সোহিনী ঘোষ‌:
শিল্প–সাহিত্য ও সমাজবিজ্ঞান বিষয়ক ষাণ্মাসিক ‘‌এবং অন্যকথা’‌ তাদের একবিংশ বর্ষ জানুয়ারি ২০১৯ সংখ্যার কেন্দ্রীয় বিষয় নির্বাচন করেছে ‘‌দেশভাগ’‌। সম্পাদকেরা ‘‌শুরু কথা’‌য় জানিয়েছেন, তঁারা যখন বিষয়টি নির্বাচন করেছেন, ‘‌‘‌তখন ‌অনেক বন্ধু বলেছেন এরকম ‘‌ডেড ইস্যু’‌ নিয়ে কেন সংখ্যা করছেন!‌’‌’‌ সম্পাদকেরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘‌‘‌আমাদের পত্রিকা গোষ্ঠীর কাছে ‘‌দেশভাগ’‌ কোনও ডেড ইস্যু নয়। আমাদের সমাজজীবনে, রাজনীতিতে, প্রাত্যহিক যাপনে এর প্রভাব আগেও ছিল, এখনও আছে, ভবিষ্যতে আরও বহুদিন থাকবে বলে আমাদের মনে হয়।’’‌‌ ঠিকই বলেছেন সম্পাদকেরা। তঁাদের একটু আশাও আছে বলে মনে হয়েছে আমার। ‘‌ভবিষ্যতে’‌ ‘‌বহুদিন’‌ পরে এর প্রভাব না–ও থাকতে পারে তবে?‌ আমি ততটা আশাবাদী নই— আমার সোজাসাপটা মনে হয় এই উপ–মহাদেশ কোনওদিনই দেশভাগের প্রভাবমুক্ত হতে পারবে না।
পরিকল্পনা ও বিন্যাসে চমৎকার মুনশিয়ানা। ঊনচল্লিশটি রচনাকে প্রবন্ধ, আত্মজীবনী, ব্যক্তিকথা, মুক্তগদ্য, স্মৃতিচারণ পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তিনটি মূল্যবান সাক্ষাৎকারের পাশাপাশি দুটি প্রামাণ্য চিত্র আলোচনা [‌সীমান্তরেখা:‌ তানভীর মোকাম্মেল ও আবার আসিব ফিরে:‌ সুপ্রিয় সেন]‌, ন’‌টি গ্রন্থের সমালোচনা, ছ’‌টি গল্প, একুশটি কবিতা নিয়ে সম্পাদিত হয়েছে এই মূল্যবান পত্রিকাটি। আলোচ্য সংখ্যাটির অতিথি সম্পাদক সুশীল সাহা ইতিপূর্বে ‘‌বর্ডার’‌ নামে একটি গ্রন্থনির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সম্পাদনা করেছেন ‘‌দেশভাগের গল্প:‌ বাংলাদেশ’‌। যুক্ত ছিলেন ‘‌সীমান্তরেখা’‌ তথ্যচিত্রটি নির্মাণের সঙ্গেও। অতএব সম্পাদনার ভার যে যোগ্য হাতেই পড়েছে, সে–বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
এই সঙ্কলনটির একটা উল্লেখযোগ্য দিক আছে। ‘‌দেশভাগ’‌ বিষয়ক সঙ্কলনের সাধারণ প্রবণতা হল পূর্ব ও পশ্চিমবাংলার অন্তর্গত বাঙালি সত্তার উচ্ছিন্নতা, বেদনা, জটিলতা, যাপন বৈচিত্র্য ইত্যাদি। কিন্তু এখানে ব্যবহৃত হয়েছে আরও বড় ক্যানভাস!‌ আসাম, সিলেট— সাধারণত যাদের আমরা দেশভাগ আলোচনায় আনতেই চাই না— সেই বিভাজন–‌কথাও এখানে উপস্থিত। উত্তর–‌পূর্ব ভারতের বাঙালি সাহিত্যিকদের লেখায় কীভাবে এসেছে দেশভাগ প্রসঙ্গ, তার অপূর্ব আলোচনা রয়েছে বাসব রায়ের প্রবন্ধে। নবনীপা ভট্টাচার্য চমৎকার উপস্থিত করেছেন শ্রীহট্ট (‌সিলেট)‌–‌কে। সমরজিৎ সিংহ অনবদ্য বিশ্লেষণ করেছেন দেশভাগের ফলে কেমন করে মণিপুর ও ত্রিপুরার জনবিন্যাস বদলে গিয়ে বাঙালি সংখ্যাগুরু হয়ে ওঠায় উদ্বাস্তু হয়ে যেতে হল স্থানীয় অধিবাসীদের। কীভাবেই বা এই অন্যায় মেনে নিতে না পারায় পরবর্তী শিক্ষিত প্রজন্মের যুবকেরা ক্রমশ বিদ্রোহী হয়ে উঠল, দেখিয়েছেন সেই চিত্রও। বুঝে নিতে হবে উত্তর–‌পূর্ব ভারতে— মণিপুর, ত্রিপুরা, অসম প্রভৃতি জায়গায় কেন ভূমিপুত্ররা জঙ্গি আন্দোলনে চলে যাচ্ছে, সেই ব্যথাও।
দেশভাগ আসলে একটা হেরে যাওয়ার ঘটনা, হারিয়ে ফেলার ঘটনা। পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিকে যেমন ভিটেমাটি হারিয়ে উচ্ছিন্ন হয়ে আশ্রয় নিতে হয়েছে অন্যত্র। তেমনি আশ্রয় দিতে গিয়েও উদ্বাস্তু হয়ে যেতে হয়েছে বিভিন্ন জনজাতিকে। একটি অবশ্যপাঠ্য দেশভাগ সম্পর্কিত সঙ্কলন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ এই পত্রিকা–সংখ্যাটি। ■
এবং অন্যকথা:‌ দেশভাগ •‌ অতিথি সম্পাদক সুশীল সাহা •‌ প্রধান সম্পাদক বিশ্বজিৎ ঘোষ ও জলধি হালদার • ৫০০ টাকা

জনপ্রিয়

Back To Top