ভোলানাথ ঘড়ই

দুনিয়ার ধ্যান–ধারণাকে যিনি উল্টে দিয়ে গেলেন, বলা ভাল সোজা করে দিয়ে গেলেন, তিনি তো আকাশ থেকে পড়েননি। এই পৃথিবীতে, প্রচলিত জল–হাওয়াতে জন্মেই বড় হয়েছিলেন, প্রচলিত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েই। অর্থাৎ নিজেকে, নিজের শিক্ষাকে প্রতিনিয়ত বদলেছেন, গড়েছেন অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে। কার্ল মার্কসও তাই করেছেন। তরুণ মার্কস নিজেকে ভেঙে ভেঙে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী মার্কসে টেনে নিয়ে গেছেন। তাঁর জীবনের এই ওঠাপড়ার অমোঘ সাক্ষ্য বহন করে তাঁর তরুণ বয়সে লেখা কবিতাগুলি। পেশায় চিকিৎসক সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায় বেশ দক্ষতার সঙ্গেই অনুবাদ করেছেন কার্ল মার্কসের কবিতা। মূল জার্মান কবিতা থেকে ভায়া ইংরেজি ছাড়া বঙ্গানুবাদ কঠিন। ভাষা ও ভাব অক্ষুণ্ণ রেখেই তাঁর ছন্দোবদ্ধ অনুবাদ প্রশংসনীয়।
‘‌ডেকে আনো কিছু রাতপরীদের আলো/‌দেবদূত বড় জীর্ণ অসহায়/‌গেঁয়ো ভূত ওই লোকটা গ্যাব্রিয়েল/‌উৎসব এসে এইখানে থেমে যায়।’‌ অথবা ‘‌আমরা যখন দেবতার পুজো করি/‌একঘেয়ে সুরে বার বার স্তব গান/‌প্রার্থনা শুধু মহিমান্বিত করে/‌যন্ত্রণামুখে পড়ে থাকে সন্তান।’‌
লেখকের মতো পাঠকও এই কবিতাগুলি পড়ে একই সঙ্গে ‘‌ভাববাদী, ঈশ্বরবাদী, বস্তুবাদী, সাম্যবাদী মার্কসকে’‌ খুঁজে পেতে পারেন। কবিতাগুলি পড়ে যাঁরা উল্লাস করে উঠবেন, এই তো, মার্কসের ভেতরেও ভাববাদী বীজ লুকিয়ে, তাঁরা ‘‌অন্ধের হস্তীদর্শন’‌ করবেন। 
ইউনিভার্সিটি অফ বন–এ আইন বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ইচ্ছে ছিল সাহিত্য ও দর্শন নিয়ে পড়া, কিন্তু তাঁর বাবা মনে করতেন কার্ল মার্কস স্কলার হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারবে না। তাই বার্লিনের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে দেন। সে–সময় মার্কস জীবন নিয়ে কবিতা ও প্রবন্ধ লিখতেন। আর তাঁর লেখার ভাষা ছিল বাবার কাছ থেকে পাওয়া ধর্মতাত্ত্বিক তথা অতিবর্তী ঈশ্বরবাদের ভাষা। কিন্তু সেই ভাষায়, কবিতাতেও ছিল বস্তুবাদের বীজ। 
 বিশ্ববিদ্যালয়েই তরুণ হেগেলিয়ানদের নাস্তিকতাবাদ গ্রহণ করেন মার্কস। হেগেলের দর্শনকে আঁকড়ে ধরার পরও মার্কস কিন্তু স্বকীয় চিন্তার কথা প্রকাশ করছেন তাঁর কবিতায়। লেখকের অনুবাদে, ‘ক্ষমা করো আমার বিদ্রুপ/‌ভুলে যাও গানের কথায় অন্ধকার ইঙ্গিত/‌আমরা হেগেলের তত্ত্বে ডুবে আছি/ তবু আমরা বদলে নেব/‌ তার নান্দনিক অভিলাষ।’‌ (‌হেগেলের উদ্দেশে)‌‌।
সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়ের ‘‌কার্ল মার্কস এর কবিতা’‌ বইটি থেকে কবিতার নন্দনতত্ত্ব নিয়ে যেমন রসদ মিলবে, প্রেমিক মার্কস, কবি মার্কসকে যেমন পাওয়া যাবে তেমনি চাইলেও মস্তিষ্কে এসে বাসা বাঁধবে মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব। কারণ আপামর মানুষের চোখে মার্কস বললেই ভেসে ওঠে কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো, থিসিস অফ ফায়ারবাথ, ডাস ক্যাপিট্যাল। এই দ্বন্দ্বের খোলস ভাঙার পথও রয়েছে বইটিতে। কবিতাগুলি পড়ার আগেই পড়ে নেওয়া উচিত বইটির শেষে সংযোজিত বিপ্লব মাজির অনুকথন। প্রবন্ধটি সমৃদ্ধ করবে পাঠককে।‌ ■
কার্ল মার্কস এর কবিতা • অনুবাদ সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায় 
এবং মুশায়েরা • ২০০ টাকা 

জনপ্রিয়

Back To Top