‌‌ বিপ্লব সরকার: ইংরেজি ভাষায় স্রেফ জঙ্গল ও জঙ্গলি প্রাণী ও মানুষের কথা লিখে দু’‌জন বিশ্ববিখ্যাত লেখকই ভারতের মাটিতে কাজ করেছেন। তাঁরা হলেন, প্রথম নোবেল জয়ী ব্রিটিশ লেখক রুডইয়ার্ড কিপলিং এবং জিম করবেট। তাঁদের ‘‌জাঙ্গল বুক’‌ ও ‘‌মাই ইন্ডিয়া’‌ ভারতীয় উপমহাদেশের বন, বন্যপ্রাণ ও বনের মানুষকে দুনিয়ার নানা প্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে। অবিভক্ত ভারতে অরণ্যভূমির এক বিরাট বিস্তার বাংলা, অসম, ঝাড়খণ্ড, বিহার, ওডিশা জুড়ে কিপলিং ও করবেটের লেখায় মধ্য ও উত্তর ভারতের জঙ্গলই প্রাধান্য পেয়েছে। বাংলার ও প্রতিবেশী রাজ্যের অরণ্যকাহিনী প্রথম লেখেন ময়মনসিংহের জমিদার সূর্যকান্ত আচার্য। সেই জমিদারর এক বড় শরিকের উত্তরাধিকারী ধৃতিকান্ত লাহিড়ী চৌধুরী। সেকালে গাড়ির চল ছিল না। ধনী জমিদার পরিবারে প্রচুর হাতি ছিল। ধৃতিকান্ত বলেছিলেন, ‘‌ছেলেবেলা থেকে বাড়ির অন্যদের যেমন চিনতাম, হাতিদেরও চিনতাম। হাতিদের দুঃখ–সুখ, রোগ–ভোগ টের পেতাম।’‌ ধৃতিকান্ত তাই বড় হয়ে অরণ্যপ্রেমী হয়ে উঠেছিলেন। পাগল কিংবা ক্ষিপ্ত হাতি ছাড়া কখনও শিকার করেননি। কত বিচিত্র বনবাংলোয় রাত কাটিয়েছেন। বনেদি ধনী মানুষ যেমন বিশ্বের নানা প্রান্তে, নানা খাদ্যের রস আস্বাদন করেছেন, তেমনই বনবাংলোয় হাতির মাংসও খেয়েছেন। অসমের জঙ্গলে এক বনবাংলোয় ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল। ঘরের দেওয়াল এক ধরনের ঘাস দিয়ে তৈরি। সেখানে সাপেরা বাসা করেছে। সন্ধে হতে না হতেই বনকর্মীরা চলে গেছেন। লন্ঠনের অল্প আলোয় দেওয়ালে সাপের নড়াচড়ার শব্দ। মশারির চালেও সাপ। এভাবেই রাত কেটে যায়। অভিজ্ঞতা গুছিয়ে বলার ক্ষমতা সবার থাকে না। ধৃতিকান্তের ছিল।
তাঁর ‘‌জঙ্গলগাথা ও রসনাবিলাস’‌ বইটিতে উঠে এসেছে শিকারের নানা স্মৃতি। ‌একবার বাবার মামাবাড়িতে পুজোয় বেড়াতে গিয়ে মধুপুরগড় জঙ্গলে রাস্তার পাশে উইয়ের ওপর প্রকাণ্ড ‘‌রয়্যাল’কে বসে থাকতে দেখেছেন। বাঘ মারার যে কতরকম ঝকমারি, শুনিয়েছেন সেই সব কাহিনি।
হাতিদের চরিত্র সম্পর্কে বলতে গিয়ে ধৃতিকান্তবাবু বলেছেন, ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে হাতি ইচ্ছাকৃত ভাবে মানুষ মারে না। সাধারণত প্রজনন ঋতুতে একটি মাদি হাতির জন্য দুটো মদ্দা হাতির লড়াই হয়। পরাজিত পুরুষ হাতিটি অনেক সময় রুক্ষ হয়ে ওঠে। সেই অবস্থায় সে মানুষকে আক্রমণ করতে পারে। একদিনের হাতির খোরাক ২০০ কেজি শস্য। এই পরিমাণ খাদ্যের খোঁজেই তাকে পরিযায়ী হতে হয়। কৃষকের শস্যখেতে এই কারণে হাতিরা আসে। তাকে উত্ত্যক্ত করলে আত্মরক্ষায় আক্রমণ করে। হাতির বয়স বোঝা যায় কানের পাতার ওপর ভাঁজ দেখে। যত বয়স হবে, এই ভাঁজ তত সমান হয়ে আসবে। হাতির দলের লিডার কখনও পুরুষ হতে পারে না। ওদের দলে নেত্রী থাকে।
শুধু জঙ্গলে ঘোরার অভিজ্ঞতাই নয়, তার সঙ্গে যুক্ত হয় রসনাও। এক জায়গার জঙ্গলে এক–এক রকম খাবারের স্বাদ পেয়েছেন তিনি। রান্নার কৌশলে একই মাছের স্বাদ দুই বাংলায় কীভাবে আলাদা হয়ে উঠেছে, তা তিনি শুধু চেখেই দেখেননি, শিখে এসেছেন রান্নার কৌশলও। সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন ধৃতিকান্তবাবু। কিন্তু তাঁর লেখা এই জঙ্গলগাথা ও রসনাবিলাস বইটি পড়তে শুরু করলে মনে হবে তিনি পাঠককে সঙ্গে করেই ঢুকে পড়েছেন এক অরণ্যে। সাদাকালো স্কেচে, ছবিতে ঝকঝকে বইটি প্রকাশ করেছে ৯ঋকাল বুকস।‌ ■
জঙ্গলগাথা ও রসনাবিলাস • ধৃতিকান্ত লাহিড়ী চৌধুরী
৯ঋকাল বুকস • ৫৫০ টাকা‌

জনপ্রিয়

Back To Top