প্রচেত গুপ্ত:
কোন মনটা ভাল আর কোন মনটাই বা খারাপ?‌ বোঝার কোনও উপায় আছে?‌
অনেকে বলবে নেই, আমি বলব আছে। যে–মনটা মনকেমনের সেই মনটাই ভাল। মনকেমনের মন যে শুধু সুন্দর আর নরম হয় এমন নয়, তার নিজের রঙও থাকে। সেই রঙ এক একেক সময়ে একেক রকম। একেকজনের কাছে একেকরকম। কখনও রজনীগন্ধার পাতার মতো, কখনও অলস দুপুরের মতো, কখনও জল থেকে উঠে আসা রাজহাঁসের ডানার মতো। 
এই মুহূর্তে আমার সামনে মনকেমনের যে রঙটি ধরা পড়েছে তা সাদা–‌কালো। নরম ও চাপা। ফিসফিস করে তারা শান্তনিকেতন, পাঠভবন, খোয়াই, কোপাই আর তুলি–খাতা–পেনসিল হাতে ছুটে যাওয়া একদল ছোট ছেলেমেয়ের কথা বলছে। হারিয়ে–যাওয়া দিন ফিরিয়ে এনেছে। অথবা যে–দিন হারিয়ে যেতে চায় তাকে না হারাতে দিয়ে হারিয়ে দিয়েছে। সেইসব দিনের ভিতরে থাকা বীণা, এসরাজ, তানপুরায় সুর তুলেছে।
এমন মন ভাল করা মনকেমনের বই আমি কমই দেখেছি। দেখিনি বললেও বেশি বলা হবে না। বইয়ের নাম ‘‌খেলা খেলা’‌। ছবি আর ছড়ায় সাজানো। শিকাগো নিবাসিনী নিবেদিতা বসু আর কলকাতা নিবাসী কৌশিক মুখোপাধ্যায়ের ভাবনা। এরা দু’‌জনেই পড়েছেন শান্তিনিকেতনের পাঠভবনে। বইয়ে নিবেদিতা সাদা–‌কালোয় এঁকেছেন ছবি। কৌশিক লিখেছেন ছড়া। ফেলে আসা দিন, ভালবাসা, আনন্দ, হাসি ছোটো ছোটো মন খারাপ ফ্রকের কোঁচড়ে, হাফপ্যান্টের পকেটে গুছিয়ে নেওয়ার খেলা খেলেছেন দু’‌জনে। শুধু অঁাকা লেখা নয়— ‘‌খেলা খেলা’‌ বইটির ডিজাইন, মুদ্রণ এত অভিনব এবং চমকপ্রদ যে প্রথমে বিশ্বাসই হয় না, এটি কোনও বাংলা বই!‌ ফুল পাতা ছড়িয়ে প্রচ্ছদ এঁকে দিয়েছেন যোগেন চৌধুরী। আহা!‌ বইটির প্রকাশক লুমিয়ের্জ। যদি স্টকে থাকে ‘‌খেলা খেলা’‌ পাওয়া যাবে শান্তিনিকেতনের ‘‌বইওয়ালা’‌তে। দাম ৩০০ টাকা।
বইতে আছে কী?‌ এককথায় শান্তিনিকেতন।
শিল্পী নিবেদিতা এবং ছড়াকার কৌশিক মুখবন্ধে লিখেছেন ভাবনার পিছনের কথা। মনকেমনের কথা। তাঁরা যখন পাঠভবনে পড়তেন ছেলেময়েদের নিয়ে যাওয়া হত কলাভবনে। একদলকে দেওয়া হত গ্রাফিক্স প্রিন্টিং–এর লিথো পাথরে ছবি আঁকতে আর বাকিদের দেওয়া হত কাগজ, ছড়া বা গল্প লেখার জন্য। তারপর হত খেলা। ছবি দেখে ছড়া বা গল্প লেখা, আবার উল্টোটাও। ছড়া বা গল্প দেখে ছবি। পরে নন্দনমেলায় ছেলেমেয়েদের এইসব কাজ নিয়ে প্রকাশ পেত সঙ্কলন। নাম ছিল ‘‌খেলা খেলা‌’‌। এখন আর ‘‌‌খেলা খেলা‌’‌ প্রকাশ হয় না। এই বই সেই মন ভাল করা মনকেমনের ছবি আর ছড়াদের ফিরিয়ে আনার বই। মোট বারোটা কাজ রয়েছে। ছ’‌টা দেখে, বাকি ছ’‌টা না–দেখে অঁাকা ও লেখা। বইটা উল্টে যে কারও মনে হবে সে–ও চলে গেছে তুলি, পেনসিল হাতে পাঠভবনে, কলাভবনে। সেও নেমেছে আঁকাজোকার খেলায়।
