অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য: রবীন্দ্রপত্রাভিধান ১–‌৪ খণ্ড • বিজন ঘোষাল • পত্রলেখা • প্রতি খণ্ড ৪৫০ টাকা
জুলাই ২০১৩ রবীন্দ্রপত্রাভিধানের প্রথম খণ্ড এবং ২০১৫ জুনে ‌রবীন্দ্রপত্রাভিধানের চতুর্থ খণ্ড প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ দু বছরের মধ্যে এই বইয়ের চারটি খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে। এই বৃহদাকার চার–চারটি খণ্ড দেখে অনুমান হয় কম করেও ত্রিশ–‌পঁয়ত্রিশ খণ্ডে সম্পাদক–‌সঙ্কলক এই বই প্রকাশ করার কল্পনা বা পরিকল্পনা নিয়েছেন। ২০১৫ জুলাই থেকে ২০১৮ এপ্রিল, এই পৌনে তিন বছরের মধ্যে এই বইয়ের আর একটি খণ্ডও প্রকাশিত হয়নি। ভয় হয় আর কোনও খণ্ড বেরচ্ছে না দেখে!‌ বৃহৎ পরিকল্পনা স্বরবর্ণের ‘‌অ’‌য়ে এসেই মাথা ঠুকে মরবে না তো?‌ বাংলা ভাষায় এই ধরনের কোষগ্রন্থ বহু স্থলেই মাঝপথে এসে দাঁড়িয়ে গেছে;‌ শেষ হতে পারেনি। 
‘‌বঙ্গীয় শব্দকোষ’‌ গ্রন্থের প্রথম সংস্করণের আখ্যাপত্রে বইয়ের শিরোনামের নিচে মুদ্রিত ‘‌শ্রীহরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় কর্তৃক সঙ্কলিত’‌। ‘‌রবীন্দ্রপত্রাভিধান’ গ্রন্থের প্রচ্ছদে বা আখ্যাপত্রে সঙ্কলকের নামের পাশে ‘‌সঙ্কলিত’‌ ইত্যাদি কোনও শব্দ নেই। না–‌থাকুক;‌ তথাপি আমাদের এই সমালোচনা–‌নিবন্ধে বিজন ঘোষালকে লেখক গ্রন্থকার ইত্যাদি না বলে সঙ্কলক বলেই অতঃপর উল্লেখ করব।
রবীন্দ্রপত্রাভিধান গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথের লেখা অদ্যাবধি প্রাপ্ত সব চিঠি কবির পত্রপ্রাপকদের নামের বর্ণানুক্রমিক ভিত্তিতে সঙ্কলন সম্পাদনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন গ্রন্থ–সঙ্কলক। অর্থাৎ ‘‌অ’‌–‌‘‌আ’‌ থেকে শুরু করে শেষে ‘‌হ’‌–‌য়ে গিয়ে হবে সম্পূর্ণ। হয়ত শেষ হবে প্রাপক হেমন্তবালা বা হৈমন্তী দেবীতে।
এ–যাবৎ যে চারটি ভল্যুম বেরিয়েছে তার অবলম্বন শুধু ‘‌অ’‌।
দেখা যাচ্ছে চারেও ‘‌অ’‌ শেষ হয়নি। আশা করা যায় আরও অন্তত একটি খণ্ড ‘‌অ’‌–‌এর জন্য প্রয়োজন হবে। তার পরে ‘‌আ’‌–‌এর আশা, নাকি আশঙ্কা?‌
এ–‌বই হাতে নিয়েই মনে হয়েছিল সঙ্কলকের কল্পনাটি তারিফযোগ্য;‌ কিন্তু পরিকল্পনাটি নয়।
সঙ্কলক বিজন ঘোষালের বিশেষ যে প্রশংসার দিক, সে–‌কথাটি আমি আগে বলতে চাই। তা হল, সঙ্কলক রবীন্দ্রনাথের প্রতিটি সঙ্কলিত চিঠির নিচে যে সম্পাদকীয় ‘‌পত্র–‌প্রসঙ্গ’‌ ও ‘‌টীকা’‌ রচনা করেছেন— সেই কাজটিকে আমি এককথায় বলব অসাধারণ। এই কাজে তাঁর সুগভীর অনুসন্ধান ও গবেষণার প্রভূত প্রমাণ রয়েছে। যে–‌সব পত্রপ্রাপকের নাম আমাদের অপরিচিত, তাঁদেরও যথাসাধ্য পরিচয়ের সন্ধান দিয়েছেন। এমন পরিশ্রমসাধ্য কাজের জন্য আমি সঙ্কলক মহাশয়কে সাধুবাদ ও সেলাম জানাই।
