সৌগত চক্রবর্তী 
এমনটা হয়তো বাংলা সিনেমার ইতিহাসে প্রথম। কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় দেব অভিনীত ছবি ‘‌আমাজন অভিযান’‌ মুক্তি পাচ্ছে ছয়টি ভারতীয় ভাষায়। বাংলা আর হিন্দি তো আছেই। তার সঙ্গে ওড়িয়া, অসমিয়া, তামিল ও তেলুগু ভাষাতেও মুক্তি পাচ্ছে এই ছবি। এর আগে মুক্তি পেয়েছে এই ছবির বিশাল পোস্টার। যা ছাড়িয়ে গেছে ‘‌বাহুবলী’‌ ছবিকেও। এবার দক্ষিনী সিনেমার বাজারকেও ধরতে চলেছে এই ছবি। বিভূতিভূষন বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘‌চাঁদের পাহাড়’‌ উপন্যাসে বাঙালিকে পরিচয় করিয়েছেলেন ‘‌শঙ্কর’-‌এর সঙ্গে। ছোটদের তো বটেই সব বাঙালির হৃদয়েই আজও শঙ্করের উপস্থিতি। সেই উপন্যাস অবলম্বনেই কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় বড়পর্দায় এসেছিল ‘‌চাঁদের পাহাড়’‌। এবার কমলেশ্বর আবার ফিরিয়ে আনলেন ‘‌শঙ্কর’‌চরিত্রটিকে। তবে শুধুমাত্র নামটাই। বাকিটা কমলেশ্বরের কল্পনায়। কিন্তু এই ছবিতে ‘‌শঙ্কর’‌-‌এর প্রসঙ্গিকতা কী?‌
সূত্র শঙ্কর
চাঁদের পাহাড়ের অভিযান শেষে শঙ্কর ফিরে এসেছে তার কেউটিয়া গ্রামে। তার ৩ বছর পর তার কাছে আসে অ্যানা ফ্লোরিয়ানের এক টেলিগ্রাম। পেশায় ইতালিয় অ্যানথ্রোপলিজস্ট শঙ্করের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয় সাউথ রোডেশিয়ান মিউজিয়ামের কিউরেটর ফিটজেরাল্ডের মাধ্যমে। এই ফিটজেরাল্ডের উল্লেখ ছিল ‘‌চাঁদের পাহাড়’‌-‌এ। টেলিগ্রামে অ্যানা জানায়, যে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় উপজাতি নিয়ে সে কাজ করে। এবার সে বাবা মার্কো ফ্লোরিয়ানের স্বপ্ন সফল করতে চায়। থিওডোর রুজভেল্ট ও ক্যান্ডিডো রন্ডনের ম্যাপ অনুসরণ করেই সে খুঁজে পেতে চায় হারানো সোনার শহর এল ডোরাডো। সেই অভিযানে সে সঙ্গে পেতে চায় শঙ্করকে।
দেবের কথা
আমার মধ্যেও কিন্তু একটা শঙ্কর আছে। শঙ্করের মতো আমিও সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াতে চাই, জানতে চাই। তবে যে সব জায়গায় ট্যুরিস্টরা গিয়ে ভীড় করেন সেই সব জায়গায় নয়। একটু অফ বিট জায়গায় যেতে ভালবাসি আমি। সেই হিসেবে এই আমাজন দারুণ গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সবাই মিলে ১২০ জনের টিম ছিলাম। থাকতাম আমাজন জঙ্গলের সবচেয়ে কাছের লোকালয় সাওপাওলোতে। সেখান থেকে ভোরবেলায় বোটে করে শুটিং করতে যেতাম। খাবার বলতে প্রতিদিনই ভাত আর রাজমা। মাঝেমধ্যে কপাল ভাল থাকলে ডিম আর মাছ। সারাক্ষণ মশা আর মাছি ভনভন করছে। কিছু খেতে গেলেই দেখতাম খাবারটার ওপর মাছি বসে কালো হয়ে আছে। ভীষণ ঘেন্না লাগত। নদীতে ক্যানোপেতে চড়ে যখন শুটিং করছি দেখছি পাশ দিয়ে ভেসে যাচ্ছে বিরাট দাঁত বের করা কুমীর। ক্যানোপেতে দাঁড়ানোও বেশ কঠিন। বেশ ব্যালান্স করতে হয়। যখন তখন ডুবে যেতে পারে। সেরকম হলে কী হবে ভাবলেই আতঙ্ক। আসলে আমি বেশ ভীতু। কিন্তু ক্যামেরা চললেই আমার মধ্যে একটা পরিবর্তন আসে। ভীষণ সাহসী হয়ে যাই। আমাজনে কুমীর ধাক্কা মেরেছে বোটে, মশার কারণে হাত-‌পা ফুলে রক্ত বেরিয়েছে, বিষাক্ত ব্যাঙকে হাতে করে ধরেছি। সারাক্ষনই তার ফলে আ্যালার্জি, জ্বর আর চুলকানিতে ভুগেছি। একবার তো পায়ে একটা পচা কাঠ ঢুকে গিয়েছিল। তাও আমরা হাল ছাড়িনি। একটা আধঘণ্টার আন্ডার ওয়াটার শুটিংও আছে এই ছবিতে।
