.

মহামারীর আতঙ্কের মাঝে ক্রিকেটের মিষ্টি টুংটাং

দেবাশিস দত্ত

জীবন কখন মুচকি হাসে?
উত্তর : যখন আপনি বিপদে পড়েন।
জীবন কখন হাসতে থাকে?
উত্তর : যখন আপনি সফল হন।
জীবন কখন ঝলমল করে হাসে?
উত্তর : যখন আপনি অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে পারেন।
চার্লি চ্যাপলিনের জীবনদর্শন ঘাঁটলেই এই তিনটি পর্যবেক্ষণকে ছাঁকনিতে তুলে নেওয়া যায়।
চারদিকে যখন অতিমারীতে লোকজন মারা যাচ্ছে অহর্নিশ, ডাক্তারের অভাবে মা-বাবাকে হারাতে হচ্ছে, অক্সিজেন সিলিন্ডারের অভাবে কন্যাসম বন্ধুপত্নীকে হারাতে হয়, তখন কি আর ওয়ার্ল্ড টেস্ট ক্রিকেট চ্যাম্পিয়নশিপ নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় থাকে?
জীবন চলতেই থাকে। প্রাণখোলা আনন্দ নিয়ে হয়ত এবার প্রথম টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল দেখতে পারবেন না অনেকেই। তবে থাকবে দাঁত-চাপা প্রতিযোগিতা যার সবটুকু রহস্য লুকিয়ে থাকে অনিশ্চয়তার মোড়কে। কোনও বিভ্রম রেখে লাভ নেই। ভীরু, দ্বিধাগ্রস্ত মন নিয়ে ফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ খেলায় নামা মানেই পিছিয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকবে প্রবল।
খেলা শুরু ১৮ জুন। টাইটানিকের শহরে বৃষ্টি-টিস্টি হলে খেলা পাঁচদিনের বদলে গড়িয়ে যাবে ছ’দিন। পোশাকি নাম সাউদামটন। ডুবে যাওয়ার আগে টাইটানিক এ শহরের উপকূল থেকেই ছেড়ে গিয়েছিল। শহরের মাঝখানে তাই ব্রিটিশ সরকার স্থাপত্যের ঢঙে তৈরি করে রেখেছে টাইটানিক মিউজিয়াম। আশা করব, বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম ফাইনাল জেতা দল একবার অন্তত ট্রফি নিয়ে এই জাদুঘর ঘুরে যাবে।
বিপক্ষ দুই দল ভারত ও নিউজিল্যান্ড। কেন উইলিয়ামসনের নিউজিল্যান্ডের মতোই বিরাট কোহলির ভারতও প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন হতে চাইবে। তাই, জিওফ বয়কটের মতো প্রাজ্ঞ ক্রিকেটবোদ্ধারা পরিষ্কার জানিয়ে দিচ্ছেন, এই ফাইনাল কিন্তু একপেশে হবে না। যদি বা কিন্তুর অবকাশ নিয়ে মাথা ঘামানো হবে ম্যাচের শেষে। তার আগে পেন্ডুলামের মতো ম্যাচের ভাগ্য দুলতে থাকবে এক শিবির থেকে অন্য শিবিরে।
প্রস্তুতির বিচারে ভারত কি একটু পিছিয়ে থাকছে না? প্রেক্ষিতটা বলে নেওয়া যাক। অনেক আগে পৌঁছে যাওয়া নিউজিল্যান্ড বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের আগে প্র্যাকটিস পর্ব সেরে ফেলেছে অকুস্থল রোজ বোল-এ। তারপর তাঁরা লন্ডনের পথে রওনা হয়ে গিয়েছেন দুটি টেস্ট খেলার জন্য। বিপক্ষ ইংল্যান্ড। অর্থাৎ, পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার সুযোগের ক্ষেত্রে কিউইরা থাকছে অনেকটাই এগিয়ে। সেখানে ভারত হিথরো বিমানবন্দরে অবতরণের পর সরাসরি চলে যাবে নিভৃতবাসে। বায়োবাবল! বায়োবাবল! বায়োবাবল-এর কঠিন দূর্গে সময় কাটিয়ে আড়মোড়া ভেঙে নামতে নামতেই চলে আসবে ১৮ জুন। প্রস্তুতির ব্যালান্স শিটে চোখ বোলাতে গিয়ে একটু নিস্তেজ হয়ে পড়লেন নাকি? কিন্তু এটাই তো শেষকথা নয়। ইতিমধ্যে আমরা জেনে বলেছি শুধু প্রতিভাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন একনিষ্ঠ মন এবং পর্যাপ্ত অনুশীলন। এখান থেকেই শুরু হবে বিরাট কোহলিদের লড়াই। কত দ্রুত সাউদামটনের ছিঁচকাঁদুনে আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে প্রতিভার আগুনে কিউইদের ঝলসে দেওয়ার উদ্যোগের দিকে তাকিয়ে থাকছে প্রবল মহামারীতে আক্রান্ত ভারত।
পুনশ্চ: এত বড় একটা প্রতিযোগিতার ফাইনাল কেন লর্ডসে আয়োজন করা গেল না, এ প্রশ্ন তুলেছেন কপিলদেব। ন্যায্য প্রশ্ন। দু-বছর আগে লর্ডসেই ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ ফাইনালে অদ্ভুত নিয়মে ইংল্যান্ডের কাছে হেরে যেতে হয়েছিল নিউজিল্যান্ডকে। ১৯৭৫, ১৯৭৯, ১৯৮৩ এবং ১৯৯৯-এর বিশ্বকাপ ফাইনাল আয়োজিত হয়েছিল লর্ডসেই্, যেখানে দাঁড়িয়ে তিরাশির পঁচিশে জুন আমাদের সবার প্রিয় কপিলদেব ক্সাইভ লয়েডের ওয়েস্ট ইন্ডিজকে পেছনে ফেলে দিয়ে প্রুডেনশিয়াল কাপ জিতেছিলেন। তিনি তো চাইবেনই বিরাট কোহলিরা ক্রিকেটের মক্কায় ফাইনালটা খেলুক। এখানে একটা ছোট চিমটি কাটা যাক – বলি, ইংল্যান্ড যদি ফাইনাল খেলত, তা হলে কি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল সাউদামটনে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হত?