.

                   কিউইদের দয়া করে আহাম্মক ভাববেন না

 

দেবাশিস দত্ত: মৃত্যু ছাড়া যখন আর কোনও ভাবনা বা ভয় এ মুহূর্তে নেই এদেশে তখন সুদূর সাউদাম্পটনে শুরু হতে চলেছে ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল। আমরা এখনও যখন লোকাল ট্রেনকে মান্যতা দিচ্ছি না, তখন, সাউদাম্পটনের গ্যালারিতে থাকবে অন্তত ছ’হাজার দর্শক। হয়তো ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবেন ওঁরা। তা হলে এই বায়োবাবল নামের কঠিন অধ্যায়টা কি খানিকটা বায়বীয় হয়ে গেল না? এই তো ক’দিন আগে ইংল্যান্ড জুড়ে ছিল কোভিডের ভ্রুকুটি। লন্ডন শহরের প্রাণস্পন্দন অক্সফোর্ড স্ট্রিট খাঁ খাঁ করছিল, আর সাত তাড়াতাড়ি মাঠে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে দর্শক!

যেন তর সইছে না। আমরা ক’দিন আগে লর্ডস টেস্টে দেখলাম কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার। এক, নিউজিল্যান্ডের জোরে বোলারদের অকেজো করে দেওয়ার জন্য উইকেট থেকে ঘাস উপড়ে ফেলা হয়েছে। জানি না, হঠাৎ পশ্চিমবঙ্গ থেকে ইয়াস ঝড় উড়ে গিয়ে শুধুমাত্র লর্ডসের বাইশ গজটাকে ঘাসহীন করে ফেলল কিনা। ম্যাচ হয়তো ড্র হয়ে গিয়েছে। কিন্তু নিউজিল্যান্ড বোঝাতে পেরেছে ওরাও কিন্তু সিরিজ জিততে এসেছে। দু’বছর আগে এই লর্ডসেই ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম এক আকর্ষণীয় ক্রিকেট ম্যাচ দেখেছিল ক্রিকেট দুনিয়া। বিশ্বকাপ ফাইনালে যে দুটি দলের বিরুদ্ধে সেই দুটি দল ওই একই মাঠে মুখোমুখি হলেও পাওয়া গেল না বিশেষ চিত্তাকর্ষক মুহূর্ত। নিজেদের দেশে পছন্দের উইকেট তৈরি করা অন্যায় নয়। তা বলে এমন ন্যক্কারজনক ভাবে ঘাসহীন উইকেট তৈরি করে বিলেতের ইংরেজরা কি রাতারাতি রক্ষণাত্মক হয়ে পড়লেন না?

দুই, লর্ডসের গ্যালারিতে দর্শকদের মুখে ছিল না কোনও মাস্ক। অথচ এখানে কিন্তু হঠাৎ ইংরেজরা আক্রমণাত্মক। অথচ রোলাঁ গারোয় ফ্রেঞ্চ ওপেনের গ্যালারিতে একটিও মাস্কহীন মুখ দেখা গেল না। অতীতে বহুবার ইংরেজদের দ্বিচারিতা, নানা ব্যাপারে আমরা দেখেছি। এটিও সেই তালিকায় নবতম সংযোজন।

লেখার শিরোনামে ফেরা যাক। গত তিন-চার বছরে আশাতীত উন্নতি করেছে নিউজিল্যান্ড। এ কারণেই বলছি কিউই পাখির দেশ থেকে আসা ক্রিকেটারদের আহাম্মক বা উজবুক ভাববেন না। গোকুলে বেড়েছে ওরা। মাথার ওপরে থাকছেন ঠান্ডা মাথার এক ধুরন্ধর অধিনায়ক। মহেন্দ্র সিং ধোনির চেয়েও ঠান্ডা মাথা। ব্যাটসম্যান হিসাবে ধোনির থেকে অন্তত দশগুণ ভাল। সেরা টেস্ট ব্যাটসম্যান হিসাবে আমি তো একনম্বরেই রাখতে চাইব কেন উইলিয়ামসনকে (বিরাট, ভাই আমার, কিছু মনে করিস না!)। ধাপে ধাপে এগিয়ে এসে নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক কিন্তু ব্যাটসম্যান হিসাবে সবাইকে ছাপিয়ে গেছেন।

এবার কিউই দল। বড় বড় তারকা নেই কিন্তু এ দলে। জিওফ বয়কট যেমন সে দিন বললেন, কেন উইলিয়ামসনকে সামনে রেখে অন্য ব্যাটসম্যানরা র‍্যালি করে যায়। অধিনায়ক দাঁড়িয়ে থাকেন, আর তাঁকে ঘিরে আবর্তিত হতে থাকেন অন্য ব্যাটসম্যানরা। সঙ্গে থাকছেন একঝাঁক অনবরত জোরে বোলার। এবার লর্ডস টেস্টে নিষ্প্রাণ উইকেটে খেলা হল, আশা করছি, সাদাম্পটনের উইকেটে শুধু যে ঘাস থাকবে তা নয়, বাউন্সও থাকবে ভালই। আরে, ওটাই তো মজা। এখানেই কিন্তু ট্রেন্ট বোল্টরা খানিকটা হলেও এগিয়ে থাকছেন। বুমরা-সামিদের প্রতি যথোচিত শ্রদ্ধা-ভালবাসা মেলে ধরেও স্বীকার করতে হবে, কিউই আক্রমণের ঝাঁঝ কিন্তু বেশি। আমাদের জাতীয় পাখি ময়ূরের মতো নিউজিল্যান্ডের জাতীয় পাখির নাম কিউই যে কিনা উড়তে পারে না। অথচ এবার বিলেতে যে নিউজিল্যান্ডকে দেখা যাচ্ছে, তাঁরা কিন্তু প্রবলভাবে ওড়ার চেষ্টা করছে। আরও একবার বলি, কিউই ক্রিকেটারদের বোকা বা অদক্ষ ভাববেন না।

ব্যাটিং বিভাগে হয়তো ভারত এগিয়ে থাকবে। অন্তত কাগজে কলমে। কিন্তু ফিল্ডিং এবং বোলিং বিভাগে নিউজিল্যান্ড টেক্কা দিয়ে দিলে বিস্মিত হব না। আন্তরিকতা, উপস্থিত বুদ্ধি, নিষ্ঠা এবং ফর্ম – সব মিলিয়ে নিউজিল্যান্ডের ধার বেশি। সবচেযে বড় কথা বলে ফেলেছেন দিলীপ বেঙ্গসরকার। কোনও প্র্যাকটিস ম্যাচ ছাড়াই টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল খেলাটা একটু কঠিন। সেখানে নিউজিল্যান্ড কিন্তু বিলেতের আবহাওয়ায় নিজেদের শুধু মানিয়ে নেয়নি তা নয়, দুটো টেস্ট ম্যাচ খেলে সাউদাম্পটনে পৌঁছবেন ওঁরা। প্রতিভায় পিছিয়ে থাকা শেষ কথা নয়। আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা থাকলে অনেক দুর্গম পথও অতিক্রম করে ফেলা যায়। উইলিয়ামসনরা সেই চেষ্টাই করছেন।

আকর্ষনীয় খবর