সব্যসাচী সরকার

কৃষ্ণবেণী • সায়ন্তনী পূততুণ্ড •‌ 
মিত্র ও ঘোষ • ২২০ টাকা
প্রাণপ্রতিষ্ঠা • নন্দিতা বাগচী •‌
মিত্র ও ঘোষ • ২০০ টাকা
দ্রোহপর্ব • রাজীব সিংহ •‌ 
উবুদশ •‌ ২৫০ টাকা
গল্পসংগ্রহ •‌ বাণীব্রত চক্রবর্তী •‌ 
এবং মুশায়েরা • ৪০০ টাকা
বাদ্যিকরের বাজনা •‌ সুব্রত সরকার • 
এবং মুশায়েরা •‌ ১৫০ টাকা
সায়ন্তনী পূততুণ্ডের কৃষ্ণবেণী উপন্যাসটি সাম্প্রতিক। পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, উপন্যাসের নির্মাণ দক্ষিণ ভারতের কোনও গ্রামে বসেই। দেখাও সম্ভবত। হতে পারে, দেখা থেকেই লেখার উদ্যোগ। উপন্যাসের আশ্রয় নারী। কন্যাসন্তান। রয়েছে ধর্ম (‌নাগবল্লী ও কৃষ্ণবেণী যার সামাজিক শিকার)‌। উপন্যাসের কুশীলবেরা প্রথা ভাঙার চেষ্টায় তৎপর। কিন্তু সংস্কার বড় বালাই। দেবদাসীদের জীবনযন্ত্রণার কাহিনী। সেখানেই ঢুকে পড়েছে আইন, এনজিও, সমাজকর্মী। কৃষ্ণবেণী আমার দেশের কথা। মীনাক্ষী মন্দির, জগন্নাথ দেবের মন্দির, আরও কত মন্দিরে দেবদাসীদের জীবন কেটেছে, তা ধর্মের মোড়কে শোষণের কৃষ্ণ ইতিহাস। ভাবছিলাম, দেবদাসীদের গান বা পুরোহিততন্ত্রে ব্যবহৃত নিষিদ্ধ ভাষার ব্যবহার আছে কি না। কৃষ্ণবেণী আর তার মা নাগবল্লীর লড়াই, দূরত্ব ও মহত্ত্ব শিহরিত করে। নাগবল্লীর আত্মঘাতী হওয়া অনিবার্য ছিল কি না, তা–ও প্রশ্ন থাকে। মেয়ের হাতে চড় খেয়ে আত্মঘাতী হলেন?‌ কৃষ্ণবেণীর উত্থান চমকপ্রদ।
নন্দিতা বাগচীর প্রাণপ্রতিষ্ঠা উপন্যাসটির বড় প্রেক্ষাপট। উপন্যাসের শেষ হচ্ছে সনাতন মূল্যবোধের উঠোনে এসে। ভুবন ভ্রমণের শেষে, নিজের দেশকেই তো যুগে যুগে নতুন দেশ মনে হয়। আশ্রয় হয়ে ওঠে অনন্তের সমার্থক। নন্দিতা বাগচীর লেখায় প্রাচীন ও আধুনিক— দুই জগতের আশ্চর্য টানাপোড়েন রয়েছে। কোথায় তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার কর্মী (‌স্যমন্তক)‌, কোথায় ছিল মার্কিনি স্বাস্থ্যবিমা সংস্থার কর্মী নীহারিকা?‌ তারা দীর্ঘদিন গোপন জীবনে থাকত। অবশ্যই প্রেমজীবন। তারপর বিয়ে। তারপর সাপ্তাহিক অদর্শনের পালা। সপ্তাহের শেষে তাদের দেখা হয়। কেন?‌ দু’‌জনের কাজের সময়, স্থান, কাল, ব্যস্ততা। স্যমন্তক চাকদার ছেলে। প্রাচীনপন্থী পরিবার। পালা–‌পার্বণ থাকে।

