সুধীর চক্রবর্তী
একত্র মিলিল যদি:‌ আলাউদ্দিন ও রবীন্দ্রনাথ •‌ সর্বানন্দ চৌধুরী •  দে’‌জ •‌ ১৫০ টাকা
প্রমথ চৌধুরী একবার একটা দামি কথা লিখেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল:‌ ‘‌কণ্ঠে যা যন্ত্রে যিনি কখনও সাতসুরের চর্চা করেননি, তাঁর পক্ষে সংগীতবিষয়ে কিছু বলা বা লেখা উচিত নয়।’‌ কথাটা যুক্তিপূর্ণ। কেননা সংগীত ক্রিয়াত্মক শিল্প। তাকে রূপায়ণ করতে হয়। যন্ত্রে যখন সংগীত রূপায়িত হয়, তখন লাগে দীর্ঘদিনের অনুশীলন, যার কৌশলে যন্ত্র মুখরিত। গড়পড়তা যন্ত্রশিল্পী তথা বাদকের সংগীতবোধ সুরের জ্ঞান আর বস্তুগত যন্ত্রকে মৌন থেকে মুখর করবার কেরামতি ঠিক ঈশ্বরদত্ত শক্তি নয়, তা বহুলাংশে মানুষেরই উদ্‌ভাবন এবং সংগীতের অনুষঙ্গী বাদ্যযন্ত্রগুলি তো মানুষেরই নির্মাণ। তাতে লাগে ধ্বনিবিজ্ঞানের গভীর জ্ঞান। তুলনায় কণ্ঠসংগীত অনেকটাই ব্যক্তিনির্ভর, কারণ সকলের কণ্ঠে সুর মেলে না।
ভাবনাগুলি জেগে উঠল ‘‌একত্র মিলিল যদি:‌ ‌আলাউদ্দিন ও রবীন্দ্রনাথ’ হাতে পেয়ে। লেখক:‌ সর্বানন্দ চৌধুরী। সর্বানন্দ বৃত্তিতে বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, কিন্তু সংগীতবিষয়ে অধিকারী ব্যক্তি। অধিকন্তু অনুসন্ধানী গবেষক। বিশেষভাবে বলবার কথা, তাঁর কৃত বেশ ক’‌টি সনিষ্ঠ গবেষণার কাজ সংগীতবিষয়ের অভিমুখী। জানা যাচ্ছে, গানবিদ্যা সম্পর্কে তাঁর তালিম প্রথমে পিতা দিলীপকুমার চৌধুরীর কাছে, পরে জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ এবং সরোদিয়া শ্যাম গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে। এমনতর তথ্য থেকে নির্ণয় করা যায় যে, অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত বয়সি সর্বানন্দ‌ কণ্ঠ ও যন্ত্র— দুটি ক্ষেত্রেই দীক্ষিত ও নিষ্ণাত। তাই তিনি যখন রবীন্দ্রনাথ ও আলাউদ্দিন খাঁ–‌র মতো দুইটি হৃদয়ের নদীকে একত্র সম্পৃক্ত হবার বিরলতম ঘটনাকে তাঁর সতর্ক ও মেধাবী লাবণ্যে ভরে গ্রন্থাকারে উপস্থাপন করেছেন, তখন তাতে সমীকৃত হয়েছে গবেষকের শ্রম ও সন্ধান, সাংগীতিক অভিজ্ঞতার গভীরতা এবং সাহিত্যপাঠের ধারানিবদ্ধ দীপ্তি। একজন অগ্রজ পদাতিক হিসাবে আমি সর্বানন্দকে বরণ করে নেব এবং বাহবা দেব এই জন্য যে, বাংলাভাষায় হালফিল সংগীতবিষয়ে লেখনী চালনার ব্রতীর সংখ্যা নিতান্তই শীর্ণ। তাঁর অন্যতর কৃতিত্ব এইটা