 আসি ছবির কথায়। আমি ছবি দেখি কিন্তু শিল্পবোদ্ধা হওয়ার মতো বোধবুদ্ধি নেই। তাই সহজেই বলতে পারি, নিবেদিতা বসুর প্রতিটি ছবিই অপূর্ব। সাদাকালোয় এত অনায়াস যে বারবার দেখতে মন চায়। ফর্মটি উডকাট বা কাঠখোদাই ছবির। সাদাকালো কাজের দরজা দিয়ে ঢুকে শিল্পী ছবিগুলোকে বর্ণময় করেছেন। কলমের নিপুণ অঁাচড়ে (‌নাও হতে পারে)‌ কোপাই, খোয়াই, ছাতিমতলা, বৈতালিকের গান–দৃশ্য, ভুবনডাঙার মাঠ, সোনাঝুরি জঙ্গলে টানটান ভাব এনেছেন। যেন বলেছেন, আজও তারা তেমনই সতেজ, সুন্দর এবং ঝলমলে। রাঙাধুলো, গাছের পাতা, পাখি আঁকতে গিয়ে  টেক্সচার তৈরি করেছেন যা শান্তিনিকেতনের অনুষঙ্গে যথার্থ। কালো বুনোটের পাশে সাদার অনুচর ছায়ারেখা গড়েছেন নিপুণ হাতে । ছবির আগু–পিছুতে কাগজের সাদা অংশ ছেড়ে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। পাতা নড়েছে, শালুক ফুটেছে, পাখি উড়েছে। জার্মান এক্সপ্রেশনিস্ট আন্দোলনে উডকাটের ভূমিকা সকলের অবগত (আমার নয়)‌। নিবেদিতা সেই ফর্মকে ব্যবহার করেছেন স্বকীয় ভাবনায়। তার ছবি জুড়ে বেজেছে যে সঙ্গীত তাতে শান্তিনিকেতনের রূপ সৌন্দর্যই প্রকাশিত। তার ছবি ছেলেবেলাকে পিছু ফিরে দেখেনি, সামনে রেখেছে। এই বইয়ের বারোটি কাজের মধ্যে দশটি এত ভাল যে বারবার দেখতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সেরা— বৈতালিকের গানের আসরটি। চোরকঁাটামাখা হলদে শাড়িটি সাদাকালোতেও ‘‌হলুদ’। ছবির পাখিটি যেন ডেকে উঠছে!‌
এবার ছড়া। ছবির মতো কবিতা, ‌ছড়াও আমি বুঝি না। তারপরেও বলি, কৌশিক একেবারে নিজস্ব ফর্ম গড়েছেন। না রাবীন্দ্রিক‌, না অন্নদাশঙ্কর, অমিতাভ চৌধুরী। বরং বলব কোথাও শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মতো নির্মোহ উদাসীন, কোথাও ভুলে থাকার বেদনা রয়েছে। যেমন শক্তি লিখেছিলেন—‘‌এখান থেকে আমার\‌ ইচ্ছে পথে নামার।\ কিন্তু পথগুলো সব নদীই\‌ রঙীন মাছটি হতাম যদি।’‌ অথবা‌ ‘‌ছেড়ে দিলেই পারি\‌ এই যে বাগান, ফুলের বাগান—বকনা সরা হঁাড়ি\‌ ছেড়ে দিলেই পারি.‌.‌.‌।’‌
কৌশিককে যেহেতু ছড়াগুলো লিখতে হয়েছে ছবি দেখে বা ছবির জন্য, সেহেতু অন্ত্যমিলের থেকে নির্মাণে তাঁকে সচেতন থাকতে হয়েছে। একটু এদিকে–ওদিকে হলে শুধু ছড়া নয়, ছবিও টালমাটাল হয়ে যেত। কৌশিক নিজেকে শুধু সামলেছেন এমনটা নয়, কোনও কোনও সময়ে স্বতন্ত্রও হয়ে উঠেছেন। আকাশের মেঘ, গাছের পাখির, গানের সুর ও কথার মতো। উদাহরণ দিই— বারবার লেখা\‌বারবার কঁাটা\‌ বারবার ছেঁড়া\‌ চিরকুট \‌ রাঙাধুলো মাখা\‌ ছেঁড়া পাতাগুলো\‌খঁুজে জুড়েছিলো দিকছুট?। আবার যখন লিখেছেন ‘‌খোলা আকাশ তোকে দিলাম\‌ আমি নিলাম খোয়াই\‌ ক্লান্ত ডানায় ফিরলে দেবো\‌ শেষ শ্রাবণের কোপাই।’‌—তখন যে দৃশ্যকল্পটি চোখে ভাসে তা নিজেই একটা ছবি। আবার ‘‌একটা কোপাই\‌ একটা দঁাড়কে মাছ\‌ একটা গল্প\‌ জল ছোঁয়া সেই গাছ।।’‌ ছড়াটি ছবি ছাড়া অসম্পূর্ণ হত। শেষে ‘‌অনেক চঁাদ আগে\‌ চঁাদ কিশোরী ছিলো\‌ মেঘ ছিলো না কোথাও\‌ বৃষ্টি পড়েছিলো।’‌র মতো কবিতা শুধু ছেলেবেলার নয়, বড়বেলার। বেঁচে থাকা বেলার।
আবার বলি, ‘‌খেলা খেলা’‌ কীভাবে পাওয়া যাবে জানি না। যদি না পাওয়া যায় তা হলে কিন্তু আফসোস। যারা কখনও পাঠভবনে, কলাভবনে পড়েছেন বা শিখেছেন তাদের কাছে আফসোস তো বটেই, যারা তা নন (‌আমার মতো, নন্দন ত্বত্ত বোঝে কম) তাদের কাছেও বটে।‌ ■
 

জনপ্রিয়

Back To Top