তাঁকে ভোট বিশেষজ্ঞ, পরিসংখ্যানবিদ বলা যায়। তবে তাঁর পরিচয় এখন অন্যরকম। তিনি এখন একটি রাজনৈতিক দলের নেতাও। এবিভিপি যেদিন গুন্ডামি করল জেএনইউয়ে, সেদিন সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন তিনি। তাঁকেও রেয়াদ করেনি দিল্লি পুলিশ। সেই যোগেন্দ্র যাদব কলকাতায় এসে কথা বললেন আজকাল ওয়েবডেস্কের প্রতিনিধি অপ্রমেয় দত্তগুপ্তের সঙ্গে।

 

 

 

❏‌‌ জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনি গিয়েছিলেন। সেদিন আপনি গিয়ে কী দেখলেন?

• যা দেখেছি তা খুব পরিষ্কার ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ১০০ জন মতো গুন্ডা ঢুকে ভাঙচুর করছে। ছাত্রছাত্রীদের মারছিল, অধ্যাপকদের মারছিল। আর পুলিশ সেটা আটকানোর পরিবর্তে তাদের নিরাপত্তা দিচ্ছিল। এটাও দেখেছি কিছু গুন্ডা বাইরে দাঁড়িয়ে পুলিশকে নিরাপত্তা দিচ্ছিল। যাতে কোনও সংবাদমাধ্যম ভেতরে যেতে না পারে। জানি পুলিশের প্রকৃত ভূমিকা কখনই সামনে না আসে। সেদিন দেখলাম। জীবনে আমি প্রথমবার কোনও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পুলিশের আশ্রিত গুন্ডাদের হামলা দেখেছি। আমিও হামলার শিকার হয়েছি। 

 

❏‌‌ এরপরও আপনি অহিংস আন্দোলনের কথা বলবেন?‌

• হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। কারণ মহাত্মা গান্ধী বারবার বলেছেন, অহিংসা দুর্বলতার লক্ষণ নয়। অহিংস হিম্মতের লক্ষণ। অহিংসা শুধু নৈতিকতার পরিচয় দেয় না, বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়। কোনও শাসন যদি হিংসার মাধ্যমে আঘাত নামিয়ে আনে, তার জবাব হিংসা দিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। কারণ তাতে প্রতিবাদীর সাহস শেষ হয়ে যায়। অহিংসার মাধ্যমেই সাহস মেলে। 


❏‌‌ কিন্তু আপনি তো দেখতে পেলেন যারা হামলা করল তারা ক্লিনচিট পেল। আর যাঁরা আক্রান্ত হল তাঁদের দোষী বলা হল। এটাকে কি বলবেন?‌ 

• এটার মানে হল হামলার সত্যতা এবং পুলিশের জড়িত থাকার ব্যপারটা এখন দেশের মানুষের সামনে চলে এসেছে। আগে এই বিষয়টি লুকানো ছিল। কিন্তু ৫ জানুয়ারির পর এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, ওই হামলা পুলিশের আশ্রয়েই সংগঠিত করা হয়েছিল। পুলিশ বলছে এটা দু’‌পক্ষের লড়াই। তাহলে পুলিশ কেন দ্বিতীয় পক্ষের সম্পর্কে কিছু বলতে পারছে না। আসলে পুলিশ বিজেপি’‌র সশস্ত্র বাহিনী হিসাবে কাজ করেছে। না হলে, একপক্ষের নাম ‌বলতে পারছে, আর দ্বিতীয় পক্ষের নাম বলতে পারছে না কেন?‌ 


❏‌‌ নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন আর এনআরসি নিয়ে গোটা দেশ জ্বলছে। সেই নিয়ে কংগ্রেসকে রাস্তায় নেমেও বড় আন্দোলন করতে দেখা যায়নি। বিরোধী দল হিসেবে নিজের জমি ফিরিয়ে নেওয়ার এই সুযোগটা কেন হারাল কংগ্রেস?‌ 

