মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়: প্রবন্ধ পঞ্চাশৎ : সংস্কৃতি ও সাহিত্য • অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য • পারুলবই • ৫০০ টাকা

বঙ্কিম ও রবীন্দ্রগবেষক হিসাবেই মূলত অধ্যাপক অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য বাংলা সারস্বত সমাজে সুপরিচিত। কিন্তু বঙ্কিম–রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও বাংলা সাহিত্য–সংস্কৃতি বিষয়ে তাঁর অন্যতর অনুসন্ধিৎসার পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর গবেষণাবৃত্তি, স্মৃতি ও সত্তার সঙ্গে বিশেষভাবেই আশ্লিষ্ট সেই ‘সংস্কৃতি’চেতনা। সমালোচক হিসেবে তাঁর স্থানাঙ্ক নির্ণয় করবার সময় এই দিকটিও বোধহয় বিবেচনায় রাখা কর্তব্য। ২০১৭–র নভেম্বরে তাঁর পঁচাত্তর বছর পূর্ণ হল, আর ১৯৬৪ সালে ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রথম উল্লেখযোগ্য আত্মপ্রকাশের হিসাব ধরলে লেখক–অমিত্রসূদনের বয়সও প্রায় চুয়ান্ন বছর অতিক্রান্ত হল এ বছর! মনের বয়সে চিরতরুণ অমিত্রসূদন এতগুলো বছর ধরে সাহিত্য বা সাহিত্য–সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে অক্লান্ত লিখে চলেছেন, এ কম কথা নয়!
অমিত্রসূদনের লেখকজীবনের পঞ্চাশবর্ষপূর্তি উপলক্ষে তাঁর পূর্বপ্রকাশিত বইগুলি থেকে পঞ্চাশটি করে প্রবন্ধ বেছে নিয়ে যথাক্রমে রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্কিমবিষয়ক দুটি ‘প্রবন্ধ পঞ্চাশৎ’ সঙ্কলন ইতোপূর্বেই প্রকাশিত হয়েছে। ‘পারুলবই’ প্রকাশিত আলোচ্য ‘প্রবন্ধ পঞ্চাশৎ: সংস্কৃতি ও সাহিত্য’ এই সিরিজের তৃতীয় সঙ্কলন। মোট আটটি পর্যায়ে বিন্যস্ত হয়েছে প্রবন্ধগুলি। বিন্যাসের ক্ষেত্রে আলোচ্যবিষয় বা থিম এবং সেই বিষয়ের ঘটনাকাল বা ঐতিহাসিক সময়ক্রমের মধ্যে একরকম ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছে সঙ্কলনটিতে। যেমন তৃতীয় পর্যায়ের তিনটি প্রবন্ধেরই কেন্দ্রে আছেন উনিশ শতকীয় বিদ্যাসাগরমশায়; তার মধ্যে আবার দুটি প্রবন্ধের বিষয় তাঁর ‘বর্ণপরিচয়’ প্রাইমার। আর বইপ্রকাশক বিদ্যাসাগর রয়েছেন অন্য প্রবন্ধটিতে।
অমিত্রসূদন অবশ্য ‘বই’ বলতে যে শুধু ‘বিষয়’ বোঝেন না, বোঝেন বিশেষ একরকম ‘সংস্কৃতি’; তা এই বইয়ের পঞ্চম পর্যায়ের প্রবন্ধপঞ্চক পড়লে বোঝা যায়। কেননা, এখানে তিনি উনিশ শতকের বাংলা বইয়ের বিজ্ঞাপন, বাংলা বইয়ের ভূমিকা ইত্যাদি খুঁটিনাটি আনুষঙ্গিক বিষয়গুলির প্রতিও পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। বস্তুত বইটির প্রায় সব প্রবন্ধেই উনিশ–বিশ–একুশ শতকের বঙ্গসাহিত্য ও সংস্কৃতির