শান্তনু বসু: 

কবি রবির গানের গল্প • চন্দনা ব্যানার্জী 
ম্যাক্স পাবলিশার্স • ৫০০ টাকা
বাংলা সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠতম সম্পদের মধ্যে অন্যতম— রবীন্দ্রসঙ্গীত। একসময়ের ‘রবিবাবুর গান’ সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজ গুণেই হয়ে উঠেছে ‘রবীন্দ্রসঙ্গীত’। কিন্তু এই বিপুল সঙ্গীতসম্ভারের সৃষ্টিলগ্ন থেকে শুরু করে এই উচ্চতায় পৌঁছনোর পথ যে খুব মসৃণ ছিল তা কিন্তু একেবারেই নয়। সমালোচনার তুমুল ঝড় সামলাতে হয়েছে রবীন্দ্রনাথকে। ‘কেন যামিনী না যেতে জাগালে না’ বা ‘তুমি যেও না এখনই’র মতো গানকে লম্পট বা অভিসারিকার গান বলে বিবেচনা করতে এতটুকু হাত কাঁপেনি তাঁদের। কারও কারও আবার ‘আজি শ্রাবণ ঘন–গহন মোহে’ গানকে অবোধ্য মনে হয়েছিল। এ তো কিছুই নয়। সামান্য উদাহরণ মাত্র।
তবে কোনও সমালোচনাই যে রবীন্দ্রনাথকে এতটুকু ব্যাহত করতে পারেনি— এ কথা বলার মধ্যে আজ আর নতুনত্ব কিছু নেই। দিন এগোনোর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গান তার আপন সৌরভে সৌরভান্বিত করেছে জগৎবাসীকে। মুগ্ধ হয়েছে মানুষ। ঋদ্ধ হয়েছে মন। বিশ্বের যে কোনও প্রান্তে বাংলা সংস্কৃতির মঞ্চ আজ রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়া অসম্পূর্ণ।
রবীন্দ্রনাথ একাধারে স্রষ্টা আবার একাধারে দ্রষ্টা। স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ ঈশ্বরের প্রাণোচ্ছল এক দূত। আবার দ্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ যেন ঋষিতুল্য কোনও মহাপুরুষ। সেই প্রজ্ঞাবান, সত্যানুসন্ধানী, স্থিতপ্রজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ নিজেই হয়ত উপলব্ধি করেছিলেন যে, তাঁর সৃষ্ট গানই মানুষের মাঝে তাঁর সত্তাকে সগৌরবে বাঁচিয়ে রাখার এক উল্লেখযোগ্য চিরকালীন আশ্রয়। সেইকারণেই জীবনসায়াহ্নে এসে তিনি প্রিয়পাত্রী মৈত্রেয়ী দেবীকে বলেছিলেন, ‘‌.‌.‌.‌দেখো রবিঠাকুর গান মন্দ লেখে না। একরকম চলনসই তো বলতে হবে।‌.‌.‌. কম গান লিখেছি? হাজার হাজার গান, গানের সমুদ্র, ‌.‌.‌.বাংলাদেশকে গানে ভাসিয়ে দিয়েছি। আমাকে ভুলতে পার, আমার গান ভুলবে কি করে?’‌‌.‌.‌. রবীন্দ্রনাথের গানকে ভোলা তো দূরের কথা, আজ বাংলা সঙ্গীতজগতের অন্যতম প্রাণবায়ু সেই ‘রবীন্দ্রসঙ্গীত’। ‘গীতবিতান’ আজ ঘরে ঘরে। রবীন্দ্রনাথের গান মানুষের জীবনের সঙ্গে এমন আত্মিকভাবে জড়িয়ে গেছে যে, শুধু গানে যেন আজ আর মন ভরে না। সঙ্গে গান তৈরির পিছনের গল্পটি থাকলে ভাল হয়। আরও একটু আপন হয় যেন গানগুলো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেকেরই সেগুলো জানা বা শোনার ব্যাপারে আগ্রহ বাড়তেই থাকছে। রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রসান্নিধ্য পাওয়া বিভিন্ন মানুষের নানা রচনা ও চিঠিপত্রে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা প্রাণস্পন্দনে পরিপূর্ণ সেইসব মাণিক্যরাশিকেই একত্র সম্ভারে পাওয়া গেল চন্দনা ব্যানার্জির ‘‌কবি রবির গানের গল্প’‌ বইয়ে। সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সঙ্গে জড়িত চন্দনা