অমিতাভ মুখোপাধ্যায়: ব্যাবহারিক বাংলা বানান–অভিধান • পবিত্র সরকার • লতিকা প্রকাশনী • ৪০০ টাকা
বাংলা ভাষাচর্চাকারীর হাতে নতুন একটি বানান অভিধান হাজির হয়েছে। সুবৃহৎ এই অভিধানের সঙ্কলক ও সম্পাদক বিশিষ্ট ভাষাবিদ অধ্যাপক পবিত্র সরকার। এর আগে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি থেকে প্রকাশিত ও বিপুল জনপ্রিয় বানান অভিধানটির পরিকল্পনা ও প্রণয়নে প্রধান ভূমিকা ছিল পবিত্রবাবুরই। আলোচ্য ডিকশনারিতে আকাদেমির ওই অভিধানে অনুসৃত রীতিপদ্ধতি ও শব্দসম্ভারের ছায়াপাত স্বতই অনুভূত হবে। ব্যাপারটাকে পবিত্রবাবু মোটেই এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেননি, বরং উৎসর্গপত্র ও ভূমিকায় তা সবিনম্র আন্তরিকতায় স্বীকার করেছেন। কিন্তু এটাও নজর করা চাই যে, নতুন অভিধানটিতে কিছু অভিনবত্বও আছে। প্রায় ৭০ হাজার শব্দ সংবলিত ডিকশনারিটিতে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির সর্বশেষ বানানবিধির সঙ্গে সংযোজিত হয়েছে ঢাকার বাংলা আকাদেমি গৃহীত প্রমিত বাংলা বানানের শেষতম নিয়মাবলি। এ ছাড়া আছে ড.‌ সরকারের নিজস্ব কিছু প্রস্তাব। প্রায় ছ’‌শো বাংলা ক্রিয়াপদের নির্বাচিত রূপও বিধৃত আছে অভিধানের শেষাংশে। আরও উল্লেখনীয় ‘‌কি’‌ আর ‘‌কী’‌ নিয়ে আলোচনাটি পাঠকের বিশেষ প্রাপ্তি।
বাংলা শব্দেও দুটি প্রধান বিভাগ:‌ তৎসম বা সংস্কৃত আর অতৎসম বা তদ্ভব অর্ধতৎসম দেশি ও আগন্তুক। বেশ কিছু সংস্কৃত শব্দ (‌চেহারায় সংস্কৃত হলেও উচ্চারণে নয়)‌ সরাসরি বাংলায় এসেছে আর কিছু নতুন শব্দ পণ্ডিতেরা বানিয়ে নিয়েছেন। তৎসম শব্দের বেলায় সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়ম মানতে হয়। যদিও শব্দের শেষের হসন্ত কিংবা বিসর্গ বাংলায় লুপ্ত হলেও তা সংস্কৃত বলেই গণ্য হয়ে থাকে (‌যেমন— সম্রাট পৃথক, প্রায়শ মুখ্যত)‌। রেফাক্রান্ত শব্দে দ্বিত্ববর্জনও সিদ্ধ। সংস্কৃতেই কতিপয় শব্দের বিকল্প বিধান আছে (‌অবনি আবলি তরি যুবতি শ্রেণি সূচি উষা কোশ)‌। কিন্তু অতৎসম শব্দে সংস্কৃত ব্যাকরণের আনুগত্য স্বীকার করার দরকার পড়ে না। তাই অতৎসম শব্দে ণত্ব ষত্ব মানা হয় না। অতৎসম বানানে দীর্ঘ ঈ বা দীর্ঘ ঈ–কার, দীর্ঘ ঊ বা দীর্ঘ ঊ–কার বর্জিত হয়েছে। তিনটি শিস্‌ বর্ণের মধ্যে তালব্য শ–কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এভাবে বানানকে সহজ করার সঙ্গে যথাসম্ভব একটি শব্দের একটি রূপ রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। তৎসম ও অতৎসম শব্দ সম্বন্ধে এই চিন্তাধারা অবলম্বনেই আধুনিক বাংলা বানান গঠিত হয়েছে এবং আধুনিক বানান অভিধান তারই ভিত্তিতে রচিত হয়ে থাকে। বর্তমান অভিধানে কোন শব্দের কী বানান হবে, তার ঠিক ঠিক হদিশ মিলবে।
পবিত্রবাবুর সংগৃহীত শব্দের সংখ্যা প্রচুর। তা হলেও কিছু শব্দের অভাব বোধ করা যায়। শীন বা অশীন এ–অভিধানে নেই। পাওয়া যাবে না জয়িতা প্রসরমান প্রিয়ঙ্ক প্রিয়ঙ্কা বিন্দাস শাঁওলি। আজহারউদ্দিন আনিসুজ্জামান ইমানুল শামসুজ্জোহা–র মতো ব্যক্তিনাম থাকলে ভাল হত। প্রসঙ্গত, ‘‌রুশতী’‌ শব্দটি অনবধানতায় অতৎসম দেখানো হয়েছে। ওটি সংস্কৃত, অর্থ:‌ প্রভাত সূর্যের রশ্মি। ‘‌মানুষ মানুষিক মানুষী’‌ শব্দগুলিও তৎসম।