নীহারিকার বাবা ঢাকার বিক্রমপুরের মানুষ। দেশভাগের যন্ত্রণা। বিক্রমপুরেই থাকে তার মন। এ জন্য ডিমেনশিয়ায় ভুগে হঠাৎ হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে যান। নিশ্চয়ই ফেলে আসা মাটির সন্ধানে। কলকাতা তার কাছে নির্বাসন। স্যমন্তক, নীহারিকা সন্তান চায়। জীবনযাপন সে ইচ্ছেয় বাধা। উপন্যাসের চমক একেবারে শেষে। আইন মেনে ভ্রূণ তৈরি করে তারা। সেই ভ্রূণ কি সন্তান স্যমন্তক আর নীহারিকার?‌ উপন্যাস শেষ হচ্ছে এক উত্তরণে। মূল্যবোধের উত্তরণে। নন্দিতা শিকড়ের টানকেই বড় করে দেখিয়েছেন।
রাজীব সিংহের উপন্যাস ‘‌দ্রোহপর্ব’‌ বহুদিন আগেই প্রকাশিত একটি সাহিত্য পত্রিকায়। উত্তম পুরুষে লেখা উপন্যাসটির প্রেক্ষাপট বিস্তৃত। কমবেশি ৪০ বছরের বৃত্ত। বাংলার রাজনৈতিক বদল, পালাবদলের সময়। রাজীব এই সময়ের লেখক। তাঁর ভাষা আধুনিক। দেখাও। উপন্যাসটি শেষ হচ্ছে সুতীব্র এক আশাবাদের আলোকে। বস্তুত, বাংলায় রাজনৈতিক উপন্যাসের ধারায় এটি আরও একটি সংযোজন। তবে রাজীব লেখায় ভণিতা করেননি। যা বিশ্বাস করতে পেরেছেন, লিখেছেন তাই। ধন্যবাদ।
বাণীব্রত চক্রবর্তী প্রতিষ্ঠিত লেখক। তাঁর গল্পসংগ্রহ পাঠকের কাছে নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। বাণীব্রতর মুনশিয়ানা তাঁর ভাষা ব্যবহারে। উত্তর কলকাতার পরিবেশ ও মানুষজন এবং তাদের জীবনযাত্রার আলো–আঁধারি নানান মাত্রায় তাঁর বেশকিছু গল্পে ফিরে ফিরে আসে। বারবার আমাদের তা ছঁুয়েও যায়। আবার বাংলার মানুষের কথা পাঠকের কাছে বাণীব্রত পৌঁছে দেন, স্বাভাবিক ছন্দে। ঝরঝরে গদ্যে। ভাল লাগে ‘‌কাচভাঙা জানলা অবৈধ দেওয়াল’‌, ‘‌অসুখ কেন কুসুম হয়’‌, ‘‌তিন বছর আগের তিনদিন’‌, ‘‌বহুব্রীহি’,‌ বিতত বিতংস’‌, ‘‌তৃতীয় স্বপ্ন’‌।
বয়সে অপেক্ষাকৃত তরুণ গল্পকার সুব্রত সরকার। ‘‌বাদ্যিকরের বাজনা’‌ কুড়িটি গল্পের সঙ্কলন। সুব্রত স্বতন্ত্র ভাষায় লেখেন। গ্রামজীবন, শহর জীবনের আলোছায়ায় চরিত্রের কায়ানির্মাণে তিনি কুশলী কারিগর। তিনি নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ান, তাই লেখাতেও সেই নিসর্গ চিন্তার ছাপ। বক্ষ্যমাণ গল্পগ্রন্থে ভাল লাগে ‘‌দুই নারী ও এক হত্যাকারী’‌, ‘‌যদিও কৃতজ্ঞ’‌, ‘‌পাখি টুডুর পাঠশালা’‌, ‘‌রাঙামাটির মুর্মুমাসি’‌, ‘‌মায়ামাটি’‌ ইত্যাদি।‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top