দেবেশ রায়: জিপসি রাত • অমরেন্দ্র চক্রবর্তী • আনন্দ পাবলিশার্স • ২০০ টাকা
আড়ালে একটা গান তোলা হচ্ছিল। আমার কানে পৌঁছচ্ছিল সেই তোলার প্রয়াসটুকু। একটা খুব চেনা চরণ বারবার, বারবার গাওয়া হচ্ছিল, ‘‌দাঁড়িয়ে আছ তুমি এ কি’‌।‌ যে তুলছিল সে নিখুঁত স্বরলিপিকে নিজের কণ্ঠের নিজস্ব উচ্চারণে আনতে চাইছিল— ‘‌দাঁড়িয়ে আছ। তুমি?‌ এ কী!‌’‌ স্বরলিপির তালের ও পর্বের বাধ্যতা সত্ত্বেও বাচ্যের মধ্যে যে–অপ্রস্তুত বিস্ময় নিহিত আছে তাকে কণ্ঠে আনতে চাইছিল। কঠিন, খুব কঠিন কাজ। কিন্তু কেউ যদি সেই অপ্রস্তুত বিস্ময় বোধ করে থাকে আর তার গলায় যদি সে সামর্থ্য থাকে, তা হলে সে পেরে যায়, পৌঁছোতে।
অমরেন্দ্র চক্রবর্তীর উপন্যাস, ‘‌জিপসি রাত’‌ পড়ে আমার সেই আড়াল থেকে গান–‌তোলা শোনার অভিজ্ঞতা ঘটল।
একটা বই, কী নিশ্চিতভাবে সব যুক্তি, সম্ভাব্যতা, ধারাবাহিকতা, ঘটনাক্রমের অভ্যস্ত ধারণাকে অবান্তর করে দেয় আর সেগুলোর অবান্তরতার ভিতর থেকে উপন্যাসের যে–উচ্চারণে পৌঁছোতে চাইছিলেন ঔপন্যাসিক সেই উচ্চারণই পৌঁছে যায় পাঠকের কানে, যে সব সময়ই আড়াল থেকে শোনে, আর শোনে তার নিজের ক্ষমতা অনুযায়ী, পাঠক তো সত্যি জানে না— ঝড় জয়ধ্বজা হতে পারে, ঘরভরা শূন্যতারও বক্ষস্পন্দন থাকে।
এ–উপন্যাসের বিস্তার মস্কোর মে–ডে সমাবেশে গর্বাচভের ভাষণ থেকে রোমানিয়া থেকে কলকাতা থেকে কাশী থেকে পূর্ব ও পশ্চিম সুন্দরবন থেকে কলকাতার পুরোনো বালিগঞ্জ থেকে বড়–বড় হোটেল, ভাড়াটে বাড়ি, প্রোমোটারি— কী না। অমরেন্দ্র দক্ষ ও সমর্থ নির্বিকারে এই বিপুলায়তন বিস্তারের কোনও কার্যকারণের শৃঙ্খলা তৈরিতে সময় ব্যয় করেননি। কিন্তু তাঁর নিশ্চিতজ্ঞানে, তিনি জানেন আমাদের আধুনিক জীবনে এমন চলৎবিস্তার আজ যে–করোরই ঘটে যেতে পারে।
এটা জানতে পারা ঔপন্যাসিকের প্রাথমিক অনুভব যা শক্তিতে বদলে যায়। অথচ, ঘটনার একটা কার্যকারণ তিনি ঠিকই দিয়ে যান, যার অভাবে তাঁর উপন্যাসের বাস্তব, খাপছাড়া হয়ে যেতে পারে। এমন দৃঢ়নিবদ্ধ মাত্র ২১৩ পৃষ্ঠার, আনুমানিক মাত্র ৬৪০০০ শব্দের ও ১৮টি অসমান পরিচ্ছেদের উপন্যাসের বাস্তব যদি একবার খাপছাড়া হয়ে যায়, তবে তার আর কোনও মেরামতি সম্ভব নয়। দু–‌চার জায়গায় আমি তো ঠেকেও গেছি। একটি লাইনেই যেমন করে ঘটনাস্থল বা ঘটনাকাল বদলে যায়, তাতে, যতিচিহ্ননিষ্ঠ আমার মনে হয়েছে যে একটু লাইন ছেড়ে দেওয়া বা অন্তত একটা প্যারা থাকলে তো সুবিধা হত। আবার, কয়েক লাইন পরেই তেমন অসুবিধের কথা ভুলেও গেছি।
এ উপন্যাসটির ধারকচরিত্র সুধীন যে এক ঘূর্ণিপাকের মতো সময়ের ভিতর ঢুকে পড়েছে আকস্মিক, উপন্যাসটির আকার সেই ঘূর্ণাবর্তকেই গঠন দিয়েছে। উপন্যাসে এমনটি ঘটে না। আমরা বেশিরভাগ সময়ই আকারের বাধ্যতায় আটকে যাই— উপন্যাসের বড় আকারের মধ্যে যে অসংখ্য ছোট–ছোট আকার গড়ে ওঠে ও ভেঙে যায়, ও তেমন গড়ে ওঠা ও ভেঙে যাওয়াটাই উপন্যাস, সে–বিষয়ে উপন্যাসের লেখক ও পাঠক কেউই সব সময় খুব একটা খেয়াল রাখেন না। ফলে, অনেক লেখকই, বা ভাল পাঠকও, উপন্যাসের শুরু থেকে গল্পের যে– আকারটার ভিতর ঢুকে যান, তা থেকে প্রয়োজনেও বেরোতে পারেন না। ভুলে যান, উপন্যাস, বাধ্যত কোনও একটি কাহিনীর আধার নয়।
