‘‌জ্ঞান বিজ্ঞান’‌ পত্রিকায় অসীমা চট্টোপাধ্যায়ের সামাজিক দায়বদ্ধতাস্বরূপ একগুচ্ছ লেখার কথা। লেখাগুলিতে তাঁর জীবনে বাবা–‌মা, স্বামী, দিদা–‌ঠাকুমার ভূমিকা, শৈশব–‌কৈশোরের দিনলিপি, সত্যেন্দ্রনাথ বসুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং ভেষজবিজ্ঞানের নানা অজানা তথ্য ফুটে উঠেছে। একটি উল্লেখযোগ্য লেখা— ‘‌রসায়নে অধ্যাপক সত্যেন্দ্রনাথ বসুর অবদান’‌। সুদীর্ঘ গবেষণা–জীবনে মৃগী ও ম্যালেরিয়ার ওষুধ আবিষ্কারের পাশাপাশি ছয় খণ্ডে ভারতীয় ভেষজ উদ্ভিদ সংক্রান্ত একটি বইয়ের সম্পাদনা এবং কলকাতায় আয়ুর্বেদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ তাঁর সুদূরপ্রসারী দূরদৃষ্টির পরিচয় দেয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, ভারতের মতো গরিব দেশে ভেষজ পদ্ধতিতে চিকিৎসাই একমাত্র পথ। বইয়ের শেষভাগে সঙ্কলিত সাক্ষাৎকারভিত্তিক রচনায় জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কাজ করে যাওয়ার আন্তরিক বাসনা ব্যক্ত হয়েছে। শুধুমাত্র বিজ্ঞান অনুরাগী পাঠকেরাই নন, যে–কোনও মননশীল মানুষ সংগ্রহে রাখতে পারেন নানা জানা–অজানা তথ্যে ভরা এই সার্থক শ্রদ্ধাগ্রন্থ।‌‌‌‌ ■
বিজ্ঞানী অসীমা চট্টোপাধ্যায় • শ্যামল চক্রবর্তী 
দে’‌জ পাবলিশিং • ২০০ টাকা

জনপ্রিয়

Back To Top