গোপাল বসু
‘‌১০১–‌২০০ ক্রিকেট’ •‌ দেবাশিস দত্ত‌ •‌ 
দীপ প্রকাশন •‌ ২০০ টাকা

বাংলার খেলাধুলার খবরাখবর যারা একটু–আধটু রাখে, অথচ তারা দেবাশিস দত্তের নাম শোনেনি এমন একটি লোকও পাওয়া যাবে না। শুধু লেখার জন্য নয়, টিভিতেও নিয়মিত মুখ। মূলত ক্রিকেটে দেবাশিসের মতো এত শব্দ কেউ লিখেছে কিনা সন্দেহ!‌ সব ধরনের লেখা আছে। যেমন আর্টিকল, ম্যাচ রিপোর্ট, ইন্টারভিউ এবং বই। এবং সব ক’‌টা বিভাগেই ও সমানভাবে সাবলীল ও সফল। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি সাক্ষাৎকার দেওয়ার চেয়ে নেওয়া আরও কঠিন। প্রথমত বিস্তর পড়াশোনা করতে হয়। আর এমন সব প্রশ্ন রাখতে হয়, যার উত্তর পাঠকরা জানতে চায়। সাক্ষাৎকার নেওয়া একটা শিল্প, একটা কলা। সাক্ষাৎকার নিতে নিতে এ ব্যাপারে দেবাশিস একেবারে সিদ্ধহস্ত। দেবাশিসের নেওয়া একটা সাক্ষাৎকার খেলার পাতার আকর্ষণ অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয়। দেবাশিস যে কোনও সংস্থার সম্পদ। 
তবে এত গুণ থাকা সত্ত্বেও আমি মনে করি যে–দুই গুণ ওকে সবার চেয়ে আলাদা করেছে তা হল, ওর কথা আর সময়ের দাম। বলতে যতই খারাপ লাগুক, ভারতীয়দের মধ্যে এই দুই গুণ খুব একটা পাওয়া যায় না। শুনেছি অমিতাভ বচ্চন খুব পাংচুয়াল। ওর গাড়ি যখন স্টুডিওতে ঢোকে লোকে ঘড়ি মিলিয়ে নেয়। দেবাশিসও ঠিক তাই। ও যদি বলে ১০টায় আসছি, আপনিও ঘড়ি মিলিয়ে নিতে পারেন।
বুদ্ধি ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। এই বুদ্ধি মানুষকে সব জীবের চেয়ে আলাদা করে রাখে। দেবাশিস এই উচ্চস্থানে পৌঁছেছে শুধু বুদ্ধির জোরে নয়, ও অমানুষিক খাটতেও পারে। তার চেয়ে বড় কথা ও খাটতে ভালবাসে। কাজের জন্য সব ত্যাগ করতে পারে। ও হল, ইংরেজিতে যাকে বলে, ‘‌ওয়ার্কাহলিক’‌। 
প্রশ্ন তো জাগেই, দেবাশিস এত খবর জোগাড় করে কীভাবে?‌ দেবাশিস খবরের গন্ধ পায়। যেটা আমরা পাই না। যেরকমভাবে পুলিস–কুকুররা গন্ধ শুঁকে শুঁকে অপরাধীর কাছে পৌঁছয়, তেমনই দেবাশিসও ফলো করতে করতে মূল খবর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আমি ওকে ডাকি, ‘‌নিউজহাউন্ড’‌। 
ওয়াসিম আক্রাম সম্পর্কে এমনও বলা হয়, ও স্যুইং বোলিং সম্পর্কে সব জানে। ও যেটা জানে না, সেটা জানার দরকারই নেই। দেবাশিসের কাছেও সব খবর থাকে। যেটা ও জানে না, সেটা দরকার নেই। 
১৯৯০–তে দেবাশিসের সঙ্গে ইংল্যান্ড গেছিলাম। আজকালের জন্য ভারত–ইংল্যান্ড সিরিজ কভার করতে। লর্ডস টেস্টে স্যর লেন হাটন এসেছিলেন ম্যাচ দেখতে। তিনি তখন খুব অসুস্থ। হাটনকে মায়ের মতোই প্রায় আগলে রেখেছিলেন লেডি হাটন। যাতে সাংবাদিকেরা বিরক্ত না করতে পারে। সেই কড়া বেড়া পেরিয়ে দেবাশিস কী করে হাটনের সাক্ষাৎকার নিল, তা আজও বিস্ময় আমার কাছে। স্যর হাটন সেই বছরই মারা যান। হয়তো দেবাশিসই শেষ সাক্ষাৎকার নিয়েছিল স্যর লেন হাটনের। 
ইংল্যান্ডে থাকাকালীন সেই সময়ই দেশ থেকে খবর যায় যে, দেবাশিসের ছোট ভাই মোটর দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত। গাভাসকার সেই সময় ইংল্যান্ডে আমাকে আন্তরিকভাবে বলল, ‘‌দেবাশিসকে জিজ্ঞেস করো আমি কিছু করতে পারি কিনা?‌ যদি ওষুধপত্র লাগে আমি এখান থেকে পাঠানোর ব্যবস্থা করব।’‌ তখনই বুঝেছিলাম প্লেয়াররা দেবাশিসকে কীরকম ভালবাসে। শুনলে অবাক হবেন, এই তালিকায় তিনিও আছেন, যাঁর পৃথিবীতে কোনও বন্ধু নেই!‌ জিওফ্রে বয়কট। 
আপনারা হয়তো ভাবতে পারেন, এতক্ষণ ধরে বইয়ের সম্পর্কে কেন লিখলাম না?‌ ‘‌১০১–‌২০০ ক্রিকেট’‌ বইটা হল গল্পের ভাণ্ডার। ১০০টা ছোট, অজানা গল্প। সবই মজাদার। যেটা শুধু দেবাশিসই লিখতে পারে। একটা গল্প পড়তে দেড় থেকে দু’‌মিনিটের বেশি লাগবে না। তবে একটা সাবধানতার বার্তা আগে থেকে জানিয়ে দিই। হাতে যদি জলদি কাজ থাকে, যেটা করতেই হবে, তবে বইটা পড়তে বসবেন না। কারণ, শেষ না হওয়া পর্যন্ত বইটা ছাড়তে পারবেন না। জরুরি কাজের দফারফা হয়ে যাবে। বিশ্বাস হচ্ছে না?‌ পড়লেই বুঝতে পারবেন

জনপ্রিয়

Back To Top