যিনি প্রশংসার যোগ্য, তাঁকে সাধুবাদ ও অভিনন্দন জানিয়ে কতো সুখ!‌
আবার এই বইয়ের দুর্বলতার পাল্লাটাও বড্ড ভারী— আমাকে বলতেই হবে।
এই বই রবীন্দ্রনাথের পত্রাবলীর সংগ্রহ;‌ কিন্তু সঙ্কলক সঙ্কলিত চিঠিগুলি কোথা থেকে সংগ্রহ করেছেন নব্বইভাগ স্থলে তার কোনও সূত্রনির্দেশ করেননি। পাঠকের মনে হবে সঙ্কলিত হাজার হাজার চিঠির আবিষ্কারক সংগ্রাহক সঙ্কলক এবং মুদ্রক কেউই নন;‌ একমাত্র বিজন ঘোষাল। ‘‌বিশ্বভারতী’‌ নয়, ‘‌প্রবাসী’‌ নয়, ‘‌দেশ’‌ নয়, ‘‌বিশ্বভারতী পত্রিকা’‌ নয়, কেউ নয়। পূর্বসূরিদেরও সঙ্কলক যথেষ্ট অবজ্ঞাই করেছেন। প্রশান্তকুমার পাল প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘‌রবীন্দ্রনাথের পত্ররচনার মূল্যায়ন অনেক ক্ষেত্রে  করলেও বহু ক্ষেত্রে তা উপেক্ষিত থেকে গেছে।’‌ ১৯৮৪–‌তে প্রকাশিত গৌরচন্দ্র সাহার বিখ্যাত বই ‘‌রবীন্দ্রপত্রাবলী:‌ তথ্য পঞ্জী’‌— যা এতকাল রবীন্দ্রচর্চায় আকর গ্রন্থরূপে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে;‌ সেই বইটি প্রসঙ্গে বিজন বলছেন, ‘‌গ্রন্থটি আসলে রবীন্দ্রনাথের পত্রপ্রকাশের একটি ক্যাটালগ মাত্র। গ্রন্থটি থেকে পত্রটির বিষয় কিছুই অনুমান করা সম্ভব নয়।’‌ এই মন্তব্যের যে কোনও সারবত্তা নেই তার প্রমাণস্বরূপ গৌর সাহার র‌য়্যাল সাইজের সাড়ে পাঁচশো পৃষ্ঠার বইয়ের যে–‌কোনও একটি পাতা খুলে যে–‌কোনও একটি এনট্রি সম্পূর্ণ উদ্ধৃত করতে পারি। ‘‌‘‌২০৯১। [‌১৯২৩ জুন ২৬]‌ ১৩৩০ আষাঢ় ১১/‌আশুতোষ মুখোপাধ্যায়/‌ কলকাতা/‌কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.‌ এ.‌ পরীক্ষায় বাংলার অন্যতম পরীক্ষক/‌ বিশ্বভারতী পত্রিকা ১৩৭১ কার্তিক–‌পৌষ, পৃ. ‌১১৭/‌ আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সনির্বন্ধ অনুরোধে কবি বিশ্ববিদ্যায়ে বংলায় এম.‌ এ.‌ পরীক্ষক নিযুক্ত হতে স্বীকৃত হয়েছিলেন। দীনেশচন্দ্র সেন প্রেরিত নমুনা–‌প্রশ্ন দেখে কবির ধারণা হয়েছে, যে–‌কতকগুলি বিশেষ বই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয় তার উপরে ভিত্তি করেই প্রশ্ন রচিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। সেই সব বই কবির ভাল পড়া নেই, তাই পরীক্ষক হবার দায় থেকে মুক্তি চেয়েছেন কবি।’