দুরারোগ্য মোবাইলোম্যানিয়া রোগে আক্রান্ত হওয়ার আগে বাঙালি ছিল আড্ডাবাজ জাতি। পাড়ার রকে, গলির মোড়ে, চায়ের দোকানে, বৈঠকখানায়, খেলার মাঠে— যেখানে পারত বসে যেত অফুরান আড্ডা। আর আড্ডার যা চরিত্র, হেন বিষয় নেই, যা না উঠে আসত!‌ মুজতবা আলি প্রবাসে গিয়ে বারবার হা–‌হুতাশ করেছেন বসন্ত কেবিনের আড্ডা নিয়ে। কায়রোয় গিয়েও খুঁজে নিয়েছিলেন আড্ডাখানা। বিশ্বজিৎ রায়ের ‘‌সচলতার গান’‌ সেই হারাতে–‌বসা আড্ডার কথা মনে পড়িয়ে দেবে। শান্তিনিকেতনী বিশ্বজিৎবাবু তাঁর বইটি পাঁচ পর্বে সচলতার গান শুনিয়েছেন— রাবীন্দ্রিক, ভাষা ও ভাষ্য, অভিমুখ ও মুখ, স্বরাজ এবং গ্রন্থ ও চরিত্র। রবিবাবুর প্রেমের গান, সাহেবদের বাংলাশিক্ষা, জীবনের যৌনতা, বিবেকানন্দ পড়ার উপায়, দীনেশচন্দ্র, বিপ্লবী যাদবপুর, সেলুলার ও সেলফি থেকে চোর–‌ডাকাত–‌পুলিশ, শঙ্কুর সন্ধানে তারাশঙ্করের গ্রামদর্শন— নানা বিষয় উঠে এসেছে। ‘‌মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধের ন্যায়’‌ একথা বলা সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথ যে মনেপ্রাণে চাইতেন, বাঙালি বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিটাও শিখুক, নানা তথ্য পেশ করে লেখক তা সপ্রমাণ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের নেশন ও সমাজ সম্পর্কে নানা প্রশ্ন তুলেছেন, বিশ্লেষণ করেছেন চমৎকারভাবে। একেবারে আড্ডার ভঙ্গিতেই বিষয়গুলোকে পেড়েছেন, বিষয়ান্তরে চলে গিয়েছেন, প্রবল তর্ক তুলেছেন। লেখকের বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে বিচরণই বলে দেয় তিনি খাঁটি আড্ডাবাজ। তাই নানা তত্ত্ব ও তথ্যের সমাবেশ ঘটালেও আড্ডার সুরটি নষ্ট হতে দেননি। খাঁটি আড্ডায় যেমন নির্ভেজাল আমোদ মেলে, বাড়ে জানার পরিধিও। এই লেখাগুলো সেই দুটি শর্তই পূরণ করবে। এটাই লেখকের মুনশিয়ানার পরিচয়। দু বছর ধরে নানা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত লেখাগুলিকে সূত্রধর একত্র করে পাঠকের হাতে তুলে দিল। প্রচ্ছদ থেকে ছাপা সবই ঝকঝকে। ■
সচলতার গান • বিশ্বজিৎ রায় • সূত্রধর • ২২৫ টাকা
সোহেলা ঘোষ‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top