অমরেন্দ্র–‌এর এ–উপন্যাসটিতে লোকজনের পরস্পরের প্রয়োজনীয় দেখাসাক্ষাৎও ঘটে যায় আচমকা, দরজা খুলে বা দরজা ঠেলে। তারপর তারা যে বাড়িতে বা ঘরে কে কোথায় আছে, তা একেবারেই প্রয়োজনীয় নয়। কেউ কোথাও যাওয়ার জন্য বেরোয় না। না খেয়ে তো মানুষ বাঁচতে পারে না, না ঘুমিয়েও পারে না— সে–সব একরকম করে হয়ে যায়। খাওয়া ও শোয়ার অনেক বিবরণ আছে। দরজা খোলারও নানা কৌশল। বাড়িতে অনেক ভাড়াটে থাকেন। তাঁরা দু–‌একবার প্রয়োজনীয় মুহূর্তে দেখা দিয়ে, তাঁদের কাজটুকু করে বা কথাটুকু বলেই হারিয়ে যান। এমন–কি, মৃত্যুমুখী এক পাঞ্জাবি সম্ভাব্য মৃত্যুর মুহূর্তেও রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করেন ও সুধীনের দরকারি কাজ ঠেকিয়ে দেন।
লোকজনের এমন অনবরত আসা–যাওয়ার ফলে ও ট্রেনে– ট্রামে–বাসে–প্লেনে— নানা ধরনের নৌকোয়–রিকশায়– অটোতে–ট্যাক্সিতে যাতায়াতে উপন্যাসটির জায়গাগুলো একটা গতিবিস্তার পেতে থাকে— স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম বা জাহাজঘাটার মতো— এয়ারপোর্টের লাউঞ্জের মতো নয় বা হাল আমলের বড় রেল–স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের মতো ‘‌সচ্‌ছ’‌ নয়— তার বিপরীতে প্রাণবান ও গতিবান। বারাণসী বা ক্যানিংয়ের বিখ্যাত বা অখ্যাত বেশ্যাপল্লির অলিগলিও কিন্তু চলমান, মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজের তাপ ছড়াচ্ছে। কোথাও কোনও অজানা বা জানা রহস্য থাকে না। পুরো গল্পটার অসম্ভাব্যতাকে এমন স্বাভাবিক ও সহজ করে তুলতে ঔপন্যাসিককে অনেক অনেক পরিস্থিতি লাফিয়ে পার হতে হয়েছে, পরিভাষা ব্যবহার করতে হলে বলতাম, অনেক ঘটনা ‘‌এলিমিনেট’‌ বা মুছে ফেলতে হয়েছে। অমরেন্দ্রর উপন্যাসটি এমন মুছে–ফেলার কারুকার্যে ঠাসা। যা বলাই হয়নি তারও কিন্তু মুছে ফেলার দাগ আছে।
খটকা যে আমার একেবারে লাগেনি, তা নয়। এ গল্পে মানবসম্পর্কের যে–আধুনিকতা কল্পনা করা হয়েছে, তার সঙ্গে সুধীনের বাবার জীবনব্যাপী অনুতাপদহনের কোনও সম্বন্ধ ঠিক সাজিয়ে নেওয়া যায় না, বিশেষ করে যে–হত্যা তিনি ঘটিয়েছিলেন কাশীর গঙ্গার ঘাটে তা না–ঘটানোর অজস্র উপায় ছিল। সারা জীবন অনুতাপ বইবার মতো বলবান মানুষ তিনি ছিলেন না। হলে সুধীনের জন্ম হত না। অথচ তাঁর অনুতাপী ডায়েরির আত্মস্বীকারোক্তি সুধীন–‌যমুনা সম্পর্ক তৈরি করে তুলল। এমন উপন্যাসের মাহাত্ম্য এমন কার্যকারণে ক্ষুণ্ণ হয়ে রইল। যমুনার সঙ্গে সুধীনের সঙ্গমের আকস্মিকতা এ উপন্যাসের স্বরলিপির সঙ্গে মেলে না। নাই মিলতে পারে যদি লেখক তেমন ক্ষুণ্ণতা থেকেও কোনও মহৎ সন্ধান ঘটাতে পারেন। সেটাই উপন্যাস।