বিবিধবিভঙ্গ বিম্বিত হয়। পড়তে পড়তে মনে হয়, মধ্যযুগ থেকে শুরু করে একালের শক্তি–সুনীল পর্যন্ত এ–যেন বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিপুল এক অভিযাত্রা! মনে হয়, আবহমান বাংলা সাহিত্য–সংস্কৃতির একটা চলমান রেখাচিত্র বুঝিবা চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠল! এমন মনে হওয়ার অন্যতম কারণ নিঃসন্দেহে লেখকের লিখনশৈলীর প্রাঞ্জলতা। এ–বিষয়ে তাঁর প্রখর আত্মসচেতনতার পরিচয় পাওয়া যায় বইটির ‘নিবেদন’ অংশে। কখনও কাব্য–কবিতা, নাটক–নভেল না লিখে প্রবন্ধের মধ্যেই ‘সামান্য সৃষ্টির সুখ’ উপভোগ করার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন সেখানে লেখক। অমিত্রসূদন এই ‘সৃষ্টি’র সুখে নিঃসন্দেহে সফলকাম। কেননা, প্রসাদগুণে তাঁর অনেক প্রবন্ধই হয়ে উঠেছে ‘সৃজনমূলক সাহিত্য’–এর দোসর। 
তাঁর বেশিরভাগ প্রবন্ধে অমিত্রসূদন পাঠকের সঙ্গে সরাসরি একরকম সংযোগ গড়ে তোলেন। তরতরে ভাষায় কথকঠাকুরের মতো পাঠকদের তিনি কখনও গল্প শোনান বাংলার প্রাচীন লিপিকরদের; কিংবা হালেদ, ঈশ্বর গুপ্ত বা  ‘কবিকুলের কুলকামিনী’দের! একটা প্রচ্ছন্ন বৈঠকি মেজাজ; এবং তার সঙ্গে লেখকের ‘আমি’র পরিমিত জারণ ঘটবার কারণে তাঁর লেখার ‘হয়ে–ওঠা’র একটা জায়মান সজীবতা পাঠককে আবিষ্ট করে। আর লিখনশৈলীর এই শিক্ষা তিনি পেয়েছিলেন, তাঁর আত্মসাক্ষ্য অনুযায়ী, ‘দেশ’ পত্রিকার প্রবাদপ্রতিম সম্পাদক সাগরময় ঘোষের কাছ থেকে। সাগরময় তরুণ অমিত্রসূদনকে শিখিয়ে ছিলেন, তথ্যানুগত্য বজায় রেখে কীভাবে বিন্যাস ও উপস্থাপনের মুনশিয়ানায় পাঠককে কাছে টানতে হয়। সেজন্যই, অধ্যাপকীয় রীতির গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ এই সঙ্কলনে নিতান্ত গরহাজির না–হলেও এর আখ্যানকল্প রচনাগুলিই হয়তো পাঠককে বেশি আকৃষ্ট করবে। এর মধ্যে স্বপ্নআখ্যানকল্প ‘বঙ্কিমচন্দ্রের মেয়ের সঙ্গে কিছু কথা’ লেখাটি স্বতন্ত্র উল্লেখ দাবি করে। এর শিরোনামের মধ্যেই রয়েছে একটা কুহকীগল্পের আভাস। তবে তারও গভীরে এখানে অন্তঃশীল থাকে একটি গবেষকমন। আত্মঘাতী বঙ্কিমকন্যা উৎপলকুমারীর সঙ্গে অমিত্রসূদনের স্বপ্নসংলাপ বঙ্কিমচন্দ্রের এই জীবনীকারের সংবেদনশীল মনেরই নির্দশন। ‘টরে–টক্কা’ এমন আরেকটি নিবন্ধ, যেখানে সম্প্রতি ‘অতীত’ হয়ে যাওয়া টেলিগ্রাফের মর্সকোডের রহস্যকথা শুনিয়েছেন লেখক।
মূলত সাহিত্যের পাঠ–পাঠান্তরমূলক গবেষণার জন্য অমিত্রসূদন সুবিদিত। কিন্তু সুশোভিত প্রচ্ছদ ও সুচারু পরিকল্পনার এই বইটি পড়ে মনে হয়, বঙ্গসংস্কৃতির পাঠ–পাঠান্তরেও তিনি স্বয়ংসিদ্ধ!‌‌‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top