• হ্যাঁ, রাস্তায় নেমে যে লড়াই করা উচিত ছিল কংগ্রেসের। সেটা তারা সততার সঙ্গে করেনি। কিছু কিছু জায়গায় আওয়াজ তুলেছে। কিন্তু যে সাহসের সঙ্গে, ধারাবাহিকতা নিয়ে লড়াই করা উচিত ছিল তা কংগ্রেস করেনি। এমনকী বেশিরভাগ ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলি সেই লড়াই রাস্তায় নেমে করেনি। কারণ তাদের নজরে ছিল হিন্দু ভোটব্যাঙ্ক। আন্দোলন করতে গিয়ে সেটা যাতে সেটা নষ্ট না হয়, সেই সমীকরণ মাথায় রেখেছে সবাই। তাই আন্দোলন তৈরি হয়েছে স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে। মানুষের দ্বারা। কোনও রাজনৈতিক দলের দ্বারা তৈরি হয়নি। 

 

❏‌‌ দেশের বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির এই মুহূর্তে এজেন্ডা, ইস্যু এক। তারপরও জাতীয় রাজনীতিতে তাঁরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারছে না কেন?‌

• কারণ দেশের বেশিরভাগ আঞ্চলিক দলের কাছে দেশের ভবিষ্যতের কোনও নকশা নেই। বিকল্প নীতির রূপরেখা তারা তৈরি করেনি। এই কারণে তাদের দূরদৃষ্টি সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। আপনি দেখুন না, দেশের একটা রাজ্যকে শেষ করে দেওয়া হল। জম্মু–কাশ্মীর। যা নিয়ে আঞ্চলিক দলগুলি কোনও কিছু করেনি। চুপচাপ দেখেছে। আঞ্চলিক দলগুলির মধ্যে একটা বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গির অভাব রয়েছে। তাঁদের লক্ষ্য হল রাজ্যের ক্ষমতায় টিকে থাকা। এর বেশি তাঁরা দেখে না। কিন্তু যুক্ত রাষ্ট্রীয় কাঠামো তো ৩৭০ ধারা বিলোপের মতো কর্মকাণ্ডে ভেঙে পড়বে। সেটা নিয়ে কেউ কিছু বলল না?‌

 

❏‌‌ এই সিএএ–এনআরসি নিয়ে আপনার মতামত কি?‌ মানে, এই আইনগুলি কতটা কী বদলে ভারতের?‌

• সিএএ ভারতের সংসদে পাশ হওয়া সব থেকে ভয়ানক আইন। কারণ এটা সংবিধানে যে মৌলিক অধিকার আছে তার বিরুদ্ধে যায়। ধারা ১৪, ১৫, ১৯–কে লঙ্ঘন করছে এই আইন। কারণ ধর্মের ভিত্তিতে বিভেদের এখানে স্থান নেই। তাই এটা আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনার বিরুদ্ধেও। আমাদের সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রের কথা বলে। নাগরিকত্বকে ধর্মের সঙ্গে যুক্ত করা ধর্মনিরপেক্ষতার বিরোধী। দুই জাতির তত্ত্ব আমরা মানি না। এই যে আমরা এত বিরোধিতা করি জিন্না নীতির। এই আইন তো মহম্মদ আলি জিন্নার কথাকে স্বীকার করে। তাহলে এতদিন সংসদে সাভারকরের ছবি তো ছিলই, এবার জিন্নার ছবিও লাগিয়ে নেওয়া উচিত।

 

❏‌‌ এক সাক্ষাৎকারে আপনি বলেছিলেন, আম আদমি পার্টি যিনি করেন তিনি সৎসঙ্গ করেন। যদিও আপনি এখন আম আদমি পার্টিতে নেই। কিন্তু সামনেই তো দিল্লির নির্বাচন। কি মনে হয়, সেখানে কি হবে?‌ 

