‌অ্যামাজন এসেছে বাংলা প্রকাশনায়, তাদের অধীনস্থ প্রকাশন সংস্থা ওয়েস্টল্যান্ডের মাধ্যমে। প্রকাশ করেছে শীর্ষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘‌তেরো নদীর পারে’‌। আন্তর্জাতিক এই সংস্থার যে লেখকের হাত ধরে প্রবেশ করল বাংলা বইয়ের বাজারে, সেই শীর্ষ বন্দ্যোপাধ্যায় জানালেন অনেক অজানা কথা। 
❏‌ বাংলা বই প্রকাশনায় এল অ্যামাজন। তাদের প্রথম প্রকাশিত বই, আপনার লেখা উপন্যাস ‘‌তেরো নদীর পারে’‌। গর্ব হচ্ছে খুব?‌ 
শীর্ষ:‌
গর্ববোধ অবশ্যই আছে। তার প্রথম কারণ, অ্যামাজন ভারতের পাঁচটি আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে কাজ করেছে। বাংলা, মারাঠি, তামিল, তেলেগু ও ওড়িয়া। তার থেকে ওরা বাংলাকেই বেছে নিল ওদের প্রথম মৌলিক সাহিত্য প্রকাশনার ভাষা হিসেবে। এটা বাংলার পক্ষে, এবং বাংলার একজন লেখক হিসেবে নিশ্চয়ই গর্বের। এবং তারা আমার একটা উপন্যাসকে বেছে নিল। এটা গর্বের একটা দিক। কিন্তু অন্য দিকটা হল, অ্যামাজন বাংলা ভাষার প্রেমে পড়ে, বাংলা সাহিত্যের প্রেমে পড়ে, প্রকাশনা ব্যবসায় আসছে না। যে কোনও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মতো তারাও অর্থকরী সম্ভাবনাটাই আগে দেখছে। তারা দেখছে, যে কোথায়, কোন ভাষার বইয়ের বিক্রি বেশি। হয় তারা আগে থেকে বাজার যাচাই করে নিয়েছে। অথবা, এই আমার বইয়ের মতো আরও কয়েকটি বই প্রকাশ করে তারা বাজার যাচাই করতে চাইছে। পরিস্থিতি অনুকূল বুঝলেই হয়ত অ্যামাজন আরও কাজ করবে। কাজেই তারা বাংলা বইয়ের বাজারে থেকে যেতে এসেছে, এ কথাটা এখনই বলার সময় আসেনি। 
❏‌ বলতে চাইছেন বাংলা বইয়ের বিক্রি দেশের অন্য যে কোনও আঞ্চলিক ভাষার বইয়ের বিক্রির চেয়ে বেশি?‌
শীর্ষ:‌
না, সেই পরিসংখ্যান নিয়ে সন্দেহ আছে। কিন্তু, হ্যাঁ, বাংলায় সাহিত্য নিয়ে যতটা চর্চা হয়, সেটা অন্য কোনও ভাষায় হয় না বলেই আমার মনে হয়। 
❏‌ এই উপন্যাসের বিষয়বস্তু বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে কি প্রকাশনা সংস্থার কথা মাথায় ছিল?‌ নাকি সেটা পরে এসেছে।
শীর্ষ:‌
উপন্যাসটা আগে লেখা হয়েছে। আমার মনে হয়, কোনও লেখকই উপন্যাস কে ছাপবে সেটা ভেবে লেখেন না। প্রথমে লেখেন, তারপর প্রকাশক খোঁজেন। আমার ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে। ওরা আমায় খুঁজে নিয়েছে। আর এসব ক্ষেত্রে অন্য প্রকাশক, অনুবাদক, বা লেখকদের মতামতের একটা গুরুত্ব থাকে। এভাবেই লেখক নির্বাচন করা হয়। 
❏‌ এবার বইয়ের বাজার নিয়ে প্রশ্ন করি। অ্যামাজনের প্রকাশ করা বই তো কোনও দোকানে পাওয়া যাবে না?‌
শীর্ষ:‌
না যাবে। অ্যামাজন কলেজ স্ট্রিটের বেশ কিছু বই বিক্রেতা ও পরিবেশকের সঙ্গে চুক্তি করেছে। তারা অ্যামাজনের বই দোকানে বিক্রি করবে। আর অনলাইনে তো অবশ্যই পাওয়া যাবে।
❏‌ শুধু হার্ড কভার আর পেপার ব্যাক, নাকি বাংলা বইয়ের কিন্ডল এডিশনও পাওয়া যাবে?‌ 
শীর্ষ:‌
না, এখানে একটা সমস্যা আছে। কিন্ডল এখনও বাংলা ফন্ট সাপোর্ট করে না। তাই কিন্ডলে এখনই প্রকাশ করা হবে না। আমি যেহেতু বইটির প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, তাই জানি, অ্যামাজনের সমস্ত বইয়ের প্রচ্ছদে যেমন কিন্ডল এডিশনের কথা লেখা থাকে, আমার বইয়ে সেটা বাদ গেছে।
