‌শুভরঞ্জন দাশগুপ্ত:
মানবমন:‌ শিক্ষা, সমাজ–সংস্কৃতি • জগদিন্দ্র মণ্ডল •‌ এবং মুশায়েরা • ‌‌২‌৫০ টাকা

লেখক স্বনামধন্য মনোবিজ্ঞানী, যদিও তাঁর অক্লান্ত বিদ্যাচর্চা এবং জ্ঞান–‌অন্বেষণ মনোবিজ্ঞানের সীমিত পরিসর অতিক্রম করে অন্যান্য বিভিন্ন দিকে প্রসারিত হয়েছে। শিক্ষাতত্ত্ব বা pedagogy, ‌সাহিত্য, গান, সমাজবিজ্ঞান এবং দর্শনের প্রতি তাঁর সমান আগ্রহ। উপরন্তু, তিনি বারংবার চেষ্টা করেছেন মনোবিজ্ঞানের সঙ্গে এই বিবিধ বিদ্যার্জনকে যুক্ত করতে। তাই, রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনার মনোবিজ্ঞান–‌নির্ভর আলোচনায় নিজস্ব নিয়মে প্রবেশ করে উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতা।
রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন শিশুরা প্রকৃতির ক্রোড়ে বসে বিদ্যার্জন করুক, বিকাশলাভ করুক। এই বিষয়ে তাঁর আন্তরিক আবেদনের ভাষাটি ছিল এইরকম:‌ ‘‌তাহাদিগকে মেঘ ও রৌদ্রের লীলাভূমি অবারিত আকাশের তলে খেলা করিতে দাও, তাহাদিগকে এই ভূমির আলিঙ্গন হইতে বঞ্চিত করিও না।’‌ ওয়ার্ডসওয়ার্থও প্রকৃতির মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন প্রকৃত আদর্শ শিক্ষককে।
লক্ষণীয়, বিদ্যাভ্যাসের পরিশ্রমকে ক্রীড়া বা লীলায় পরিণত করতে চেয়েছিলেন আরও একজন স্মরণীয় কবি–‌দার্শনিক ফ্রিডরিশ শিলার (Friedrich Schiller)‌। S‌pielpaum ‌বা লীলাপরিসরের ওপর যথাযোগ্য গুরুত্ব দিয়ে শিলার, ওয়ার্ডসওয়ার্থ বা রবীন্দ্রনাথ এক আনন্দঘন শিক্ষার ঐতিহ্য ও পরম্পরা নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন।
ঠিক এইখানেই অনায়াসে প্রবেশ করেন কার্ল মার্কস, যিনি ছিলেন লীলাময় জীবনের অভ্রান্ত রূপকার। মার্কস সেই বিযুক্তিহীন মানবের প্রতীক্ষায় ছিলেন, যে সকালে ছবি আঁকবে, দুপুরে মাছ ধরবে এবং রাত্রে গান শুনবে। আমাদের সময়ের প্রখ্যাত দার্শনিক হার্বাট মারকুসেও (Herbert Marcuse) ‌একই উদ্দীপক মন্ত্র উচ্চারণ করেছেন। মার্কুসের মতো জগদিন্দ্র মণ্ডল তাঁর নিবন্ধগুলিতে, প্রায় প্রতিটি পৃষ্ঠায়, মার্কস ও ফ্রয়েডকে একাত্ম করতে চেয়েছেন। একদিকে dialectical materialism‌ বা দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ ও অন্যদিকে ফ্রয়েড বর্ণিত ইদ, ইগো, সুপারইগোর ভেতর সম্পর্ক নিরূপণে তিনি সচেষ্ট। সত্যি বলতে, যে মেকি পণ্ডিতেরা মার্কস ও ফ্রয়েডের ভেতর শুধু অকাট্য বিরোধাভাস খুঁজতে তৎপর, তাঁরা এই আলোচ্য বইটি যেন অবশ্যই পাঠ করেন।
গ্রন্থটির প্রথম দিকনির্ণয়ী প্রবন্ধে (‌শিরোনাম— দর্শন, সাহিত্য, বিজ্ঞান ও অবচেতন মন)‌ লেখক সমান গুরুত্ব আরোপ করেছেন intuition ‌বা সংজ্ঞা এবং বস্তুনিষ্ঠ দা‌ন্দ্বি‌কতার ওপর। সংজ্ঞার ঘোষিত রাজ্য হল মানবমন এবং সেটিকে ঘিরে রয়েছে বহির্জীবনের ঘাত–‌প্রতিঘাত। এই দুইয়ের সমন্বয়েই গড়ে উঠেছে সামগ্রিক মানবজীবন এবং বিশ্বের স্পন্দন।
