উদ্দালক ভট্টাচার্য: ১৯৮৬ সালে, সেই যেবার জম্মু থেকে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের ভিটে ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল, সেবারে তাঁর হাত ধরেই সাধের ভিটে ছেড়েছিলেন বাবা। সেই দীপিকা সিং রাজওয়াত আপাতত লড়াই করছেন একদল কাশ্মীরি হিন্দু মৌলবাদীর বিরুদ্ধে। এক মুসলমান কন্যার জন্য। যাকে বেশ কয়েকদিন ধরে ধর্ষণ করার পর ইলেকট্রিক শক দিয়ে মেরে ফেলতে চেয়েছিল ধর্ষকরা। দেহ ফেলে রেখেছিল মন্দিরে। যম তাতেও মুখ ফেরানোয় শেষ পর্যন্ত মাথা থেঁতলে দিয়েছিল ভারি পাথর দিয়ে। দীপিকা লড়ছেন সেই মুসলিম কন্যার হয়ে। যে কারণে কাশ্মীরের বেশিরভাগ হিন্দু সংগঠন, বার অ্যাসোসিয়েশন এবং কাশ্মীরী পণ্ডিতদের সংগঠন তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। তবু দীপিকার জেদ যায় না। 
যোধপুরের আইন কলেজ থেকে আইন পাশ করে দীর্ঘদিন ধরে পেশাদার আইনজীবীর কাজ করছেন। নিজের হাতে গড়েছিলেন একটি মানবাধিকার সংগঠন। যাদের কাজ মূলত শিশুদের অধিকার নিয়ে। কাঠুয়ায় ধর্ষিতা শিশুর বিষয়টি নিয়ে যখন অপর আইনজীবী তালিব হুসেন দীপিকার কাছে আসেন, তখন কী মনে হয়েছিল? ‘‌প্রথমটায় নিজেকে কেমন ঘেন্না করছিল’‌, বলছিলেন দীপিকা। 
ইন্টারনেট খুঁজলে দেখা যাবে, কেউ কেউ বলে, রাজপুত হিন্দু দীপিকার স্বামী মুসলিম। একটি ফুটফুটে মেয়েও আছে তাঁদের। নাম রেখেছেন অষ্টমী। ফেসবুক প্রোফাইল ঘাঁটলেই সেই ছোট্ট মেয়েটির ছবি দেখতে পাওয়া যায়। কাঠুয়ায় ধর্ষিত সেই যাযাবর সম্প্রদায়ের শিশুকন্যাটির বয়স ছিল মাত্র আট। আর অষ্টমী? পাঁচ। 
ঠিকই। দীপিকার মনে পড়েছিল নিজের সন্তানের কথা। শিউরেও উঠেছিলেন। সে কথা একাধিক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন তিনি। তবে নাহ্‌, ভয় করেনি তাঁর। নিজের মেয়ের মুখের দিকে চেয়েও ভয় করেনি। বরং লড়াইটা জেতার শক্তি পেয়েছেন ওই অষ্টমীর দিকে তাকিয়েই। ওপর–ওপর লড়াইয়ের গল্পগুলো এখন সকলেরই জানা। সবাই জানেন, কীভাবে পুলিশ চার্জশিট জমা দিয়েছে। কীভাবে বিপুল বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছে কাঠুয়া–কাণ্ডে নিহত কিশোরীর হয়ে লড়তে–নামা লোকজনকে। 
কারণ, দীপিকারা ভাবেননি, একটি বাচ্চা মেয়ের ধর্ষণের ঘটনা সামনে আসার পরেও দেশে তৈরি হবে মেরুকরণ। কেবল ধর্মের ভিত্তিতে, কেবল জাতের রঙে, দলের পতাকায় আড়াআড়ি ভাগ হয়ে যাবে কাশ্মীর ও দেশের একাংশ। ‘‌ধর্ষিতা’‌ মেয়ের পাশে দাঁড়ানোর পর তাঁকে রাতে ফোন করবেন ‘‌নেতা’জি’‌। ঠাণ্ডা গলায় বলবেন ‘‌বেশি বাড়াবাড়ি করবেন না।’‌
থরথর করে কাঁপতে থাকেন দীপিকা। ভয়ে নয়। রাগে। ‌
