প্রচেত গুপ্ত: গল্পের বই জোগান দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। একটা দুটো বা তিনটে চারটে নয়, কয়েকশো গল্প–উপন্যাস বিক্রি হয়ে গিয়েছে হুড়মুড়িয়ে। রোজ অর্ডার ‘‌বই চাই’‌। কিন্তু মিলবে কোথা থেকে?‌ স্টক যে ফুরিয়ে গেল। ছুটতে হচ্ছে প্রকাশকের ঘরে।
গল্পের মতো শোনাচ্ছে না? রূপকথার মতো?
আমার তাই মনে হয়েছিল। বন্ধু ছড়াকার শমীন্দ্র ভৌমিক যখন রবিবার সকালে টেলিফোনে এই ঘটনা বলে, আমি ‘‌‌ঠাট্টা’‌ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, আমি লেখালিখি করি বলে মজা করছে। করোনার দিনে মানুষ গল্প–উপ্যাসের বই কিনবে!‌ অসম্ভব। কিছুদিন ধরে তো শুনে আসছি গল্প–উপন্যাসের বই কেনাকাটার দিন শেষ। পুরোপুরি না হলেও, আপাতত তো বটেই। ‘‌আপাতত’‌ মানে কবে যে সুদিন ফিরবে তার নেই ঠিক। বই বলতে মানুষ যেটুকু যা কিনবে তা লেখাপড়ার বই। আমাকে কতজন যে কতভাবে এ কথা বুঝিয়েছে! করোনাকালে‌ মানুষ ভয়াবহ আর্থিক সমস্যার মধ্যে পড়েছে। আগে ভাত–‌রুটি, তারপর নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস। যেটুকু না হলে নয়। বাকি টাকা রাখা থাকবে সঞ্চয়ে। এর মধ্যে বই কোথা থেকে আসছে?‌ বইয়ের ব্যবসা যে ভরাডুবি— এমনটাও শুনেছি বাববার। শুনেছি, মানুষই বই থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। এমনকী এমন উপদেশ পেয়েছি— ‘‌লেখালিখি ছেড়ে দাও হে। ‌গল্প–‌উপন্যাসের দিন শেষ। এখন কঠিন বাস্তব।’‌
তাই শমীন্দ্র যখন টেলিফোনেই লাফাতে লাফাতে এই খবর দিল, আমার উড়িয়ে দিতে সময় লাগেনি। সে–ও নাছোড়বান্দা। একটু পরেও পাঠাল ফোন নম্বর। আমিও অতি উৎসাহে ফোন করে বসলাম। করলাম, এমন একজনকে যিনি সব ধরনের প্রকাশকের গল্প–‌উপন্যাস বিক্রি করেন। বাংলা, ইংরেজি সব বই। বিক্রি করছেন এক–‌দু’‌বছর নয়, পঞ্চাশ বছর ধরে। রহড়ার বিবেকানন্দ বুক হাউস। লকডাউনের সময় বিপজ্জনক এলাকার বাইরে, সরকার যেভাবে দোকান খুলতে অনুমতি দিয়েছিল, সেই নিয়মবিধি মেনেই দোকানটি খোলেন বিশ্বনাথ মুখার্জি (এলাকায় পরিচিত‌ ‘‌ভুলুবাবু’‌ নামে)‌। সকালে আটটা থেকে বারোটা। এখন আবার দু’‌বেলাই চালু। এই একমাসে তাঁর দোকান থেকে প্রচুর গল্পের বই বিক্রি হয়েছে। ফেলুদা, কাকাবাবু, ঋজুদা, টেনিদা থেকে টিনটিন— হয় স্টক শেষ, নয় স্টক শেষ হওয়ার মুখে। এমনকী খালিদ হুসেইনের কাইট রানারও ফুরিয়েছে। বিক্রি হচ্ছে পাওলো কোহোলোর অ্যাককেমিস্ট। এলাকার বইপ্রেমীরা এসে লিস্ট ধরিয়ে দিচ্ছে। লকডাউনে নাকি আরও আটকে থাকতে হবে। সুতরাং বই চাই, বই চাই এবং বই চাই। বিশ্বনাথবাবু বললেন, এই তো যাদের কাছ থেকে বই নিই গতকাল আট হাজার টাকার গল্পের বইয়ের অর্ডার দিয়েছি। তঁার স্পষ্ট হিসেব, লকডাউনের আগের থেকে এখন গল্প–উপন্যাস বিক্রি অনেক বেশি। চাহিদা অনুযায়ী বই স্টকে ‌থাকলেই গল্প–উপন্যাস বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।’ আমি খুশি গোপন রেখে আমতা আমতা করে বলি, ‘‌সবাই যে বলছে গল্প–উপন্যাসের বই বিক্রিও লাটে উঠেছে।’‌
বিশ্বনাথবাবু যেন টেলিফোনেই বুক ঠুকলেন।