শিক্ষাদর্শ বিষয়ক আর একটি প্রণিধানযোগ্য নিবন্ধের শিরোনাম— ‘‌মানবমন:‌ রুশোর বিজ্ঞানী উদ্ভাবন ও আধুনিক শিক্ষাধারার অগ্রগতি’‌। এই রচনাটিতে রুশোর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘‌এমিলে’‌র ওপর নির্ভর করে লেখক রুশোপ্রণীত ভাবভাবনা ব্যাখ্যা করেছেন এবং এই ভাবনাকে সূত্রায়িত করেছেন গণতান্ত্রিক চেতনার সঙ্গে। লেখকের ভাষায়, ‘‌মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের মধ্যে শিক্ষা আবদ্ধ থাকবে, এটা কোনওভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। শিক্ষায় অভিজাততন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণ, শিক্ষায় ভাববাদ থেকে প্রকৃতিবাদে উত্তরণ— রুশোর অবদান।’‌
বস্তুত এই বইটিতে, একদিকে রুশো, মার্কস, ফ্রয়েড ও ইয়ুংকে রেখে এবং অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ ও গান্ধীকে স্থান দিয়ে তিনি একটি অনবদ্য সংলাপ নির্মাণ করেছেন প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের ভেতর। রবীন্দ্রনাথের ‘‌জীবনদেবতা’‌, গান্ধীজির ‘‌জীবননিয়ন্তা’‌ এবং বিবেকানন্দের উক্তি— ‘‌আমার হৃদয় খুব বেড়ে গেছে। আমি অন্যের ব্যথা বোধ করতে শিখেছি’‌— এমন একটি শিক্ষাদর্শের উন্মোচন করে, যার সঙ্গে রুশোর চিন্তাভাবনার নিবিড় সাযুজ্য রয়েছে।
এই বইটির একটি বিশেষ সম্পদ এর সহজ, সাবলীল ভাষা। নিগূঢ় তত্ত্ব, জটিল চিন্তা, সূক্ষ্ম ভেদাভেদ নিয়ে আলোচনা করার সময়েও তিনি ভাষাকে রেখেছেন স্বচ্ছ ও স্বতশ্চল। এমনকি কান্ট, ফয়েরবাখ ‌ও হেগেলের দর্শনের আলোচনার ক্ষেত্রেও এই সহজতা অটুট থাকে। পুরাকালের দুই গ্রিক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস ‌ও হেরাকলিটাস–‌এর তুলনীয় মূল্যায়নের সময়েও এই ‌স্বচ্ছতা‌ প্রশংসার যোগ্য।
শেষ কথা। মাদার টেরিজাকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি ধর্মান্তকরণে নিযুক্ত কি না। উত্তরে সন্ত বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, আমি ‌ধর্মান্তকরণে বিশ্বাসী। আমি চাই হিন্দুরা আরও ভাল হিন্দু হোক, মুসলমানেরা আরও ভাল মুসলমান, খ্রিস্টানেরা আরও ভাল খ্রিস্টান।’‌ আসলে এই উজ্জ্বল উক্তিটি করেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। আদ্যন্ত সেকুলার টেরিজা এই উক্তিটি নিয়েছিলেন আদ্যন্ত সেকুলার বিবেকানন্দ থেকে। লেখক এই হৃদয়ী–‌গ্রহণ সম্পর্কে আমাদের সচেতন করে দিয়েছেন।‌‌‌‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top