তীব্র ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতেই বলেন, ‘‌কী ভেবেছে?‌ আমাকে হুমকি দিয়ে ঘরে বসিয়ে দেবে?‌ আমি ওদের ভয় পেয়ে আর কেস লড়ব না। ঢুকে যাবো বাড়িতে?‌ অসম্ভব। আমাকে ওরা চেনে না। যতবার ভয় দেখাবে ওরা, আমি ততবার নতুন করে এই লড়াই লড়ার শক্তি পাব। কারণ, আমি জানি, ঠিক মৃত্যুর আগের মুহূর্তে কতটা কষ্ট পেয়েছিল ওই ছোট্ট মেয়েটা।’‌ 
ঠিকই। ওইভাবে তো পারা যাবে না এই ৩৮–এর টর্নেডোকে আটকে দিতে। তাই শুরু হয়েছে নতুন ষড়যন্ত্র। 
ষড়যন্ত্রই। তাছাড়া এমন পরিকল্পনাকে অন্যকিছু বলা অন্যায়। শাস্তিযোগ্য অপরাধ। একাধিক বেসরকারি নিউজ পোর্টাল দীপিকার ফেসবুক পেজ ঘেঁটে খুঁজে বার করেছে তাঁর একাধিক ছবি। তার মধ্যে একটি আরেক কাশ্মীরি রাজনীতিক শেহলা রশিদের সঙ্গে তোলা। ব্যস্‌! পাওয়া গেছে নতুন মন্ত্র। রে–রে করে উঠেছে একাধিক মিডিয়া। প্রচার করেছে ‘‌অতিবাম’‌–দের শিবিরে দীপিকার আসন সোনায় মোড়া। জেএনইউতে প্রায়শই নাকি রাত্রিবাস করে থাকেন তিনি। 
মূল্যবোধ, সততা, মানবিকতা, শব্দগুলো ততক্ষণে হাস্যকর লাগতে শুরু করেছে দীপিকার। একাধিক সংবাদমাধ্যমকে নোটিস দিয়ে তিনি জানিয়ে দেন, রাজনৈতিক শিবিরে নাম লেখানোর ইচ্ছা তাঁর নেই। এসব ফাঁদ তৈরি করেও কোনও লাভ নেই। তিনি লড়াই চালাচ্ছেন, চালাবেনও। 
দীপিকা বলেছিলেন, ‘‌আমাকে খুন করা হতে পারে।’‌ 
ঠিকই। আপনি খুন হয়ে যেতে পারেন দীপিকা। আপনাকে হুমকি দিয়ে, মেরে, খুন করে, গুম করে কেবল রাজনৈতিক ফায়দা তোলার জন্য যে কোনও উগ্র মৌলবাদের সমর্থক ছুটে আসতে পারে। আসবেই। কারণ, শুধু তো আপনি নন, সুরাত, ছত্তিশগড়, দিল্লি— এমন আরও আরও কত কত শহরে যে হাজার হাজার কাঠুয়া প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে। গোটা দেশেই চোরাস্রোতের মতো লালসার জিভ বার করে বসে আছে ধর্ষকের দল। তাদের পেটে খিদে। হরমোনে নেই নিয়ন্ত্রণ। অন্যের বান্ধবী–মা–বোনকে তারা আড়চোখে লুকিয়ে দেখে। ভাবে। ভাবতে ভাবতে চকচক করে ওঠে চোখ। আর আপনি, কোথাকার কোন দীপিকা সিং রাজওয়াত সেসব বন্ধ করে দিতে, দৃষ্টান্ত তৈরি করতে চাইছেন! 
আপনি পারবেন তো?‌ জিততে পারবেন তো? আইনজীবীর কালো পোশাকটা গায়ে চড়িয়ে এগোচ্ছেন আপনি। নির্ভুল, দৃঢ় পদক্ষেপ। ছবিটা আশা দিয়ে যায়। আইনজীবী হিসাবে এই কেসে আপনার লড়াই হয়ত দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে সারা দেশে। কিন্তু গোটা দেশেই যে ছড়িয়ে আছে কাঠুয়া। প্রত্যেক আইনজীবী দীপিকা সিং রাজওয়াত হচ্ছেন কই, যে লড়াইটা সমানে সমানে হবে!‌ 
আপনাকে পারতেই হবে। কারণ, সাধারণের ঘরেও যে কন্যা জন্মাচ্ছে রোজ। যেমন জন্মেছিল ‘‌কাঠুয়ার নির্ভয়া’‌।

জনপ্রিয়

Back To Top