তাপস গঙ্গোপাধ্যায়: দামোদরের পাড়ে হুগলি জেলার রাজবলহাট বিখ্যাত তাঁতের কাপড়ের জন্য। পাশাপাশি আর একটি কারণেও এই জনপদটি শুধু বাংলাদেশে (‌দুই বাংলাকে মাথায় রেখেই লিখছি)‌ নয় অসম, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, গুজরাটেও সমান জনপ্রিয়। কারণটি হল দুলালচন্দ্র ভড়ের তালমিছরি। দুলালচন্দ্র নিজে ছিলেন তাঁতি। জাত ব্যবসার প্রয়োজনে দেশের বৃহত্তম বাজারে, অর্থাৎ কলকাতায় আসতেন তাঁর বাবা জহরলালের সঙ্গে। দেশে ৩/‌৪ বিঘার ওপর ছিল এজমালি বিরাট বাড়ি। যেখানে দুলালচন্দ্রের বড় জ্যাঠা ফকিরচন্দ্র, মেজ জ্যাঠা মন্মথনাথ এবং বাবা জহরলাল ছেলেমেয়েদের নিয়ে একসঙ্গে থাকতেন। এলাহাবাদে যে বছর জওহরলাল ও কমলা নেহরুর কন্যা ইন্দিরা জন্মান সেই ১৯১৭ সালের ২৬ ডিসেম্বর জহরলাল ও পঞ্চুবালার পুত্র দুলালচন্দ্র, গম্ভীর বাংলায় যাকে বলে জন্মগ্রহণ করেন।
দুলালচন্দ্রের মেজ ছেলে ধনঞ্জয় যার বয়স এখন ৬১, সম্প্রতি আমায় বলেছেন, ‘‌১৯৩৪ সালে বাবা প্রথম তালমিছরি বানান। তালের রস সাত–‌আট দিন লাগে দানা বাঁধতে। দেশের বাড়িতে তখন তালগাছের ছড়াছড়ি। শিউলিদের খবর দিলে তারা চলে আসত। চৈত্রের মাঝামাঝি থেকে জ্যৈষ্ঠের শেষে এই সময়টুকুই ছিল রস সংগ্রহের পর্ব। মাটির হাঁড়িতে একটুখানি চুনও দিতে হত, যাতে রস না গেঁজে যায়। ওই রস থেকেই হত তালের গুড়— মিছরির উৎস বলতে পারেন।’ 
‘‌মিছরি’‌ বা ‘‌মিসরি’ হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষায় স্ফটিক সদৃশ শর্করাখণ্ড। দুলালাচন্দ্রের জন্মের ঢের ঢের আগেও ছিল। তবে তা সাদা। আখের রস থেকে‌ বানানো। দুলালের বৈশিষ্ট্য তালের রসের মিছরি।
২০০০–‌এর জুনে দুলালচন্দ্র মারা যান। তার আগে তাঁর বড় ছেলে সঞ্জয়ের মৃত্যু তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে। মৃত ছেলের স্মৃতিতে দামোদরের পাশে রাজবলহাটের অদূরে রশিদপুরে তিনি একটি হিমঘর বানান। কলকাতায় ভড়দের হরিশ মুখার্জি রোড থেকে উত্তরে আহিরিটোলাজুড়ে ছড়ানো ৭/‌৮টি বাড়ি। দুলালচন্দ্র ১৯৬২ সালে হেদুয়ার পাড়ে বসন্ত কেবিনের অপর পাড়ে যে বাড়িটি কেনেন আজ সেখানে থাকেন ধনঞ্জয়। ধনঞ্জয়ের পরিচয়, ভড় ফুডস প্রাইভেট লিমিটেডের এম ডি। কৈখালিতে কারখানা।
দুলালচন্দ্রের জীবদ্দশায় প্রতিদিন কৈখালির কারখানা থেকে ৩ লরি তালমিছরি বড়বাজারের অফিস হয়ে চালান যেত সারা বাংলা এবং অসম থেকে গুজরাটের প্রতিটি দাবাখানায়। সর্দিকাশি, জ্বর, গলা খুসখুসের এত বড় দিশি ওষুধ আর নেই। এই রিপোর্টার, মনে আছে, ছেলেবেলায় ’‌৪০, ’‌৫০–‌এর দশকে নিজে খেয়েছে। তার মেয়েও খেয়েছে ’‌৭০ এবং ’‌৮০–‌র দশকে। এবং নাতনিকেও তার দিদিমা খাইয়েছে নতুন শতাব্দীর বয়স যখন ৫, তখন থেকে।
দুলালচন্দ্রের মৃত্যুর পর ধনঞ্জয় ও কনিষ্ঠপুত্র অমিতের মালিকানা নিয়ে মামলা আজ দেড় যুগ চলছে। মাঝে দু’‌বছর বন্ধ ছিল ওই তালমিছরির জোগান। তার সুযোগ নেয় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী, যারা দুলালের তালমিছরি বলে পোড়া চিনির ড্যালা বেচত বাজারে। সম্প্রতি হাইকোর্টের রায় স্বস্তি দিয়েছে ধনঞ্জয়কে। বর্তমানে দিনে দেড় লরি তালমিছরি কৈখালির কারখানা থেকে বেরোচ্ছে। এক লরিতে থাকে ১৫০ পেটি তালমিছরির বোতল, কাচের ও প্লাস্টিকের। তবে এখনও হাইকোর্ট নিযুক্ত ২ জন রিসিভার সব দেখেন। 
এত বছর তালমিছরির ওপর কোনও ট্যাক্স ছিল না। গত ১ জুলাই থেকে ৫ শতাংশ জি এস টি বসেছে। ওই জি এস টি ধরে ১ কিলো প্লাস্টিকের তালমিছরির বোতলের সর্বোচ্চ খুচরো দাম ১৩০ টাকা, ৫০০ গ্রামের ৭৪, ৪০০ গ্রামের ৭১, ২০০ গ্রামের কাচের বোতল ৫২, প্লাস্টিকের ৫০, ১০০ গ্রামের প্লাস্টিকের ২৯, কাচের ৩০ টাকা।
লেক মার্কেটের একদিকে স্পন্দন, অন্যদিকে রামকৃষ্ণ মেডিক্যাল হল। এই দুই বাঙালি দাবাখানার বক্তব্য, তারা ১৫/‌২০ দিন আগে ভড় প্রোডাক্টস লিমিটেডের বড়বাজারের মনোহর দাস স্ট্রিটের হেড অফিস বা মহাত্মা গান্ধী রোডের রেজিস্টার্ড অফিসে টাকা জমা দিয়ে আসেন। কোম্পানি ওই দিন ১৫ বাদে তালমিছরির বোতল পাঠিয়ে দেয়।
আমি অন্তত জানি না আর কোনও ওষুধ বলুন, খাবার বলুন, তার জন্য খুচরো ব্যবসায়ীকে আগাম দাম জমা রাখতে হয়। সাদার্ন মার্কেটের নিউ শ্রীগোপাল স্টোর্সের মালিক বললেন, ‘‌ওরা ঠিক পাঠিয়ে দেয়। দেরি হলেও দুলালের তালমিছরির চাহিদায় কোনও খামতি নেই।’‌ আবিষ্কারের ৮৩ বছর পরেও। দুলালচন্দ্র সত্যিই অমর। আর সেই অমরত্বকে স্থায়ী করবে কে?‌ ধনঞ্জয় না অমিত— তা সময়ই বলে দেবে। 

 

উত্তরসূরি। ধনঞ্জয় ভড়। ছবি: অমিত ধর

জনপ্রিয়
আজকাল ব্লগ

Back To Top