আজকাল ওয়েবডেস্ক:‌ বাঁধানো চণ্ডীমণ্ডপ। সেখানে বসে দুর্গার পুজো করছেন এক সাঁওতালি পুরোহিত। আওড়াচ্ছেন যে মন্ত্র, তাও সাঁওতালি। সংস্কৃত নয়। অন্য ধারার এই পুজো হয় এই বাংলাতেই। সুলুঙ্গা আদিবাসী গ্রামে।
এই পুজোর নেপথ্যে রয়েছে লড়াইয়ের ইতিহাস। অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার ইতিহাস। প্রান্তজনদের ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস।
বীরভূম জেলার রামপুরহাট এলাকায় রয়েছে এই সুলুঙ্গা। সদর সিউড়ি থেকে দু’‌ ঘণ্টার গাড়ি–পথ। ছোট্ট পাহাড়, টিলা ছড়ানো–ছেটানো। বড় কোনও নদী নেই এই এলাকায়। ছোটখাটো শাখানদী, উপনদী। বছরের বেশিরভাগ সময়ে তাতে জল থাকে না। এককালে খুব জলকষ্ট ছিল। সেচের ব্যবস্থা ছিল না। ফলে চাষাবাদে সমস্যা হত। 
তখন ভারতের শাসনভার ব্রিটিশদের হাতে। ব্রিটিশ সরকারকে বারবার সেচের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানায় আদিবাসীরা। কানে তোলেনি প্রশাসন। শেষ পর্যন্ত মাঠে নামে গ্রামের দুই যুবক ব্রজ মুর্মু আর দুর্গা মুর্মু। মাটি কেটে বাঁধ তৈরি করে জলাধার তৈরি করেছিলেন ওই দুই যুবক। সম্পূর্ণ নিজেদের চেষ্টায়। সেই জলাধারে সঞ্চিত হতে থাকল বৃষ্টির জল। 
ঠাকুরপুরা গ্রামে চাষের কাজে প্রথম ব্যবহৃত হতে থাকে সেই জলাধারের জল। খাল কেটে আনা হয় জল। আশপাশের গ্রামে প্রচার হয়। ক্রমে আদিবাসীদের হিরো হয়ে ওঠেন ব্রজ আর দুর্গা। আর ওই জলাশয় তখন আদিবাসীদের সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক। নিজেদের অধিকার রক্ষার জন্য লড়াইয়ের প্রতীক। 
শুধু চাষের জল থেকে নয়, পুজো–পার্বণেও ব্রাত্য ছিল সাঁওতালরা। সারবাদ্রা, কাষ্ঠগোড়া, বড়জলে বর্ধিষ্ণু কৃষকরা দু্গা পুজো করতেন। সেখানে যাওয়ার অধিকার ছিল না সাঁওতালদের। এই সামাজিক, শ্রেণী বৈষম্যের বিরুদ্ধে আরও একবার রুখে দাঁড়ালেন ব্রজ আর দুর্গা। ঘোষণা করলেন, নিজেরাই করবেন নিজেদের দুর্গাপুজো। সেখানে উচ্চারিত হবে তাঁদের নিজেদের ভাষায় মন্ত্র। পড়বেন তাঁদেরই একজন। 
প্রায় ১০০ বছর আগে সুলুঙ্গার খোলা মাঠে ছোট্ট দুর্গা প্রতিমা তৈরি করে পুজো শুরু হয়। এখন সেই প্রতিমার দৈর্ঘ্য আরও একটু বেড়েছে। আদিবাসীদের চেষ্টায় পাকা চণ্ডীমণ্ডপ তৈরি হয়েছে। তবে পুজোর রীতি–নীতি বদলায়নি। এবারও তৈরি প্রতিমা। পুজোর প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন পুরোহিত হাপোন সোরেন আর তাঁর স্বজাতীয়রা। 

জনপ্রিয়

Back To Top