জাহিরুল হাসান
প্লুটো •‌ গুলজার •‌ ভাষান্তর শেখ সদর নইম • দে’‌জ পাবলিশিং •‌ ১৯৯ টাকা

উর্দু কবিতা থেকে বাংলায় অনুবাদের সময় অনেক ক্ষেত্রেই মূল লেখাটিও পাশাপাশি দেওয়া হয়, যেটা ভারতীয় অন্যান্য ভাষার ক্ষেত্রে অনুবাদকেরা ভাবতে পারেন না। এর প্রথম কারণ, উর্দু খুব দুর্বোধ্য নয় বাঙালি পাঠকের কাছে। দ্বিতীয়ত, উর্দু কবিতার প্রতি বাঙালির বরাবরই একটা টান আছে। হিন্দি সিনেমার বিখ্যাত গীতিকার গুলজারের কাব্যগ্রন্থ ‘‌প্লুটো’‌ এইভাবেই বাংলায় উপস্থাপিত হয়েছে। অনুবাদক শেখ সদর নইমের বাংলা ও উর্দু দুই ভাষাতেই দখল আছে। ভারতীয় ভাষা থেকে অনুবাদের ক্ষেত্রে এটা একটা বিরল গুণ। গুলজারের এই বইটি প্রথমে উর্দু ও হিন্দিতে বেরিয়েছিল ২০১৩ সালে। দু’‌বছর পরে ইংরেজিতে অনুবাদ হয়, আরও দু’‌বছর পরে এবার হল বাংলায়।
তিরিশের দশকের মাঝামাঝি গুলজারের যখন জন্ম, তখনও পাঞ্জাবের কী হিন্দু কী মুসলমান উর্দু লিখতে পড়তে জানতেন, এমনকি পাঞ্জাবি ভাষাও উর্দু হরফেই লেখা হত। সেই সমন্বয়বাদী সংস্কৃতিরই সন্তান সম্পূরণ সিংহ কালরা ওরফে গুলজার। তাঁর গোটা জীবনযাপন এবং সৃষ্টিকর্মে তার প্রতিফলন পাওয়া যায়।
উর্দু সাহিত্যে প্রথাগত কাব্যশৈলী হল গজল এবং আজও সে এই ভাষায় তার প্রাধান্য বজায় রেখে চলেছে। নজ্‌ম হল আধুনিক কাব্যরীতি। বাংলা সাহিত্যে অনেককাল ধরে আধুনিক কবিতারই রমরমা। উর্দুতে তা কিন্তু নয়। গজলকে ডিঙিয়ে নজ্‌ম সামনের সারিতে উঠে আসতে পারেনি। অনেক উর্দু কবি গজল ও নজ্‌ম দু’‌রকমই লেখেন। আসলে গজল না লিখলে জনপ্রিয়তা পাওয়া বেশ কঠিন। গুলজারও নজ্‌মের পাশাপাশি প্রচুর লোকপ্রিয় গজল লিখেছেন।
এবার একটু নমুনা পেশ না করলে গুলজারের নজ্‌ম বোঝানো যাবে না। ‘‌গিলা কর তো লিয়া, লেকিন.‌.‌.‌/‌যো থে, কুছ ঘট গয়ে উসসে!‌’‌ নইম অনুবাদ করেছেন, ‘‌অনুযোগ তো করলাম/‌কিন্তু কিছু কমে গেল আমার’‌। সমস্যা হল ওই ‘‌আমার’‌ শব্দটা নিয়ে। এটা ‘‌উসসে’‌র সমার্থক নয়। উসসে মানে তা থেকে। কেউ প্রত্যাশামতো আচরণ করেনি, মনে ক্ষোভ জমেছে, তাকে দু’‌কথা শুনিয়ে দিলাম। এতে তার করা অবিচারটাই খানিকটা শোধবোধ হয়ে গেল নয় কি?‌ তার পরই কবি বলছেন, ‘‌জো সহ লেতে তো কুছ অন্দর বিলোতে/‌জরা–সা বঢ় গয়ে হোতে/‌ওহ চাহে জখম হি হোতা!‌’‌ অনুবাদ— ‘‌যদি দহন হোত, পশতো ভেতরেই/‌যে ক্ষত হলেও/‌কিছু বেড়ে যেত আমার,’‌। মনে হয়, এখানে একটু ছাপার ভুল হয়েছে, ‘‌সহ’‌ মানে তো সহ্য। ওটা তা হলে ‘‌দহন’‌ নয় ‘‌সহন’‌ই হবে। ক্ষোভটা যদি বিনা প্রতিবাদে মনে সঞ্চারিত হতে দেওয়া হত, তা হলে তা আরও বাড়ত, হোক না ক্ষত!‌ এটা একটা তির্যক উক্তি, সাধারণভাবে বৃদ্ধি মানে তো লাভ। উর্দু গজলে প্রেমিক মর্ষকামী, ব্যথা পেতেই ভালবাসে, আর যতই উর্দু কবিরা আধুনিক নজ্‌ম লিখুন না কেন, গজলের প্রভাব থেকে তাঁরা বেরিয়ে আসতে পারেন না। উর্দুর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নজ্‌ম লেখক বিপ্লবী কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজও পারেননি। দেখাই যাচ্ছে, গুলজারও স্বেচ্ছায় ধরা দিয়েছেন গজলের মোহময়ী আকর্ষণের কাছে।
নজ্‌ম তো ইংরেজি পোয়েমেরই উর্দু রূপ, তাই দীর্ঘ হয় না। তবে প্লুটোর কবিতাগুলি আরও ছোট, অনেকটা অণুকবিতা। ওই কবিতারই শেষ দু’‌লাইন— ‘‌‘‌সুবুক সর বনকে পুছ আয়ে/‌কি— ‘‌হমসে সরগিরাঁ কিঁউ হো?‌’’‌‌ বইয়ে অনুবাদ— ‘‌‘‌স্বচ্ছন্দ প্রশ্ন উজিয়ে আসে/‌ ‘‌তুমি কেন অপ্রীত আমার প্রতি।’’‌‌ আমি সামান্য যেটুকু উর্দু জানি তাতে মনে হয় ‘‌সুবুক’‌ হল সবক অর্থাৎ শিক্ষার বহুবচন, মানে অভিজ্ঞতা। একই পঙ্‌ক্তি বা কাছাকাছি পঙ্‌ক্তিতে ভিন্নার্থে একই শব্দের ব্যবহার উর্দু কাব্যের এক ধরনের অলঙ্কার। এখানে যেমন ‘‌সর্‌’‌। অভিজ্ঞতা মাথা তুলে জিজ্ঞেস করল, রুষ্ট, কেন আমার প্রতি?‌ সর্‌গিরাঁ মানে, হ্যাঁ, অপ্রীতও হতে পারে।
উর্দু কাব্যের শ্রেষ্ঠদের সারিতে গুলজারকে বসানো যায় কি না, এ নিয়ে দ্বিমত থাকতে পারে। কিন্তু প্লুটো তাঁর প্রশংসিত বই, আর তা ছাড়া গুলজারের তো একটা নিজস্ব মহিমাও আছে। ফলে বাঙালি পাঠকের কাছে বইটির সমাদরই হবে। নিশ্চিত।‌‌ বইটির ছাপা, বাঁধাই, প্রচ্ছদ— সবই উন্নতমানের।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top