• আমি আগে নির্বাচনের ভবিষ্যদ্বানী করতাম এখন করি না। এখন ভবিষ্যৎ তৈরি করার কাজ করি। বিজেপি দিল্লিতে লোকসভা নির্বাচনে ভাল ফল করেছে। তার মানে তারা বিধানসভাতেও জিতে যাবে এমন পরিস্থিতি দেখতে পাচ্ছি না। মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, ঝাড়খণ্ডে এমন পরিস্থিতি হয়নি। ফলে বিজেপি’‌র কাছে দিল্লি বিধানসভা নির্বাচন বড় চ্যালেঞ্জের। 


❏‌‌ আপনি আগে বলেছিলেন, আঞ্চলিক দল হোক বা জাতীয় দল প্রত্যেকেরই একটা মুখ আছে। ওয়ান ম্যান আর্মিও বলা যেতে পারে। এখন বিজেপি’‌র মুখ নরেন্দ্র মোদি। একটা মুখকে সামনে রেখেই এগোতে হয়। এভাবে একনায়কের রাজনীতিই এখনও ভারতের চালিকা শক্তি?

• হ্যাঁ, আমি এখনও মনে করি, আমাদের গণতন্ত্রে চেহারার রাজনীতিই শেষ কথা। আর টেলিভিশন আসার পরে তা আরও বেড়ে গিয়েছে। ফলে চেহারার একটা ব্যাপার তো আছেই। তবে জাতীয় রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদির যে চেহারার ক্যারিশমা ছিল, তাতে এখন প্রশ্নচিহ্ন লেগেছে। ২০১৯ সালের নির্বাচনেও তাঁর মুখ কাজে এসেছিল। অন্তত রাহুল গান্ধীর তুলনায় সেটা বেশি গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনে জয়লাভের পর যেভাবে কাজ করছেন তিনি, তাতে মানুষের মনে হচ্ছে, কোথাও একটা অহংকার কাজ করছে। এমনকী দেশের ক্ষেতমজুরদের সমস্যা, কর্মসংস্থান নিয়ে বিজেপি কিছু করছে না সেটাও মানুষ দেখতে পাচ্ছে। তাই মোদির মুখের ক্যারিশমা অনেকটাই কমেছে এ কথা বলা যায়।

 

❏‌ পশ্চিমবঙ্গে সিএএ–এনআরসি নিয়ে আন্দোলন চলছে আপনি দেখতে পাচ্ছেন। রাজনীতিতে এই আন্দোলনের প্রভাব কেমন পড়তে পারে বলে আপনার মনে হয়?‌

• এই আন্দোলন বিজেপি’‌র বিভাজনের রাজনীতির পর্দা ফাঁস করছে। গোটা দেশেই তা হচ্ছে। এর ফলে, প্রথমত, মুসলিম সম্প্রদায় বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত। তাঁরা বিজেপি’‌র সঙ্গে আগেও ছিল না। দ্বিতীয়ত, আদিবাসী সম্প্রদায় এবং যাঁদের নথি নেই তাঁরাও বিজেপি’‌র থেকে দূরে সরে যাবে। আর শিক্ষিত সমাজ বুঝতে পারছে এই আইন দেশের পক্ষে ভাল নয়। ফলে আমার মনে হয় এই পরিস্থিতিতে বিজেপি’‌র লোকসান হওয়া উচিত। কিন্তু বিজেপি চাইবে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ করতে। হিন্দু ভোটকে ধরে রাখতে। ২০২১ সালে বিজেপি’‌র পশ্চিমবঙ্গ দখল করার একটাই রাস্তা তা হল, হিন্দু–মুসলিম বিরোধ তৈরি করা। এমনকী হিন্দু–মুসলিম সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে তারা। আগামী দু’‌বছর পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে আমার মনে খুব চিন্তা রয়েছে। বিজেপি নির্বাচন জিততে যা খুশি করতে পারে। জরুরী অবস্থাও জারি করতে পারে। ‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top