আজকাল ওয়েবডেস্ক: ছোটবেলায় এক বন্ধুর কাছ থেকে শুনেছিলাম, তাঁর ঠাকুমা বিধবা হয়ে যাওয়ার পর অন্য রাজ্যে থাকা তাঁর বৃদ্ধ পুরনো প্রেমিকের সঙ্গে গিয়ে সহবাস করছেন। শুনে প্রথমে বেশ আঁতকে উঠেছিলাম। মনে হয়েছিলাম, ‘‌এরকম হয় নাকি!‌’‌ পরে বড় হতে হতে বুঝলাম, আসলে এই ঘটনা আঁতকে ওঠার পর ততটাও ভয়াবহ নয়। আঁতকে ওঠাটা রোগের উপসর্গমাত্র। রোগটি হল ‘‌সোশ্যাল ট্যাবু’। বাংলায় যাকে বলে, অন্যের ক্ষতি না হলেও কে কার জীবনে কী করবে না করবে তার ওপর সমাজের যে হস্তক্ষেপ, তাকেই ধ্রুব বলে ধরে নেওয়ার রোগ। আর এমনভাবেই কত মানুষ ভালবাসতে ভয় পেয়েছে। যৌন সম্পর্কের মতো সুন্দর সম্পর্কে যেতে ভয় পেয়েছে। কিন্তু এসবে কার যে ক্ষতি হয়, সেটা বুঝতেই জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে মানুষের।
সহবাস নিয়ে অনেক জলঘোলার পর ২০১৫ সালে দেশের সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল, বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ না হয়েও যদি দু’‌টো মানুষ চায়, তবে তারা একসঙ্গে থাকতে পারে। তবে একথা তো সবাই জানে, আইন ফাইন নিয়ে মাথা ঘামায় না সাধারণ মানুষ। নিজের নিজের মতো আইন তৈরি করে সেটাকেই সমাজে জোরদার করতে ‘‌মরাল পলিসিং’ করতে নেমে পড়ে কত কত মানুষ। কিন্তু ২০১২ সালে পুনেতে একটি সমীক্ষা করেছিলেন মাধব ডামলে। একজন প্রাক্তন প্রকাশক। ৪০০ প্রবীণ নাগরিকের সঙ্গে কথা বলেছিলেন তিনি। যাঁরা একা থাকেন। জানতে পেরেছিলেন, তাঁদের ৭০ শতাংশ চান, বাকি জীবন কারওর সঙ্গে কাটাতে। একা একা তাঁদের ভাল লাগে না। আর তাঁদের মতে, আবার করে বিয়ে করা মানে অনেক সমস্যা। সহবাসই ভাল। একসঙ্গে থাকার উদ্দেশ্যটাই আসল। এবারে আসা যাক, এরকম কয়েকজন মানুষের কথা, যাঁরা ওই ‘‌সোশ্যাল ট্যাবু’–কে ভেঙে নিজেদের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়েছেন, এবং সুখে আছেন। 
আশাওয়ারি কুলকারনি, বয়স ৬৮। দিনের সবথেকে পছন্দের সময় হল যখন গ্রিন টি–তে চুমুক দিতে দিতে তাঁর সঙ্গী অনিল ইয়ার্দির সঙ্গে গল্প করেন। ডিভোর্সের পর বহু বছর একা ছিলেন তিনি। সন্ধ্যে হতেই তাঁর মধ্যে ভয় তৈরি হত, শরীর ভাল থাকবে তো?‌ কিছু হবে না তো?‌ কেউ যদি হামলা করে এসে?‌ এরপরেই তিনি মাধব ডামলের ‘‌হ্যাপি সিনিয়র ডেটিং এজেন্সি’–এর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আলাপ হয় ইয়ার্দির সঙ্গে। সিনেমা দেখতে শুরু করেন। নাটক দেখতে যেতেন একসঙ্গে। ১০ মাস পরে তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন, সহবাস করবেন। বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছিলেন। কিন্তু ইয়ার্দির মেয়ের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলার পর মেয়ে বুঝতে পেরেছিলেন যে আশাওয়ারি তাঁর বাবার যত্ন করবেন। এছাড়া পাড়া প্রতিবেশী একাধিকবার বিয়ের প্রসঙ্গ তোলেন। কিন্তু তাঁরা জানিয়ে দিয়েছেন, সেরকম কোনও পরিকল্পনা নেই। 