কোন কোন জানোয়ারের মুখোমুখি
এই ছবিতে শঙ্কর মুখোমুখি হয়েছে অ্যানাকোন্ডা, পিরানহা, ব্ল্যাক প্যান্থার আর বিষাক্ত ডার্ট ব্যাঙের।
অ্যানাকোন্ডা:‌ ‘‌অ্যানাকোন্ডা’‌ সিনেমার দৌলতে সবাই জানেন এই ভয়াল সাপের কথা। কয়েকদিন পরে প্রফেসর শঙ্কুর কাহিনী নিয়ে যে ‘‌নকুড়বাবু ও এল ডোরাডো’‌ ছবির শুটিং শুরু হবে সেখানেও উল্লেখ আছে এই সাপের। বোয়া প্রজাতির এই সাপ লম্বায় প্রায় ২০ ফুট। ওজন প্রায় আধ টন। হরিণ বা মানুষকেও গিলে ফেলতে পারে এই সাপ। গল্পে এই সাপের সঙ্গে ডুয়েল লড়বে শঙ্কর।
পিরানহা:‌ মাংসাশি এই মাছের কথাও কারও অজানা নয়। অরণ্যদেবের কমিকসে এই মাছে ভরা নদী পেরিয়ে যেতে হত নন্দন কাননে। আমাজনের এই মাছের মুখে ধারালো চকচকে দাঁতের সারি। এখনও পর্যন্ত ১১ প্রজাতির পিরানহার সন্ধান পাওয়া গেছে। এই মাছ কতটা হিংস্র তা দেখতে একবার একটা গরুকে পিরানহা ভরা নদীতে নামিয়ে দেওয়া হয়। দেখা যায় মাত্র ২০ মিনিটেই আস্ত গরুটি কঙ্কালে পরিণত হয়।
ব্ল্যাক প্যান্থার:‌ সত্যজিৎ রায়ের ‘‌ব্রাজিলের কালো বাঘ’‌ বইতে এই বাঘের উল্লেখ আছে। জাগুয়ার প্রজাতির এই বাঘ সম্পূর্ণ কালো রঙের। লম্বায় ৬ থেকে ৮ ফুট দীর্ঘ। ওজন ৩৫০ পাউন্ড। রাতের অন্ধকারেও শিকার ধরার ক্ষমতা আছে এই বাঘের। এছাড়া সাঁতার কাটতে বা গাছে উঠতেও পটু এই বাঘ।
ডার্ট ব্যাঙ:‌ দেখতে যেমন সুন্দর শিকারেও তেমনি দক্ষ এই বিষাক্ত ব্যঙ। গোটা শরীরময় রঙবেরঙের আলপনা ডেনট্রোব্যাটাইডি প্রজাতির এই ব্যাঙের। তবে এর প্যারোটিড গ্রন্থি ও শরীরের গুটি থেকে নির্গত হয় মারাত্মক বিষ। এই বিষ তিরে মাখিয়ে শিকার করেন উপজাতি মানুষরা। গল্পে শঙ্করও এই ব্যাঙের বিষ সংগ্রহ করবে তিরে মাখাতে।
বিরল এক উপজাতি
এই ছবিতে প্রায় হারিয়ে যাওয়া এক উপজাতি সম্প্রদায় ইয়ানোমামিদের দেখা যাবে। দেখা যাবে তাদের গ্রামকেও। আমাজনের জঙ্গলের প্রাচীনতম উপজাতি এরা। ভেনেজুয়েলা আর ব্রাজিলের কিছু অংশে দেখা মেলে এদের। বর্তমানে এদের সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার। তবে দ্রুত কমে আসছে এদের সংখ্যা। ইউনেস্কোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী এদের ২৫০টি গ্রামের সন্ধান পাওয়া গেছে। ছবিতে অতিথিবৎসল এই উপজাতির একটি গ্রামে আতিথ্য গ্রহন করেছে শঙ্কর ও অ্যানা। দেখেছে এদের নাচও।
ডেভিড জেমস
‘‌চাঁদের পাহাড়’‌ ছবিতে তো অভিনয় করেছিলেনই। এবার ‘‌আমাজন অভিযান’‌-‌এও অভিনয় করেছেন সিনেমা ও থিয়েটারের দক্ষ অভিনেতা ডেভিড জেমস। সাধারনত ভিলেন চরিত্রেই অভিনয় করেন এই অভিনেতা। ‘‌ডিস্ট্রিক্ট নাইন’‌ ছবিতে অভিনয় করে অস্কারের জন্যেও মনোনীত হয়েছিলেন ডেভিড। এই ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন অন্যতম ভিলেন ‘‌মার্কো’‌র চরিত্রে। এছাড়াও অভিনয় করেছেন শ্বেতলানা গুলাকোভা, লাবণী সরকার ও তমাল রায়চৌধুরি।
সব মিলিয়ে এই ছবি ঘিরে ইতিমধ্যেই আগ্রহ তুঙ্গে। বলা হচ্ছে এই ছবির বাজেট ২০ কোটি টাকা। আজ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বাজেটের বাংলা ছবি এটাই। ছবির মুক্তি ২২ ডিসেম্বর। ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top