‌’‌ কবে, কাকে, কোথা থেকে লিখেছেন, চিঠির প্রথম ছত্র, কোন পত্রিকায় মুদ্রিত এবং তৎসহ সমগ্র চিঠির সার–‌সংক্ষেপ— এমন বিস্তৃত রবীন্দ্রপত্রাবলীর তথ্যপঞ্জিকে বিজন ঘোষাল বলে দিলেন— ‘‌রবীন্দ্রনাথের পত্র প্রকাশের একটি ক্যাটালগ মাত্র।’‌ পূর্বসূরির প্রতি তাঁর এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিরূপ বিকৃত মন্তব্য দুর্ভাগ্যজনক।
রবীন্দ্রপত্রাভিধানে রবীন্দ্রনাথের একাধিক ইংরেজি চিঠিও সঙ্কলিত হয়েছে। যদি কোনো পাঠক ইংরেজি না বোঝেন— বুঝি এমন আশঙ্কায় সঙ্কলক মহাশয় প্রতিটি চিঠির নিচে ‘‌বঙ্গানুবাদ’‌ বলে বাংলা মানেও লিখে দিয়েছেন। বইয়ের নাম ‘অভিধান’‌‌ বলেই কি?‌
শান্তিনিকেতনে প্রতিটি প্রাপকের নামে–নামেই তো আলাদা ফাইল আছে। রবীন্দ্রভবনে গেলেই তো তার হদিশ মিলবে। প্রাপকভিত্তিক কয়েক হাজার চিঠি তো বিশ্বভারতী ১৯ খণ্ডে ‘‌চিঠিপত্র’‌ সংগ্রহে ইতিমধ্যেই প্রকাশ করেছেন।
রবীন্দ্রপত্রাভিধানে সঙ্কলিত রবীন্দ্রনাথের প্রথম চিঠি অক্ষয়কুমার ভট্টাচার্যকে লিখিত। একটিই মাত্র চিঠি;‌ ৫ অক্টোবর ১৯৩৪–‌এ লেখা। সঙ্কলক জানিয়েছেন, ‘‌রবীন্দ্র–‌অক্ষয়কুমার ভট্টাচার্যের পত্রালাপ প্রসঙ্গে আলোচ্য পত্রটি ছাড়া আর কোনও পত্রের সন্ধান পাওয়া যায়নি।’‌ আমি এক্ষেত্রে অক্ষয়কুমার ভট্টাচার্যকে লেখা মোট চারটি চিঠির সন্ধান দিতে পারি। এক.‌ ৫ অক্টোবর ১৯৩৪;‌ ‘‌চিঠিপত্র’‌ নবম খণ্ডে সঙ্কলিত। বিজন সূত্রনির্দেশ করেননি। দুই.‌ ৪ জানুয়ারি ১৯৩৫;‌ শারদীয় দেশ ১৪১৮। তিন.‌ ১৭ অক্টোবর ১৯৩৮;‌ রবীন্দ্রভবন সংগ্রহ। চার.‌ ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯;‌ রবীন্দ্রভবন সংগ্রহ।
আসল তো দরকার বাংলা ইংরেজি মিলিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাড়ে বারো হাজার চিঠির কলানুক্রমিক বিন্যাস। আপাতত নয় শুধু বাংলা পত্রাবলীই হোক। এই বিন্যাসেই জীবন ও মননের প্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথকে যথার্থ উদ্ধার সম্ভব।
সেই কারণে বিশ্বভারতীও সম্প্রতি অধ্যাপক গৌতম ভট্টাচার্যের কর্মাধ্যক্ষতায় এক ঝাঁক কৃতী গবেষকের প্রযত্নে কালানুক্রমিক রবীন্দ্র–‌রচনাবলী সম্পাদনায় ব্রতী হয়েছেন। আশা করব কালানুক্রমিক রবীন্দ্র–পত্রাবলী প্রকাশের কথাও বিশ্বভারতী ভবিষ্যতে ভাববেন। সেই কর্মযজ্ঞ সম্পাদনে গৌরচন্দ্র সাহা বিজন ঘোষালদের মতো রবীন্দ্রপত্রগবেষকদেরই তো নেতৃত্ব দেওয়া প্রয়োজন।‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top