‘‌বাজে কথা, বাজে কথা, এক‌দম বাজে কথা। বই সবাই চাইছে। তবু বই নিয়ে আসতে সমস্যা হচ্ছে। ট্রেন তো বন্ধ। বাসে যদি আনবার অনুমতি পেতাম সুবিধে হত।’ শমীন্দ্রর কাছে হার মেনে এবার ফোনে ধরলাম মিত্র ঘোষের কর্ণধার সবিতেন্দ্রনাথ রায়। ভানুদা। ভানুদা যা বললেন, তাতে ইচ্ছে হল, আমিই ফোন কানে লাফ মারি।
মিত্র ঘোষ বই‌য়ের অর্ডার নিচ্ছে ফেসবুকে পেজে, ই–মেলে, হোয়াটসঅ্যাপে। কর্মী থেকে কর্ণধার, নিজেরাই গাড়িতে কলকাতার মধ্যে বই পৌঁছে দিচ্ছেন। অবশ্যই লকডাউনের যাবতীয় নিয়ম মেনে। কলকাতার বাইরে গল্প–উপন্যাস যাচ্ছে স্পিড পোস্টে। ডিসকাউন্ট তো রয়েছেই, রয়েছে ফ্রি ডেলিভারি। কমিশনের হিসেব বাদ দিয়ে গড়ে বাইশ হাজার টাকার মতো গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ বিক্রি হচ্ছে। ভাবা যায়!‌ ভানুদা বললেন, অনলাইনে বই কেনাকাটা আগেও ছিল, তবে লকডাউনে এক লাফে অনেকটা বেড়ে গেল। আমি নিজেও যাদবপুর, সানডে পার্ক বই ডেলিভারি করতে গিয়েছিলাম। কী ভাল যে লাগল! ব্যবসা নয়, মনে হচ্ছে, মানুষকে বই পড়াতে পথে নেমেছি। এখানে কিন্তু একটু বলে রাখি, ভানুবাবুর বয়স কিন্তু পঁচাশি পেরিয়ে আর একটু বেশি। বললেন, মানুষ গল্প–উপন্যাস পড়তে উদগ্রীব হয়ে রয়েছেন। এই তো আনিসুজ্জামান নিল। এমনও হয়েছে, সকালে অর্ডার দিয়ে দুপুরেই বই হাতে পেয়ে গেছে। এই প্রকাশনার আর এক কর্ণধার ইন্দ্রাণী রায় দিলেন আর এক মন ভাল করা তথ্য।  
‘‌আমাদের বেশি রচনাবলি বিক্রি হচ্ছে। বাড়িতে বসে পেয়ে যাচ্ছেন। সতীনাথ ভাদুড়ী, নারায়ণ গাঙ্গুলি, বিভূতি মুখোপাধ্যায়, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, তারাপদ রায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, বিমল মিত্র, গজেন্দ্রকুমার মিত্রর বই নিয়ে খুঁটিনাটি জিজ্ঞাসা দেখে পাঠক কত গভীরভাবে এখন বই চাইছেন। ঘর সাজাতে নয়। ‌কলকাতার বাইরে বই পাঠাচ্ছি স্পিড পোস্টে। অর্ধেক খরচ আমাদের। আমরা এখন লাভ দেখছি না, বই পড়াতে চাইছি।
পত্রভারতী প্রকাশন নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ পাঠকদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার আয়োজন করেছে বেশ কিছুদিন হয়ে গেল। কর্ণধার ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় বললেন, কলকাতার ভেতরে আমরা নিজেরা, বাইরে স্পিড পোস্ট, ক্যুরিয়ারে বই যাচ্ছে। অর্ডার আসছে হোয়াটসঅ্যাপে, ফোনে, ফেসবুক পেজে। পাঠকদের আগ্রহ দেখে চমকে উঠছি। এমন সব বইও তঁারা চাইছেন যেগুলো আমাদের ক্যাটালগেও এখন আর নেই। কী নিবিষ্ট পাঠক!‌ আমরা গোডাউন থেকে একটা–দুটো কপি খুঁজে বের করে পৌঁছে দিচ্ছি। মানুষ বই কিনতে চান না, একদম ঠিক নয়। এমন একটা ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মধ্যে দঁাড়িয়েও মানুষ দুশো, পঁাচশো, হাজার টাকার বই কিনছেন। লকডাউনের সব নিয়মবিধি মেনেই কলকাতা এবং শহরতলিতে আমরা নিজেদের খরচে বই পৌঁছে দিচ্ছি।  