শম্পা ঘোষ: বিগত কয়েক বছর ধরে একটা কথা প্রায়ই শোনা যাচ্ছে যে, শান্তিনিকেতন তথা বিশ্বভারতী আদর্শচ্যুত হয়েছে। শান্তিনিকেতনের গৌরব, ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে তার পরিবেশ। ‘‌বিশ্বভারতী ও তার ভবিষ্যৎ’‌ বইটি পড়েও এমন মনে হওয়াটা স্বাভাবিক। সম্পাদক রজতশুভ্র মজুমদার বইটিতে বিশ্বভারতীর বর্তমান বিপন্নতার কথা তুলে ধরেছেন। এই গ্রন্থে অম্লান দত্ত, শিবনারায়ণ রায়, শঙ্খ ঘোষ, ভবতোষ দত্ত, যোগেন চৌধুরি এবং আরও অনেক গুণিজন বিশ্বভারতীর ভবিষ্যৎ বিষয়ে তাঁদের মতামত ব্যক্ত করেছেন। জয়দেব বসু— ‌এক প্রাক্তনীর ভাবনাও এখানে স্থান পেয়েছে। এঁেদর বেশিরভাগই ভবিষ্যতের বিশ্বভারতী নিয়ে উৎকণ্ঠিত, কেউ কেউ আবার অতটাও আশাহত নন।
শান্তিনিকেতনের আদর্শ কী ছিল, বলতে গিয়ে একটু অতীতের কথায় আসতে হয়। ১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে ‘‌ব্রহ্মচর্যাশ্রম’‌ নামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এই বিষয়ে কবি জগদীশচন্দ্রকে একটি চিঠিতে লেখেন ‘‌‌গুটিদশেক ছেলেকে আমাদের ভারতবর্ষের নির্মল শুচি আদর্শে মানুষ করিবার চেষ্টায় আছি।’‌ কবি চেয়েছিলেন খোলামেলা প্রকৃতির মধ্যে একটি আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠুক। তিনি ক্রমশ উপলব্ধি করলেন, ‘‌বিদ্যালয়কে বিশ্বের সঙ্গে ভারতের যোগের সূত্র করে তুলতে হবে।’‌ এখানে হবে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ভাববিনিময়। ১৯২১ সালের ২৩ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বমৈত্রীর সঙ্কল্পে প্রতিষ্ঠিত হল ‘‌বিশ্বভারতী।’‌ রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন, গ্রামের মানুষের প্রয়োজনে তাদের জীবনকে উন্নত করতে। শ্রীনিকেতন এইসব ভাবনারই বাস্তব রূপায়ণ। এই শান্তিনিকেতন–‌শ্রীনিকেতনের মিলিতরূপ ‘‌বিশ্বভারতী’,‌ তা কিনা আজ আদর্শভ্রষ্ট!‌
শান্তিনিকেতনের আদর্শ বলতে এক ধরনের বিশিষ্টতাকে বোঝায়, যা অন্যত্র পাওয়া যায় না। এখানে গতানুগতিক পড়াশোনার সঙ্গে আছে কতগুলো উৎসব–‌অনুষ্ঠান, যা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। বৃক্ষরোপণ, হলকর্ষণ, বর্ষামঙ্গল, শিল্পোৎসব, শারদোৎসব, বসন্তোৎসব। আছে সাপ্তাহিক মন্দির বা উপাসনা, গান্ধিপুণ্যাহ, আনন্দমেলা, নন্দনমেলা। এই সব উৎসব–‌অনুষ্ঠানের ঐতিহ্য আজও বর্তমান। এগুলি অব্যহত রাখাই যদি শান্তিনিকেতনের আদর্শ হয়, তবে তো শান্তিনিকেতনকে আদর্শভ্রষ্ট বলা ঠিক নয়। এখনও আম্রকুঞ্জ, বকুলবীথি, গৌরপ্রাঙ্গণে ছাত্রছাত্রীরা গোল হয়ে বসে কোলাহলহীনভাবে ক্লাস করে। সেই নিস্তব্ধ পরিবেশ আজও অক্ষুণ্ণ।
আমার সৌভাগ্য হয়েছিল, কয়েকটা বছর পাঠভবনের ছাত্রী হওয়ার। ওই সময়গুলোকে আমি এখনও আমার জীবনে কাটানো সেরা সময় বলে মনে করি। কালের নিয়ম মেনেই যুগ বদলেছে। তাই আশ্রমের আগেকার চেহারার অনেকটাই বদল ঘটেছে। আগেকার সেই খোলা প্রান্তর, অবাধ যাতায়াত বিরল। বাইরের থেকে লোকজন এসে এখানে বাড়ি করছেন, ফাঁকা জায়গা ভরে যাচ্ছে। বসন্তোৎসবে মানুষের স্রোতকে সামলানো যাচ্ছে না। পৌষমেলা লোকে লোকারণ্য। এত সবের মাঝেও যখন দোলের আগের রাতে বৈতালিকে আশ্রমবাসীদের সঙ্গে বাইরের লোকও ‘‌আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে’‌, ‘‌ও আমার চাঁদের আলো’‌ গেয়ে ওঠেন, তখন এক লহমায় পরিবেশটা কেমন মায়াময় হয়ে যায়। এখনও যখন কোনও অনুষ্ঠানের শেষে ‘‌আমাদের শান্তিনিকেতন’‌ গানটি কণ্ঠে কণ্ঠে ধ্বনিত হয়, মুহূর্তেই শান্তিনিকেতন সকলের ‘‌সব হতে আপন’‌ হয়ে ওঠে। তাই অমিত্রসূদন ভট্টাচার্যের মতো আমারও মনে হয়, শান্তিনিকেতনের মাটিতে যে দিন এ গান থেমে যাবে, সেদিন হয়তো প্রকৃতই তার অবসান ঘটবে। তবে আমি আশাবাদী, তাই সবশেষে বলি, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে চর্চা আজও অব্যাহত। তাঁকে নিয়ে ভাবনাচিন্তা আজও ফুরিয়ে যায়নি। এই ভাবনা শান্তিনিকেতনের, তথা বাংলা ও বাঙালির। ■
বিশ্বভারতী ও তার ভবিষ্যৎ • সম্পাদক রজতশুভ্র মজুমদার             
পুনশ্চ • ১২৫ টাকা‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top