রবীন্দ্রসঙ্গীতের বিশেষ অনুরাগী। শুধুমাত্র এই অনুরাগই কি তাঁকে এই মহৎ কাজে হাত দিতে উৎসাহিত করল? উত্তরে চন্দনা জানিয়েছেন, ‘‌রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে ভালবাসি, এই নিয়ে আলোচনা করতেও ভাললাগে। আর গাইতে খুব ইচ্ছে করলেও সে রাস্তা আমার জন্য একেবারে বন্ধ। শেষে আমার বাড়ির কাছেই পেয়ে গেলাম কয়েকজন সই। এই প্রসঙ্গে একজনের নাম বলতেই হয়, আমাদের পাড়ার সান্ত্বনা পাল। তাদের গান শুনতে শুনতে আমার মাথায় এল গানগুলো রচনার পেছনে উৎস কী? কোন বয়সে লিখেছেন এইসব গান? সেই উৎসের সন্ধানে ছুটতে গিয়ে কবির নিজের কথায় বা অন্য কারও কথায় উঠে এল নানা গল্প। বই কাগজ, কলম নিয়ে বসে পড়লাম। গল্পে গল্পে খাতার পাতা ভরে যেতে লাগল। এগিয়ে চললাম এক অনন্য ভাণ্ডারের সন্ধানে।’‌
ভাণ্ডারের সন্ধান পেয়েই থেমে থাকেননি চন্দনা। সেগুলিকে তাঁর বইয়ের পরতে পরতে সুন্দর করে সাজিয়েওছেন। সূচিপত্রে ‘গীতবিতান’–এর মতো বর্ণাক্রম অনুসারে গানের তালিকা দিলেও মূল পর্বে গানগুলো সাজিয়েছেন বর্ণের কালনুক্রমেই। গ্রন্থের প্রথম পর্বটি যেন নানা বর্ণের গল্প দিয়ে গাঁথা এক বৃহৎ গল্পমালা। শুরু এভাবে হলেও বইয়ের শেষ পর্বে রয়েছে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সংখ্যা নিয়ে আলোচনা। মাঝের পর্বগুলিতে পাওয়া যাবে— ভিন্ন সুরে একই গানের সূচি, একই রবীন্দ্রসঙ্গীতের একাধিক শিরোনামের তালিকা, কবিগুরু রচিত ব্রহ্মসঙ্গীতের পূর্ণ তালিকা, ভাঙাগানের তালিকা। এ ছাড়াও ‘‌কবিগুরুর এমন কিছু গান রয়েছে যেগুলোর রাগ ও তাল সম্বন্ধে জানা গেলেও উপযুক্ত সংরক্ষণের অভাবে তাদের কোনও স্বরলিপি নেই। আবার অনেক গান আছে যাদের তাল উল্লেখ থাকলেও গানের রাগ ও স্বরলিপি সম্বন্ধে কিছু জানা যায় না। আবার রাগ, তাল ও স্বরলিপি কিছুই নেই কিন্তু গীতবিতানে এদের স্থান রয়েছে। এই সমস্ত গানেরও তালিকা তৈরী করলাম।’‌ চন্দনা ব্যানার্জির এই বক্তব্যের পরে সবমিলিয়ে বলা যায় বইটি গল্পকেন্দ্রিক একটি পূর্ণাঙ্গ আলোচনা গ্রন্থ ও তথ্যকোষ।
শ্রীমতী ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীর ‘রবীন্দ্রসংগীতের ত্রিবেণীসংগম’, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘গীতবিতান কালানুক্রমিক সূচী’ এবং সমীর সেনগুপ্তর ‘গানের পিছনে রবীন্দ্রনাথ’–এর পরে চন্দনা ব্যানার্জির ‘কবি রবির গানের গল্প’ রবীন্দ্রগানের গান–গল্প আহরণের ক্ষেত্রে সুবিশেষ নবতম সংযোজন। বিষয়মাধুর্যে ও প্রাচুর্যে আপামর রবীন্দ্রগানের ভক্তদের কাছে বইটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও আদরণীয় এক বই হয়ে উঠবে বলেই বিশ্বাস। ‌‌
একটি ছোটো অনু্যোগ। সমগ্র বইটি জুড়ে লেখিকার শ্রম, গবেষণা, অধ্যবসায়, বিষয়ের প্রতি ভালবাসা ও শ্রদ্ধা প্রস্ফুটিত হয়ে থাকলেও, কিছু মুদ্রণপ্রমাদ বইটির অনায়াস পাঠে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। গ্রন্থের বিষয়বস্তু ও তার মান অনু্যায়ী বইটির প্রচ্ছদ, বাইন্ডিং ও ডিজাইনিংয়ের ক্ষেত্রে প্রকাশক ‘ম্যাক্স পাবলিশার্স’–এর আর একটু মন দিলে ভাল হত। ■
 

জনপ্রিয়

Back To Top