ডিসকাউন্টও দিচ্ছি। হিসেব করলে আমাদের খরচ হয়তো বেশিই হচ্ছে, সে হোক। এই সময়ে পাঠকের হাতে বই হাতে তুলে দেওয়ার মধ্যে আনন্দ রয়েছে, তেমন প্রকাশক হিসেবে কর্তব্যও অনুভব করছি। মানুষ বই পড়তে চাইছেন এটাই তো বিরাট কথা। অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও যাঁরা বই বিক্রির কাজ শুরু করেছেন, সেখানেও পত্রভারতীর গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ যাচ্ছে। আগে অর্ডার পাঠাচ্ছেন মেলে। আমি আশাবাদী। কলকাতা, এবং তার বাইরে পাঠক ছড়িয়ে রয়েছেন। বই পেতে চাইছেন। বর্ধমান, শিলিগুড়িতে যাঁরা আমাদের বই বিক্রি করেন, তাঁরা খুব ভাল কাজ করছেন। বর্ধমানে বইও পাঠাচ্ছি। পাঠকের আগ্রহ নিয়ে একটা উদাহরণ দিই। আমাদের একটা বই ছিল বাংলা সাহিত্যে রোমান্টিসিজম। লেখক গৌরমোহন মুখোপাধ্যায়। সমরেশ মজুমদার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মাস্টারমশাই। স্কটিশ চার্চ কলেজের অধ্যাপক। সেই বই তো আউট অফ প্রিন্ট। এই লকডাউনের মধ্যে এক পাঠক সেই বইয়ের খোঁজ করে বসলেন। আমার গোডাউন হাতড়ে এক কপি বের করলাম। সব ধরনের বইয়ের চাহিদা রয়েছে। দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে কিশোরভারতী সুবর্ণজয়ন্তী সঙ্কলন।
‘‌বি বুকস্‌’‌ ইংরেজিতে গল্প–উপন্যাস প্রকাশ করে। কর্ণধার এষা চট্টোপাধ্যায় বললেন, বেশি নয়, কিন্তু কিছু অর্ডার তো পেয়েছি। মানুষ যে এই লকডাউনে বইমুখী হয়েছে তা হাতেনাতে প্রমাণ পাচ্ছি আমাদের কিন্‌ডেলে। এই ক’‌দিনে অনেকে বই নামিয়েছেন। আড়াইশো ছাপিয়ে গিয়েছে।
এবার দে’‌জ প্রকাশনা। বইপাড়ায় যার বিপণিতে সবসময় ভিড়। সবাইকে হাসিমুখে বই দেওয়া হয়। ‘‌হাসিমুখ’‌ আর ‘‌বই পাবই’‌ এই দুই ইউএসপি নিয়ে ছোটে দে’‌জ–এর বই বিপণি। এখন লকডাউন। তাহলে পাঠকও কি দে’‌জ–এর বই পরিষেবাতে লকডাউন?
একেবারেই নয়। জানালেন প্রকাশনার অন্যতম কর্ণধার শুভঙ্কর দে। সকলের পরিচিত অপু।
বললেন, আমরা ফেসবুক পেজে, ফোনে, মেলে, হোয়াটসঅ্যাপে‌ অর্ডার পাচ্ছি এবং বাড়িতে নিজেরাই বই পৌঁছে দিচ্ছি। কলকাতার মধ্যে। লকডাউনের নিয়ম মেনে। চাহিদা খুব ভাল। আমরা তো শুধু দে’‌জ প্রকাশনার বই দিচ্ছি না, সব ধরনের বই–ই দিচ্ছি। যা আমাদের আছে। এই দুঃসময়ে মানুষ বইও চাইছে। আমাদের এখানে যাঁরা বাংলা বই নিয়ে অনলাইনে ব্যবসা করছেন তাঁরাও বই নিতে আসছেন। বিভিন্ন এলাকায় যাঁরা বইয়ের দোকান খুলতে পেরেছেন তাঁরাও অর্ডার দিচ্ছেন। তবে বই নিয়ে তো কলকাতার বাইরে যেতে পারছি না। যদিও আমরা সিঙ্গুরে আউটলেট খুলেছি, চন্দননগরে খুলেছি, উত্তরপাড়ায় আউটলেট খুলেছি। আরও খুলেছে। সেখান থেকেও মানুষ বই কিনছেন। ওইসব অঞ্চলে যাঁরা বাড়িতে বসে বই নিতে চান তার ব্যবস্থাও করেছি।
আশা করি, পাঠক বুঝতে পেরেছেন, সবটা অন্ধকার নয়। এই গভীর সময়েও ক্ষীণ হলেও আলো রয়েছে। সেই আলোয় মানুষ বই পড়ছে। আমি বইয়ের ব্যবসা নিয়ে লিখতে বসিনি। ব্যবসার কথা শুনলাম, চাহিদার খোঁজ নিতে গিয়ে। যাঁরা বলছেন বাঙালি শুধু বাজারে, রান্নাঘরে আর সুরার দোকানে তাঁরা ঠিক বলেছেন না। সংখ্যায় কম হলেও বাঙালি এই দুঃসময়ে বইয়ের পাশেও।

জনপ্রিয়

Back To Top