❏‌ আপনার বই বইমেলার হাতে গোনা কয়েকদিন আগে প্রকাশিত হল। বইমেলায় প্রকাশ করার তো একটা চল আছে। মানে বইমেলা লেখক–প্রকাশকদের কাছে দুর্গাপুজোর মতো। সেই মঞ্চ ছেড়ে, এখনই কেন বই প্রকাশ করলেন?‌ 
শীর্ষ:‌
বইমেলায় বই প্রকাশ তো এই কদিনের প্রথা। আগে বই প্রকাশ করা হত, পুজোর সময় আর পয়লা বৈশাখে। এই দুটো ছিল বাঙালির বই প্রকাশের সময়। পয়লা বৈশাখে প্রচুর বই প্রকাশিত হত। সেইটা এখন বইমেলাতে সরে এসেছে। আর এখন একটা জিনিস হয়েছে, প্রিন্ট অন ডিমান্ড। পিওডি মেশিন আছে। সেই মেশিনে যে কটি বই দরকার, কয়েক রাতের মধ্যে তৈরি করে পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়া যাচ্ছে। বই প্রকাশনার সমীকরণটাই বদলে গেছে। অনেক সময়েই দেখা যায়, লেখকরা দাবি করছেন, ‘‌প্রথম সংস্করণ শেষ, দ্বিতীয় সংস্করণ শেষ!‌’। কিন্তু এটা দেখতে হবে, প্রথম সংস্করণ বলতে তাঁরা হয়ত দু–তিনশো কপির কথা বলছেন। কিন্তু বড় প্রকাশনা সংস্থা সংস্করণ বলতে কমপক্ষে একহাজার কপির নিচে বোঝে না। এই ফ্যাক্টরগুলো থেকেই অঙ্কটা স্পষ্ট, কপি কম হলেও নানা ধরনের বই বেশি পরিমাণ ছাপা হচ্ছে। ফলে শুধু বইমেলায় নয়, সেগুলি সারা বছরই প্রকাশিত হচ্ছে। এখন আর বইপ্রকাশের নির্দিষ্ট দিনক্ষণ নেই। 
❏‌ আপনার উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে সন্ত্রাসবাদের প্রসঙ্গ, কেন?‌ হঠাৎ করে এই বিষয়টা নিয়ে লিখলেন কেন?‌
শীর্ষ:‌‌
সন্ত্রাসবাদ অনেক বড় একটা ইস্যু। আমার এই উপন্যাসের ক্ষেত্রে সেটা একটা প্রেক্ষাপট হিসেবে কাজ করেছে। সন্ত্রাসবাদে যাঁরা সরাসরি প্রভাবিত, তাঁরা ছাড়াও অনেকেই এর আওতায় চলে আসেন। আফগানিস্তান, ইরাক, বা সিরিয়ার মতো একাধিক দেশ সন্ত্রাসবাদের কারণে বিপর্যস্ত। নানা স্তরের মানুষ নানা ভাবে প্রভাবিত। তাঁরা অনেকেই সাধারণ মানুষ। সন্ত্রাসের সঙ্গে তাঁদের কোনও যোগ নেই। তবু তাঁদের জীবন আমূল পাল্টে গেছে। আমার উপন্যাসে সেই বিষয়টাই আছে। সন্ত্রাসবাদ এখানে প্রেক্ষাপট মাত্র।  
❏‌ আচ্ছা, আবার প্রকাশনার কথা ফিরি। আপনার কি মনে হয়, বিদেশি প্রকাশনা সংস্থা, কলকাতার প্রকাশনা সংস্থাগুলির চেয়ে বেশি যত্নবান?‌ 
শীর্ষ:‌
না, এই কথাটা বলা যায় না। কারণ, কাগজের দাম, বই তৈরি করার খরচ যেভাবে বাড়ছে, তার পরেও বাংলা প্রকাশনা সংস্থাগুলো যেভাবে বই প্রকাশ করে চলেছে, সেটাকে তো বাহবা দিতেই হবে। বাংলার প্রকাশকরা এখনও যথেষ্ট যত্ন নিয়ে বই তৈরি করার চেষ্টা করেন। বিদেশি প্রকাশকদের ক্ষেত্রে যেটা শেখার যে তাঁরা অনেক বেশি নিয়মনিষ্ঠ, পেশাদার। তাঁদের বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি অনেক শক্তিশালী। সেটাই শিখতে হবে বাঙালি প্রকাশকদের। আর শিখতে পারলে লাভ বাড়বে অনেক। 
❏‌ ‘‌তেরো নদীর পারে’ প্রকাশিত হয়েছে বেশ কয়েকদিন হল, কোনও রিভিউ পেয়েছেন?‌
শীর্ষ:‌
পেয়েছি। কিন্তু যাঁরা জানিয়েছেন, তাঁরা সকলেই আমার বন্ধু। বইটা কিনে বাড়ি ফিরেই তাঁরা পড়ে ফেলেছেন এবং প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। সেগুলো শুভেচ্ছা হিসেবে ধরছি, সমালোচনা নয়। প্রকৃত সমালোচনা আসতে হয়ত আরও কয়েকদিন সময় লাগবে।‌

জনপ্রিয়

Back To Top