সুদীপ বসু: কলকাতা একদিন কল্লোলিনী? • সঞ্জয় ঘোষ • অভিযান পাবলিশার্স • ১৭৫ টাকালাল নীল হলুদ কলকাতা • সঞ্জয় ঘোষ • অভিযান পাবলিশার্স • ২২৫ টাকা    

সাধারণ মানুষ, প্রতিনিয়ত, একটা শহরের খাঁচার ভেতর বেঁচে থাকতে থাকতে তার বাহ্যিক রূপে আচ্ছন্ন হয়ে যায়। শহরের রাস্তা, তার রেলপথ, ফেরিঘাট, বাড়িঘর, দোকানপাট, জলাশয় ও উদ্যান, কয়েদখানা, হাসপাতাল ও স্কুলবাড়ি, শহরের পথে পথে রৌদ্রের চিৎকার ও বৃষ্টির গন্ধের হাহাকারকে সে শহরের মুখ বলে মেনে নেয়। তার সঙ্গে জুড়ে যায় তার অতি ব্যক্তিগত অনুভূতি— তার বড় হয়ে উঠবার, বেঁচে থাকবার, ভালবাসবার, আঘাত পাওয়ার ও স্বপ্ন দেখবার স্মৃতি। কিন্তু শিল্পীমন কখনও সেই বাইরের শহরের ওপর রূপ ছুঁয়ে থেকে তৃপ্তি পায় না, সে খুঁড়ে খুঁড়ে চলে, সে খুঁজে বেড়ায় শহরের ভেতরে এক সমান্তরাল বেঁচে থাকাকে। তার নিভৃত আত্মাকে। তাই প্রতি পলকে সে নতু্নতর আবিষ্কার করে চলে। সে নিছক রূপের কাঙাল নয়, সে কবি, সে তদন্তকারী।
এ সময়ের বিশিষ্ট কবি, গদ্যকার ও চিত্রশিল্পী সঞ্জয় ঘোষ এই আশ্চর্য নিরীক্ষার ভেতর দিয়ে গেছেন কলকাতাকে কেন্দ্র করে লেখা তাঁর  দুটি উপন্যাসে— ‘কলকাতা একদিন কল্লোলিনী?’ এবং ‘লাল নীল হলুদ কলকাতা’য়। দুটি আখ্যানের মর্মমূলে রয়েছে কলকাতা, কখনও নায়কোচিত দর্পে, কখনও বা পরিপ্রেক্ষিতের বিষাদে। তার সঙ্গে শিল্পীর নিপুণ দক্ষতায় তিনি যোগ করেছেন আর একটি প্যারামিটার— সময় আর সমগ্র পরিসর জুড়ে তিনি খেলে গেছেন এক আশ্চর্য খেলা। 
‘কলকাতা একদিন কল্লোলিনী?’ অভিযান পাবলিশার্স  থেকে প্রকাশিত হয়েছিল জানুয়ারি, ২০১৫–তে। এটি ঘোষিত ভাবেই একটি তথ্যনির্ভর উপন্যাস, বা ডকুনভেল। আদি, মধ্য ও হাল আমলের প্রায় সমধর্মী বিভিন্ন ঘটনা ঘটে চলে এই উপন্যাসে, আমরা ঘোরের ভেতর লক্ষ্য করি কলকাতার তিনশো বছরের স্প্যান জুড়ে ঘটনাগুলি কেমন অদ্ভুতভাবে একে অপরের সঙ্গে কেমন শিরায় শোণিতে মিশে যায়। সঞ্জয় ঘোষের গদ্যের বুনন অসামান্য। তাই কলকাতার নেড়ানগ্ন ইতিহাস নয়, ইতিহাসের অন্তর্গত জাদুবাস্তবতার জার্নাল হয়ে ওঠে এই উপন্যাস। ‘কলকাতা একদিন কল্লোলিনী?’র চরিত্ররা কলকাতার রাস্তায় সময় জুড়ে হাঁটে। মুক্তিনাথ ও সৌর একদিন বিকেলবেলায় রাজা নবকৃষ্ণ দেবের বাড়িতে মুখোমুখি হয় নিধুবাবুর। নিধুবাবু আক্ষেপ করে বলেন, ‘কবিগানের ওই চাপান–উতোর একদম পছন্দ ছিল না আমার...কথার তোড়ে গান ভেসে যাবে কেন?’ আবার সেই দুই চরিত্রই পরদিন বিকেলে যায় শিশিরমঞ্চে ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র কর্ণধার গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুদিবসের অনুষ্ঠানে। রাজা নবকৃষ্ণের বাড়ি, বেহালার চৌধুরিবাড়ির পুজো, রামমোহন রায়ের বাড়িতে ‘ক্যাটালনি অব ইস্ট’ নিকির নৃত্য, শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গোৎসব পেরিয়ে এই আখ্যান চারিয়ে যায় সিমলের চন্ডুর ঠেকে আর বাগবাজারের পক্ষীদের গাঁজার আখড়ায়। তা পেরিয়ে শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ে অতিবামদের মিটিংয়ে। টিভিতে সিপাহি বিদ্রোহের খবরের মাঝখানে রিপিট হয় ‘জাপানি তেল’–এর বিজ্ঞাপনের।
২০১৬–তে প্রকাশিত ‘লাল নীল হলুদ কলকাতা’ আরেকটা অন্য ধারার উপন্যাস। শব্দ আর গঠনশৈলী নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা এর পরতে পরতে। এই রম্য–উপন্যাসটির পরিপ্রেক্ষিত জুড়ে রয়েছে কলকাতার চিত্রকলার ইতিবৃত্ত আর তার গতিপ্রকৃতি। সময় পালটে পালটে যাচ্ছে। আদি মধ্য ও আধুনিক কলকাতার শিরা বেয়ে বেয়ে এগিয়ে চলেছে আখ্যান। ‘শহরের গোপন কান্নাটা, চিত্রশিল্পীর মতোই, লুকিয়ে থাকে তার ছবির রঙ–রেখায়, টেক্সচারে...’ উপন্যাসের গোড়াতেই ঘোষিত হয়েছে এই অমোঘ বাণী। চিত্রশিল্পীর লড়াই চিরকালীন। সম্ভাবনাময় তরুণ শিল্পী বিদ্যুৎ ও তার প্রেমিকা অদিতি কীভাবে আর্টের দালাল, লোভী ও হিংস্র গণপতি মজুমদারের পাল্লায় পড়ে, কীভাবে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় তাদের বিশ্বাস ও জীবন, এই কাহিনীর সমান্তরালভাবে আরেকটি আখ্যানও বিধৃত হয় এই উপন্যাসে, কালীঘাটের পটুয়া নিবারণ, কালীচরণদের গল্প, তাদের প্রতিমুহূর্তের যুদ্ধ, সম্পূর্ণ অন্য একটি পরিসরে, অন্য একটি সময়ে। সবচেয়ে মজার কথা হল আগের আখ্যানের একটি মৃত চরিত্র, কখনও আদিগঙ্গা হয়ে, কখনও তুলসীগাছ হয়ে, কখনও ব্রাশ, কখনও বা জলচৌকি হয়ে ঢুকে পড়ছে দ্বিতীয় আখ্যানটিতে। একই সঙ্গে থ্রিলিং ও বেদনাবিধুর, তথ্যনিষ্ঠ ও ফিকশনাল ‘লাল নীল হলুদ কলকাতা’ বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। 
দুটি বইয়েরই চমকপ্রদ প্রচ্ছদ এঁকেছেন পার্থপ্রতিম দাস।‌ ■  

জনপ্রিয়

Back To Top