সুমিতা চক্রবর্তী: সাহিত্যে আত্মমুক্তি: ঠাকুরবাড়ির নারী • অনুজা শেঠ • বঙ্গীয় সাহিত্য সংসদ • ২৫০ টাকা
বাংলার মেয়েদের লেখাপড়া শেখার কোনও বিধিসম্মত প্রতিষ্ঠান ছিল না ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। সেই বছর বেথুন সাহেব ও বিদ্যাসাগরের যুগ্ম প্রচেষ্টায় শুরু ‘‌ক্যালকাটা ফিমেল স্কুল’‌। তার আগে বাঙালি মেয়েরা যেটুকু লেখাপড়া শিখেছিলেন, তা পারিবারিক অনুমোদনে। স্কুল হওয়ার পরেও স্কুলে সবাই যেতেন না। গৃহসীমানার অভ্যন্তরেই ছিল তখনও মেয়েদের বন্ধন ও মুক্তি— দুই–‌ই। সময় উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ। সেরকম একটি বাড়ি, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি, বাঙালির সৌভাগ্যক্রমে হয়ে উঠেছিল বাঙালি মেয়েদের মুক্তির মঞ্চ।
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (‌‌১৮১৭–‌১৯০৫)‌‌ জমিদারই ছিলেন;‌ জমিদারের দোষগুণ অন্য সব জমিদারের মতোই ছিল তাঁরও;‌ কিন্তু মনের গঠনে একটু পার্থক্যও ছিল—‌ বিশেষত, মেয়েদের সম্পর্কে ধারণায়। মেয়েদের জন্য পুরুষের মতোই সার্বিক সামাজিক স্বাধীনতা থাকুক—‌ এমন অবশ্য ভাবতেন না তিনি;‌ মেয়েদের বিবাহ–‌ব্যাপারেও ছিলেন অনেকটাই রক্ষণশীল, কিন্তু মেয়েদের মনের শিক্ষার বিষয়ে ছিলেন কেবল উদার নন, রীতিমতো সচেষ্ট। মেয়েদের সঙ্গেই পরিবারের বধূদের কথাও তিনি মনে রেখেছিলেন। তাঁর কর্তৃত্বের অন্তর্গত ঠাকুরবাড়িতে মেয়েদের লেখাপড়া, সঙ্গীত, এমনকী অভিনয়–‌চর্চাতেও উৎসাহ দেওয়া হত। মেয়েদের সাংগঠনিক প্রয়াস এবং পত্রিকা–সম্পাদনাও ছিল সে–‌যুগের প্রেক্ষিতে, অনেকটাই উন্মুক্ত সুযোগ। তার ফলে ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা পেয়েছিলেন আত্মপ্রকাশ, আত্মবিকাশ এবং আত্মমুক্তির অনেকটাই ক্ষেত্র, যা সে–কালের অধিকাংশ মহিলাই পেতেন না। ঠিক এই জায়গাটিতেই বিচরণ করেছেন গবেষক অনুজা শেঠ।
অনুজা শেঠের বইয়ের পরিকল্পনায় আছে যথেষ্ট বিস্তার এবং এক ধরনের সম্পূর্ণতার প্রয়াস। ঠাকুরবাড়ির কন্যা ও বধূদের সাংস্কৃতিক চর্চার সব দিকগুলি তুলে আনার চেষ্টা করেছেন তিনি। পাঠকদের সুবিধার্থে সূচি–‌বিন্যাসেই দেখানো হয়েছে ঠাকুরবাড়ির মহিলারা কে কোন দিকে নিজেদের মনের মুক্তিকে মেলে ধরতে সক্ষম হয়েছিলেন। পত্রিকা–‌সম্পাদনা, গ্রন্থ–‌সম্পাদনা, উপন্যাস–ছোটগল্প (এই দুটি একত্রে থাকলেও চলত)‌‌, কাব্য–‌কবিতা–‌সঙ্গীত, নাটক রচনা, নাট্যাভিনয় (‌‌কেবল ‘‌অভিনয়’ লিখলেই ভাল হত, কারণ শর্মিলা ঠাকুর এই বিভাগের অন্তর্ভুক্ত—‌ যিনি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের কারণেই সুপরিচিত)‌‌, প্রবন্ধ–নিবন্ধ, স্মৃতিকথা ও জীবনী–‌সাহিত্য, আত্মীয়–‌তর্পণ, অনুবাদ–‌সাহিত্য। এর পরেও আছে ‘‌বিবিধ ধারা’‌ শীর্ষক একটি অংশ, যার