যে, রবীন্দ্রনাথ–‌আলাউদ্দিন সম্পর্ক ও সান্নিধ্যবিষয়ে আগে আমাদের ততটা জানা ছিল না। স্পষ্টত দুটি প্রসঙ্গ লেখক তাঁর অনুসন্ধানী মনন থেকে আলোকিত করেছেন। প্রথমত শান্তিনিকেতনে সংগীতবিদ্যা দানের জন্য রবীন্দ্রনাথ কর্তৃত্ব বিশেষভাবে আহূত আলাউদ্দিনের সঙ্গে গুরুদেবের সঙ্গকথা এবং যন্ত্রসংগীতবিষয়ে রবীন্দ্রনাথের মনোভাব‌ কেমন ছিল।
১৯৩৫ সালে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনের সংগীতভবনে শিক্ষকতার কাজে খাঁ সাহেবকে আহ্বান করেন। তিনি আসেন, থাকেন ক’‌দিন কবি–‌সান্নিধ্যে, কিন্তু বিশ্বভারতীতে যোগ দিতে সক্ষম হন না। কেননা, ১৯১৮ সাল থেকে বা তার আগে থেকে মাইহার রাজের আমন্ত্রণে ‘‌রাজগুরু’‌র দায়িত্ব নিয়ে যন্ত্রসংগীতের এক ক্রিয়াত্মক চর্চার পরিসর তিনি গড়ে তুলেছিলেন।
১৯৩৫ সালে তিনি যন্ত্রদক্ষ শিল্পী আলাউদ্দিনকে ডাকলেন শান্তিনিকেতনে। কিন্তু আলাউদ্দিনকে মাইহার রাজা ছাড়তে রাজি হলেন না বলে আলাউদ্দিন সৌজন্যবশত এলেন রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে, বিকল্প হিসেবে দিয়ে গেলেন ছোট ভাই আয়েৎ আলি খাঁকে।
১৯৩৫ সালে আলাউদ্দিন যখন কিছুদিনের জন্য কবি–‌সান্নিধ্যে শান্তিনিকেতনে ছিলেন, তখন ৩০শে শ্রাবণ এক বর্ষামঙ্গল অনুষ্ঠানের বিবরণ দিয়ে রবীন্দ্র–‌জীবনীকার লিখেছেন:‌ ‘‌কবির শরীর অসুস্থ বলিয়া স্থির হয় যে, বর্ষা–‌মঙ্গলের উৎসবক্ষেত্রে তিনি আসিবেন না;‌ কিন্তু জলসার মধ্যে হঠাৎ তিনি উপস্থিত হইলেন দেখিয়া সকলে বিস্মিত হইল— শান্তিনিকেতনে থাকিয়া উৎসবে উপস্থিত না থাকা বা মন্দিরে উপাসনা না করা তাঁহার পক্ষে সম্ভব হইত না। সেদিনের আকর্ষণ ছিল আলাউদ্দিন খাঁর যন্ত্রসঙ্গীত।’
পরে আয়েৎ আলি আনলেন তাঁর তবলা ও এসরাজের শিষ্য ইয়ার রসুল খাঁকে। এ ছাড়া আলাউদ্দিনের সেজোভাই আফতাবউদ্দিনের শ্যালক আলি আহম্মদকেও আয়েৎ রবীন্দ্রনাথের ইচ্ছায় শান্তিনিকেতনে নিয়ে আসেন যন্ত্রসংগীতের শিক্ষকতার জন্য। 
প্রসঙ্গক্রমে সর্বানন্দ ভারী চমৎকার একটা ঘটনার বিবরণ হাজির করেছেন। রবীন্দ্র–‌সান্নিধ্যে যে সময়ে খাঁ সাহেব ছিলেন, তার প্রতিবেদন প্রসঙ্গে জানা যায়, যখন বোঝা গেল খাঁ সাহেব মাইহারে এবারে ফিরে যাবেন, তখন রবীন্দ্রনাথ নন্দলাল বসুকে ডেকে মজা করে বলেন, ‘‌নন্দলাল, আলাউদ্দিনের মাথাটা রেখে দাও।’‌ গুরুদেবের বাক্যের ইঙ্গিত বুঝে নন্দলাল তাঁর শিষ্য রামকিঙ্করকে দিয়ে আলাউদ্দিনের মুখটি ভাস্কর্যে স্থায়ী করে রাখেন। সেই দুর্লভ ও দুষ্প্রাপ্য মূর্তির ফটোচিত্র সর্বানন্দ বইয়ে সন্নিবেশ করে আমাদের ঋণী করেছেন।
রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের ১১ বছর পরে ১৯৫২ সালে বিশ্বভারতীর বিশেষ আমন্ত্রণে দিনেন্দ্র অধ্যাপক পদে ভিজিটিং প্রফেসররূপে আলাউদ্দিন খাঁ আসেন এবং মাস দুয়েক থাকেন। সঙ্গে ছিলেন তাঁর পৌত্র আশিস খাঁ। সে সময়ে তাঁকে উদয়ন বাড়ির সামনে কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথের পৌরোহিত্যে এবং ক্ষিতিমোহন সেনের উপস্থিতিতে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ১৯৬১ সালে আলাউদ্দিনকে বিশ্বভারতীর সর্বোচ্চ সম্মান ‘‌দেশিকোত্তম’‌ উপাধি দেওয়া হয়। তখন তিনি উপস্থিত ছিলেন না। ১৯৫২ সালে যখন তিনি শান্তিনিকেতনে ছিলেন, তখন আনন্দবাজার পত্রিকায় তাঁকে নিয়ে প্রবন্ধ লেখেন শান্তিদেব ঘোষ। লেখাটির শিরোনাম ‘‌সংগীত–‌সাধক আলাউদ্দিন খাঁ’‌। একই সময়ে শান্তিদেবের ছোটভাই শুভময় মুখে মুখে বলা ওস্তাদের জীবনকাহিনী লিখে নেন। যা কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় ১৯৫৭ সালে।
সর্বানন্দের বইতে মুদ্রিত রয়েছে খাঁ সাহেবের শান্তিনিকেতনে বসবাসকালের দুটি স্কেচ (‌বাদনরত)‌। এঁকেছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী সুরেন কর ও ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ দেববর্মন। সেই সঙ্গে শান্তিনিকেতনে ১৯৫২ পর্বে তাঁর কয়েকটি বাদনরত আলোকচিত্র বইটির মর্যাদা বাড়িয়েছে। পুরোনো সংবাদপত্রের প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিতে আলাউদ্দিন মূল্‌হা, কেদারা ও কল্যাণের মিশ্রণে রবীন্দ্ররাগ সৃষ্টি করেন এবং তাঁর জন্মশতবর্ষে কলকাতার পার্কসার্কাস ময়দানে রবীন্দ্রমেলার অনুষ্ঠানে সেটি গেয়ে শোনান। 
এ তথ্যে তাঁর গায়কমূর্তির কথা জানা গেল।
যাই হোক, সরকথা হল, সর্বানন্দ চৌধুরীর লেখা এই বইটি যথেষ্ট সুপরিকল্পিত, বিধিবদ্ধ গবেষণা পদ্ধতিতে সম্পন্ন এবং চমৎকার মরমি মনের হৃদয়াবেগে লেখনীভাষ্যে সমুজ্জ্বল। দুই অনন্যপ্রতিভা তথা দুইটি মহানদীর এমন মিলনমিশ্রণের সত্যচিত্র আমাদের মুগ্ধ করেছে। রবীন্দ্রজীবনের এক অনতিপরিচিত অধ্যায় এ বইয়ে চিরচিহ্নে সমৃদ্ধ হয়ে রইল।‌‌‌‌‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top