‘‌হ্যাপি সিনিয়র ডেটিং এজেন্সি’–এর মতো আরও অনেক সংস্থার সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, তাঁদের সংস্থায় মহিলাদের চাইতে অনেক বেশি সংখ্যক পুরুষ এসেছেন। মহিলাদের সংখ্যা অনেক কম। তাঁরা ভয় পায়। সেই সংস্থায় মহিলাদের জন্য টাকাপয়সার ছাড়ও মেলে। নাটুভাই প্যাটেল (‌৭১)‌ ও তাঁর স্ত্রী শীলা প্যাটেলের সংস্থা ‘‌অনুবন্ধ ফাউন্ডেশন’ তৈরি হয়েছিল ২০০১ সালের গুজরাট ভূমিকম্পের পর। যেখানে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের প্রাণ গিয়েছিল। তারপর অনেক মানুষ একা হয়ে পড়েন। কারওর স্বামী, কারওর স্ত্রী মারা গিয়েছিলেন সেবার। তাঁদের হাত ধরার জন্য সঙ্গী খুঁজে দেওয়ার লক্ষ্যেই তাঁরা এই সংস্থার শুরু করেন। তাঁরা জানালেন, সেই সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগে রয়েছেন প্রায় ১২ হাজার বৃদ্ধ। সেখানে মহিলাদের সংখ্যা এক হাজারও না। কথায় বলে না, একজন নারী তাঁর যৌবনে বাবা মায়ের অধীনে, প্রাপ্ত বয়সে স্বামীর ও বৃদ্ধা বয়সে ছেলেমেয়ের অধীনে। যা খুশি তাই করার সাহস করে উঠতে পারেন না এদেশের কত কত মহিলা। তাও বলব, অনেকেই সেই হাতকড়া খুলে বেরিয়ে এসেছেন। আর আজ তাই তাঁদের গল্পই বলতে বসেছি। কর্মসূত্রে ছেলেমেয়ে বাইরে থাকে বা একটি দূরে থাকে। বৃদ্ধ বাবা বা বৃদ্ধা মা একা থাকেন। কথা বলার কেউ নেই। শরীর খারাপ হলে কেউ নেই। যদি যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হতে ইচ্ছে হয়, তাও সম্ভব হয় না। কিন্তু ছেলেমেয়েরা একটা বয়সে পৌঁছে যাওয়ার পর বাবা মায়েদের এমন অধিকার ফলাতে শুরু করে, যেখানে দাঁিড়য়ে দমবন্ধ লাগা ছাড়া আর কিছুই হয় না। ডামলের এই সংস্থায় নিযুক্ত করা হয়েছে যাদব কাদমকে। যে ছেলেমেয়েরা তাঁদের বাবা বা মায়ের দ্বিতীয় একটি মানু্ষের সঙ্গে থাকার বিষয়ে আপত্তি জানান, তাঁদের সঙ্গে কথা বলেন যাদব। তিনি জানালেন, ছেলেমেয়েদের আপত্তি করার আসল কারণ সম্পত্তি। তাঁরা ভয় পান, কোথাও গিয়ে তাঁদের হকের টাকা মা বা বাবা ওই মানুষটির নামে বা তাঁর সন্তানদের নামে করে দেবেন না তো?‌ এবং তার সঙ্গে রয়েছে, ‘‌লোকে কী বলবে!‌’ 
হাদরাবাদের এনএম রাজেশ্বরী (‌৭১)‌ এবং বি দামোদর রাও (‌৭৪) একে অপরের সঙ্গে দেখা করেন আট বছর আগে এরকমই একটি সংস্থার‌ মাধ্যমে। তাঁরা বিয়ে করেননি। কিন্তু ছেলেমেয়েদের সামনে মালাবদল করেছিলেন কেবল। 
মীনা লাম্বে (‌৬১)‌ ও অরুন দেও (‌৭২)‌ সহবাসেই খুশি ছিলেন। কিন্তু তাঁদের ছেলেমেয়েদের চাপে বিয়ে করতে হয়েছে।
আবার অনেক মহিলার বক্তব্য, তাঁরা চান একজন সাথী। কিন্তু তাঁদের বিশ্বাস, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একজন পুরুষ একা হয়ে যাওয়ার পর যখন আবার করে কাউকে তাঁদের জীবনে চান। তখন তাঁদের আসল উদ্দেশ্য হল রান্নাঘরের দায়িত্ব সঁপে দেওয়া। কিন্তু সারাজীবন রান্নাঘর সামলে, ছেলেমেয়ে স্বামীর সমস্ত দায়িত্ব পালন করে আর সেসব ইচ্ছে করে না। নিজের মতো করে জীবনযাপন করতে চান তাঁরা। জয়শ্রী এম কখনও বিয়ে করেননি। ৬২ বছর বয়সে এসে সেই প্রাক্তন স্কুলশিক্ষিকার মনে হয়, এত চাহিদা সম্ভবত মেটাতে পারবেন না। তাই কারওর সঙ্গে এক বাড়িতে থাকতে তাঁর ভয়ই করে।   

জনপ্রিয়

Back To Top