এ ধরনের ডিকশনারিতে নজর টানার ব্যাপারটির গুরুত্বই সবচেয়ে বেশি। তবু দু–একটি ক্ষেত্রে ব্যুৎপত্তি বা সন্ধির ইঙ্গিত কিংবা মূল শব্দটির উল্লেখ থাকলে বানান বিভ্রাট থেকে মুক্তির সুযোগ থাকে। অঞ্জ্‌ ধাতুর সঙ্গে অলি যোগ করে অঞ্জলি শব্দের উদ্ভব, তা জানলে আর কলমে অঞ্জলী বানান আসবে না। দুর্গা–র মূলে যে দুঃ বা দুর্‌ আছে, তা জানলে আর দ–এ দীর্ঘ ঊ দেওয়া বানান লিখতে চাইবে না। আকাঙ্ক্ষা–র ধাতুটা যে কাঙ্ক্ষ্‌, তা জানলে ভুল বানান এড়ানোর সুযোগ হবে। তেমনি অত্যাচার (‌অতি+‌আচার)‌ ত্যাজ্য (‌<‌ ত্যাগ)‌ বলে দিলে ঠিক বানানটা আপনি লেখা হবে। বানান অভিধানে এমনটা করা যায় কি না, ভেবে দেখা যেতে পারে।
পবিত্রবাবু অ্যা–ধ্বনির জন্য বর্ণ উদ্ভাবনের কথা তুলে ঠিকই করেছেন। রবীন্দ্রনাথ একসময় সুনীতিকুমারকে নতুন বর্ণ তৈরির জন্য বলেও ছিলেন। বিশ্বভারতী অবশ্য নিজের মতো করে একটি নিয়ম মেনে চলে। তবে পলাশ বরন পাল তাঁর কম্পিউটারে যেভাবে এর মোকাবিলা করেছেন, সেটা অবশ্যই গ্রহণ করা যেতে পারে। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমিও একসময় ওরকম সুপারিশ করেছিল। ‘‌এ’‌ আর ‘‌এ‌–কার’‌–এর পেট কেটে অ্যা–ধ্বনি অনায়াসে নির্দেশ করা যেতে পারে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় একসময় ইংরেজি st–‌র জন্য বাংলায় ‘‌স্ট’‌ সংযুক্ত বর্ণ চালু করে। পরবর্তী কালে ন্ট ন্ড যুক্তবর্ণও তৈরি হয়েছে। কাজেই এখন পেটকাটা‌ হরফ বা‌ চিহ্ন তৈরি করাই যায়। এতে পবিত্রবাবুর সমর্থন আছে।
কি–কী নিয়ে চিন্তাভাবনার প্রথম প্রকাশ প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের “‌‌ ‘‌চ’‌লতি ভাষার বানান”‌ প্রবন্ধেই পাওয়া যায়। পরে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে তার বানানবিধিতে ‘‌কি’‌ আর ‘‌কী’‌ প্রসঙ্গ অন্তর্ভুক্ত করে। অবশ্য কুন্তক নামের আড়ালে কবি শঙ্খ ঘোষও এ বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন। তবে এখন ড.‌ সরকার বিস্তারিতভাবে বিচার–বিবেচনা করে কোথায় এবং কেন কি বা কী বসাতে হবে, তার এলাকা সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। ‘‌এমনকি বই–কি’‌ শব্দের বানান যে কী না–লিখে কি–ই লিখতে হবে, তারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি বানানবিধিতে ‌‘‌এগবে পৌঁছন লুকল’‌ না–লিখে ‘‌এগোবে পৌঁছোনো লুকোল’‌ লিখতে হবে কেন, তা ব্যাকরণসম্মতভাবে বুঝিয়ে দেওয়া আছে। তা সত্ত্বেও কোনও কোনও পত্রপত্রিকায় ও–কার বাদ দিয়েই ওই ধরনের শব্দ লেখার রীতি বজায় আছে। পবিত্রবাবু এই প্রবণতার অযৌক্তিকতা প্রতিপন্ন করে ঠিক বানান লেখার পরামর্শ দিয়েছেন। বিষয়টি অবশ্যই প্রণিধানযোগ্য।
বাংলা বানানের এই অধুনাতন অভিধানটিকে ভাষাচর্চাকারীরা সাগ্রহে গ্রহণ করবেন। লেখাপড়ার টেবিলে এটি জায়গা করে নেবে।
সহজেই অনুমান করা যায় যে, অনতি কালেই ডিকশনারিটির সংস্করণের প্রয়োজন ঘটবে। তখন হয়তো আরও কিছু শব্দের যোগ হবে এবং সামান্য যে ছাপার ভুল আছে, তা শুধরে দেওয়া যাবে।
গ্রন্থটির প্রকাশক বইপাড়ায় নতুন। যত্নের সঙ্গে এটি ছেপেছেন। আটশো পৃষ্ঠার বইয়ের চারশো টাকা দাম নিয়ে অভিযোগ করা চলে না। তবে মুদ্রণসংখ্যা বেশি হলে আর একটু কম দামে পাঠকের হাতে বইটি তুলে দেওয়ার সুযোগ মিলতে পারে।‌‌‌‌‌‌‌‌ ‌‌‌■

জনপ্রিয়

Back To Top