১১ পরিচ্ছেদ থেকে যমুনার যে–সন্ধান সুধীনের শুরু হয়, তার জীবনপণ লড়াই, সুন্দরবনের নিভৃত পল্লিতে ও আবাদে ও নদীপথে ও আলপথে, নতুন সব সম্পর্ক গড়ে ওঠা ও ভেঙে না–‌যাওয়ার নিয়তি যে ভবিতব্য হয়ে ওঠে, আবার পশ্চিম সুন্দরবনে সেই সন্ধানই যে আধাশহুরে সত্য হয়ে ওঠে, তাতে সুধীনের বাবার ডায়েরি ভুলে যেতে হয়। লেখকের কল্পনার ও লেখনের জাদুতেই এটা ঘটেছে। পড়ার পর নিভৃত ভাবনায় মনে হয়, বাবার ওই ডায়েরি না পড়লেও সুধীনের যমুনাসন্ধান এমনই মহৎ এক সন্ধান হতে পারত। হয়তো মহত্তরই হত। ১১ থেকে ১৮ এই আটটি পরিচ্ছেদেই সবচেয়ে বেশি পরিমোচন ঘটেছে। লেখা মুছে দেওয়া। না–লিখেও মোছা। মোছার দাগটা থাকে, অক্ষর থাকে না।
উপন্যাসের শেষে আমরা একটা স্বস্তিতে পৌঁছোই। মানবিক স্বস্তিতে। সেই স্বস্তিবোধ থেকেই রূপকথার মতো একটা পাঠ তৈরি হয়ে ওঠে। উপন্যাসের রূপকথা হয়ে ওঠা নিশ্চয়ই ভাল কথা নয়। কিন্তু উপন্যাস, উপন্যাস থেকেও যদি রূপকথাকে সত্য করে তোলে ও রূপকথা যদি উপন্যাসের মতোই যুক্তিকঠিন সত্য হয়ে ওঠে, তা হলে তো মানতেই হবে, অন্যরকম কিছু একটা ঘটছে উপন্যাসে।
সত্যিই অন্যরকম কিছু একটা ঘটছে উপন্যাসে।
অনিতা অগ্নিহোত্রী–‌র ‘‌মহানদী’‌, আফসার আমেদ–‌এর ‘‌সেই নিখোঁজ মানুষটা’‌, অমর মিত্র–র ‘‌কুমারী মেঘের দেশ চাই’‌, নলিনী বেরা–র ‘‌মাটির মৃদঙ্গ’‌, বিমল লামা–র ‘‌রুশিকা’‌ ও অমরেন্দ্র চক্রবর্তীর ‘‌জিপসি রাত’‌ যদি পর–পর পড়ে ফেলা যায় বা পর–পর মনে করাও যায়, তা হলে এই লেখকরা যে–দাপটে নিরন্তর তোলপাড় করে তুলছেন তাঁদের কল্পনার সামর্থ্যে ‘‌আয়তন’‌ বা ‘‌দেশ’ বা ‘‌পরিসরের’‌ চেতনা, তাতে আমাদের উপন্যাসচর্চা স্বয়ম্ভর বিশ্বায়তন লাভ করছে।
আর কী অব্যর্থ ও বহু অর্থক এইসব আয়তনসন্ধান। ভারতের মধ্যভূমি চিরে বয়ে যাওয়া মহানদী, মধ্য বাংলার এক গ্রাম— আফসারের উপন্যাসটির সঙ্গে তো অমরেন্দ্রর এই উপন্যাসটির কাহিনীগত মিলও আছে— গহন— আর পশ্চিম–উত্তরের ঝাড়গ্রাম–সন্নিহিত ভূমিখণ্ডে যখন লোকায়তের বিশিষ্টতা খোদাই করা হচ্ছে, তখন অমর মিত্রের উপন্যাসে অতি–অতি–সীমান্ত চিহ্নিত দেশে উধাও হয়ে যাচ্ছে ছিটমহলের মানুষ— যাদের কোনও দেশই নেই।
‘‌জিপসি রাত’‌–‌এর প্রসঙ্গেই এই আয়তনবান উপন্যাসগুলির কথা মনে এল। কিন্তু এটাই তো একমাত্র ধরন নয়। ধারাবাহিক পড়ছিলাম কিন্নর রায়ের ‘‌শ্রীচৈতন্য’‌ যেখানে সময়কে খুঁড়ে তোলা হচ্ছিল।
স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ‘‌হলদে গোলাপ’‌ কতটাই অনায়াসে চিরকালের লালিত এক রহস্যগোপন সম্পর্ককে একেবারে আমাদের দৈনন্দিনে নামিয়ে এনেছেন, যা আঁদ্রে জিদ ও আরও অনেকে পারেননি।
আমাদের অভাবটা কী?‌ আমরা আমাদের লেখকদের বিশ্বাস করছি না, নাকি, আমাদের লেখকরাই নিজেদের বিশ্বাস করছেন না?‌
অথচ আমরা তো আড়াল থেকে শুনতে পাচ্ছি, আমাদের ঔপন্যাসিকরা স্বরলিপির প্রতি পরম বাধ্যতাকে নিজের আপন উচ্চারণের যতিচিহ্নসহ তুলে নিয়ে আসছেন— ‘‌দাঁড়িয়ে আছ। তুমি?‌ এ কি!‌‌’‌‌‌‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top