লেসনস ইন লিভিং:‌ স্টোরিজ ফ্রম দ্য লাইফ অফ ত্রিগুণা সেন •‌ ন্যাশন্যাল কাউন্সিল অফ এডুকেশন, বেঙ্গল • ৬০০ টাকা
ঐতিহাসিকেরা বলেন, ইতিহাস লেখা উচিত আত্মস্মৃতি, দলিল দস্তাবেজ, প্রাসাদ বা মন্দির–‌মসজিদের গায়ে সাঁটা ট্যাবলেট ও সময়পঞ্জি, শিলালিপির মতো পাথুরে প্রমাণের ভিত্তিতে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ড.‌ ত্রিগুণাচরণ সেনের বেলায় প্রায় কোনওটাই বিশেষ লভ্য নয়। গত শতাব্দীর শুরুর দুটি যুগ যদি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত স্রষ্টা স্যার আশুতোষের হয়, তা হলে বিংশ শতাব্দীর চল্লিশ, পঞ্চাশ ও ষাট দশক যাদবপুরের প্রাণপ্রতিষ্ঠাতা ড.‌ সেনের। স্যার আশুতোষ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সেরা শিক্ষকদের এনে কলকাতাকে অবিভক্ত ভারত শুধু নয় দক্ষিণ এশিয়ার অক্সব্রিজ করে তুলেছিলেন। একই পদ্ধতিতে ড.‌ সেন যাদবপুরকে ভবিষ্যতে দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠার পথ করে দিয়েছিলেন। তিনিই ২৫ বছরের এক তরুণকে অর্থনীতির বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক পদে নিয়োগ করেন। তাঁর নাম অমর্ত্য সেন। এই বিশ্ববিদ্যালয় যেন ছিল তাঁর ভবিতব্য। তাঁর জন্ম ১৯০৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর আর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয় ১৯৫৫–‌র ২৪ ডিসেম্বর। তখন তাঁর নিজের বয়স ৫০ এবং ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ছাত্র, শিক্ষক, প্রিন্সিপ্যাল ও রেক্টর হিসাবে সম্পর্ক ২৫ বছর তখন পার হয়েছে।
পুরোপুরি আত্মপ্রচার বিমুখ ড.‌ সেন নিজের সম্বন্ধে বলতে সর্বদাই সঙ্কোচ বোধ করতেন। ইন্টারভিউ দিতেন ক্বচিৎ কদাচিৎ। ছাত্র ও শিক্ষকদের জন্য তাঁর বাড়ির ও অফিসের দরজা সর্বদাই খোলা থাকত। একদা কলকাতার মেয়র। ইন্দিরা গান্ধীর আমলে প্রথমে দু বছর শিক্ষামন্ত্রী, পরে দু বছর পেট্রোলিয়াম, মাইন, মিনারেলস দপ্তরের মন্ত্রী, টানা সাত বছর (‌১৯৬৭–’‌‌৭৪)‌ রাজ্যসভার সদস্য নিজেই এক জায়গায় লিখে গেছেন ‘‌এই বিশাল পৃথিবীর কোথাও আমার কোন ঘর নেই, নেই একটুকরো জমি।’‌
আজ জীবিত থাকলে ড.‌ সেনের বয়স হত ১১৩ বছর। নিজের বলতে রেখে যান ২ কন্যা, নাতনি আর অগণিত গুণমুগ্ধ ছাত্র, ছাত্রী, শিক্ষক যাঁরা আজ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের জনক সংস্থা জাতীয় শিক্ষা পর্ষদ এই অসামান্য ছাত্রদরদি শিক্ষাব্রতীর জীবনের টুকরো টুকরো ঘটনা সাজিয়ে ইতিহাসাশ্রিত যে জীবনী গ্রন্থটি রচনা করেছেন তা গত ৯ জুলাই ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্দুমতী সভাগৃহে এক অনুষ্ঠানে ছত্তিশগড়ের প্রাক্তন রাজ্যপাল শেখর দত্ত (‌আইএএস)‌ প্রকাশ করেন। ওই দিনই ড.‌ সেনের ব্যবহৃত জিনিসপত্র, তাঁর চিঠি, ইত্যাদি নিয়ে একটি আলেখ্যাগারও উন্মোচিত হয়। ঋষি অরবিন্দ, রবীন্দ্রনাথ বঙ্গভঙ্গের সময় যে প্রকৃত জাতীয় শিক্ষাদানের পথ দেখিয়েছিলেন, ড.‌ সেন তাকেই প্রশস্ত রাজপথে পরিণত করেন। তাঁর ব্যক্তিগত সেবক, আত্মীয়স্বজন, প্রাক্তন ছাত্র, ড.‌ সেনের প্রাক্তন মাস্টারমশাই, তাঁর আমলের শিক্ষক, প্রশাসক সকলের মৌখিক সাক্ষ্যের প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে এই জীবনীগ্রন্থ। এ ধরনের জীবনীগ্রন্থ সম্ভবত এই প্রথম।

 

অরবিন্দ ভবন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি:‌ বিজয় সেনগুপ্ত

জনপ্রিয়

Back To Top