অন্তর্গত হয়েছে চিঠিপত্র, ভ্রমণকথা, ছাত্রপাঠ্য গ্রন্থ, বক্তৃতা–‌সংগ্রহ, রন্ধন–‌বিষয়ক বই, রূপকথা ও প্রবাদ–‌সংকলন, রচনা ও সার–‌সংকলন। এর পরেও একটি লিখন আছে, যার কেন্দ্র–‌ব্যক্তিত্ব কাদম্বরী দেবী এবং লিখন–‌শিরোনাম ‘প্রেরণা–‌স্থল’‌। আমার মতে, এই লেখাটি না থাকলেই সঙ্গত হত। কে কোথায় কার প্রেরণা হয়ে উঠছেন—‌ এই সব মন–দেওয়া–‌নেওয়ার কথা–‌চর্চা নিয়ে এখন বাঙালির উৎসাহ একটু বেশি দেখা যাচ্ছে। এই গ্রন্থে কিন্তু তা আলোচ্য বিষয় নয়।
অনুজা শেঠের বইয়ের সূচি দেখেই বোঝা যাচ্ছে, বহু তথ্যের সমাহার এই গবেষণা। তার কাল–‌বিস্তারও অনেকখানি। স্বর্ণকুমারী দেবী থেকে শুরু করে বিশ শতকের শেষ পর্ব পর্যন্তই। জোড়াসাঁকোর পাশাপাশি পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুরবাড়ির প্রসঙ্গও আছে। প্র‌বোধেন্দুনাথ ঠাকুরের পুত্র সন্দীপ ঠাকুরের পত্নী, জাপানি মহিলা এইকো–‌র নাম সাধারণ পাঠক খুব বেশি জানেন বলে মনে হয় না। একটিই দৃষ্টান্ত দিলাম। কিন্তু এমন উদাহরণ আরও দেওয়া যায়। আর সেখান থেকেই বোঝা যায়, এই গ্রন্থটি প্রস্তুত করতে কত পরিশ্রম করেছেন লেখক।‌
যতজন মহিলার প্রসঙ্গ আছে, তাঁদের অনেকেই একাধিক সাহিত্য–‌সংরূপে এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। ফলে বিন্যস্ত বিভাগগুলির একাধিক তালিকাতেই আছে তাঁদের নাম ও কৃতির পরিচয়। কিন্তু সেক্ষেত্রে গ্রন্থ–‌লেখকের একটু সমস্যা হয়েছে—‌ সেই মহিলার ব্যক্তি–পরিচয়, তিনি ঠাকুরবাড়ির কে, এই তথ্য তিনি কোথায় দেবেন!‌ গ্রন্থারম্ভেই প্রত্যেকের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দিয়ে বইটি শুরু করলে বোধহয় সুবিধে হত। অন্যথায় যে বিভাগের অন্তর্ভুক্ত হয়ে সেই মহিলার নাম প্রথম এসেছে, সেখানেই পরিচিত প্রদান ছিল বিধেয়। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কন্যা সৌদামিনী, তাঁর কন্যা ইন্দুমতী, তাঁর কন্যা লীলা। এই লীলার সঙ্গে বিবাহ হয়েছিল বঙ্গদেশের আর একটি উল্লেখযোগ্য সংস্কৃতিমনস্ক পারিবারিক প্রতিষ্ঠান চৌধুরি পরিবারের সন্তান আশুতোষ চৌধুরি ও প্রমথ চৌধুরির ভ্রাতা, কর্নেল মন্মথনাথ চৌধুরির। তাঁদেরই কন্যা দেবিকারানি। তাঁর প্রতিভার বিকাশে চৌধুরি পরিবারেরই ছিল প্রধান ভূমিকা। পিতা মন্মথনাথ ছিলেন চিকিৎসক, ব্রিটিশ–‌ভারতের প্রতিরক্ষা–‌বাহিনীর প্রথম ভারতীয় সার্জন। বাংলার বাইরেই কেটেছিল তাঁর সমন্ত কর্মজীবন। দেবিকারানির প্রথম স্বামী হিমাংশু রায়ের নাম এই গ্রন্থে আছে;‌ কিন্তু দ্বিতীয় স্বামী, রুশ চিত্রশিল্পী স্বেতস্লাভ রোয়েরিচ–‌এর উল্লেখ নেই।
এমন কিছু কিছু অসম্পূর্ণতা—‌ যা এত দিক নিয়ে কাজ করতে গেলে যে–‌কোনও গবেষকেরই হতে পারে—‌ থাকলেও এই গ্রন্থ অবশ্যই বিপুল তথ্যের আকর রূপে সাধুবাদযোগ্য।‌‌‌ ■
 

জনপ্রিয়

Back To Top