আজকাল ওয়েবডেস্ক: লঞ্চ হওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মাথায় আমেরিকার তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা ‘অ্যানথ্রপিক’-এর দুটি সেরা এআই মডেল আচমকা বন্ধ করে দেওয়া হল। মার্কিন সরকারের কড়া নির্দেশের জেরেই এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে সংস্থাটি। ওয়াশিংটনের ওই নির্দেশে জানানো হয়েছে, এই মডেল দুটি শুধু আমেরিকার নাগরিকরাই ব্যবহার করতে পারবেন।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গিয়েছে, গত শুক্রবার দিনভর অ্যানথ্রপিক-কে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল হোয়াইট হাউস। সরকারি কর্তারা চেয়েছিলেন, সংস্থাটি যেন নিজে থেকেই তাদের নতুন এআই মডেল ‘ফেবল’ বাজার থেকে তুলে নেয়। মার্কিন প্রশাসনের ভয় ছিল, এই মডেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা সম্ভব। আর তেমনটা হলে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারত।

কিন্তু অ্যানথ্রপিক সেই অনুরোধ শোনেনি। এর পরেই কড়া পদক্ষেপ করে ট্রাম্প প্রশাসন। চাপানো হয় ‘এক্সপোর্ট কন্ট্রোল’। যার জেরে সাধারণ মানুষের জন্য বাজারে আসার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ‘ফেবল ৫’ এবং ‘মিথোস ৫’ মডেল দুটি পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় অ্যানথ্রপিক।

প্রথমে আপত্তি অ্যামাজনের- 

নতুন মডেল দুটি বাজারে আনার সময় অ্যানথ্রপিক দাবি করেছিল, এগুলি সম্পূর্ণ সুরক্ষিত। কিন্তু লঞ্চের পরেই মার্কিন প্রশাসনের মনে খটকা জাগে। মডেলগুলি আদেও সুরক্ষিত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

উদ্বেগ আরও বাড়ে গত বৃহস্পতিবার। জানা গিয়েছে, বড় অনলাইন বিপণন সংস্থা অ্যামাজনের প্রধান অ্যান্ডি জ্যাসি প্রশাসনকে জানান, এই এআই মডেলের কিছু গলদ তাঁর নজরে এসেছে।

উল্লেখ্য, অ্যানথ্রপিকে বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করেছে অ্যামাজন। সরকারের অনুরোধেই তারা এই মডেলটি পরীক্ষা করে মতামত দিয়েছিল। জানা গিয়েছে, মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই বিতর্ক মার্কিন প্রশাসনের সর্বোচ্চ মহলে পৌঁছে যায়।

পরিস্থিতি সামলাতে তড়িঘড়ি বৈঠকে বসেন মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট, হোয়াইট হাউসের সাইবার ডিরেক্টর শন কেয়ারনক্রস এবং হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলস-সহ শীর্ষ কর্তারা। ঠিক হয়, এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বৈঠক শেষে মার্কিন আধিকারিকরা যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন অ্যানথ্রপিকের প্রধান দারিও আমোদেই-এর সঙ্গে। কিন্তু প্রশাসনের একাংশের দাবি, সেই সময় আমোদেই-কে ফোনে পাওয়া যায়নি। বলা হয়েছিল, তিনি বিশেষ কাজে আছেন।

যদিও প্রশাসনের এই দাবিকে ‘পুরোপুরি মিথ্যা’ বলেছে অ্যানথ্রপিক। সংস্থার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের দাবি, দুপুর বারোটা নাগাদ আমোদেই-এর সঙ্গে প্রথম যোগাযোগ করা হয় এবং তার সোয়া এক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি মার্কিন কর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় যোগ দেন।

মতবিরোধ- 

যোগাযোগ হওয়ার পর মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে তিন দফায় ফোনে কথা বলেন আমোদেই। সেই আলোচনায় স্কট বেসেন্ট এবং শন কেয়ারনক্রসের পাশাপাশি ছিলেন মার্কিন কমার্স সেক্রেটারি হাওয়ার্ড লুটনিকও।

খবর মিলেছে, আমোদেই যুক্তি দেন যে মার্কিন প্রশাসন পুরো বিষয়টিকে ভুল বুঝছে। তাঁর দাবি ছিল, যে ত্রুটির কথা বলা হচ্ছে তা এমন কোনও বড় গলদ নয় যা দিয়ে কেউ অ্যানথ্রপিকের সব নিয়মকানুন এক লপ্তে উড়িয়ে দিতে পারবে।

সরকার নিষেধাজ্ঞা চাপানোর পরেও নিজেদের প্রযুক্তির পাশেই দাঁড়িয়েছে অ্যানথ্রপিক। এক বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, “এখনও পর্যন্ত কেউ এমন কোনও বড় ত্রুটি খুঁজে পাননি, যা দিয়ে এই মডেলের নিরাপত্তা ভেঙে সাইবার অপরাধের মতো ক্ষতি করা সম্ভব।”

পাশাপাশি সংস্থাটি মেনে নিয়েছে যে, এআই প্রযুক্তির দুনিয়ায় সব ধরনের হ্যাকিংয়ের চেষ্টা ১০০ শতাংশ রুখে দেওয়া অসম্ভব। নিজেদের সুরক্ষা ব্যবস্থার প্রশংসা করে তাদের দাবি, “আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এতটাই কড়া যে, অনেক ব্যবহারকারী উল্টে অভিযোগ করেছেন এই নিয়মকানুন বড্ড বেশি কঠোর।”

অনড় হোয়াইট হাউস- 

অ্যানথ্রপিকের এই সমস্ত যুক্তিতে অবশ্য গলেনি হোয়াইট হাউস। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন আধিকারিক জানিয়েছেন, অ্যামাজনের দেওয়া তথ্যগুলি খতিয়ে দেখে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা। তাদেরও মনে হয়েছে, এই মডেলে গলদ রয়েছে।

ফোনে আলোচনা শেষ হতেই ‘ফেবল ৫’ এবং ‘মিথোস ৫’ মডেল দুটির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে ট্রাম্প প্রশাসন।

হোয়াইট হাউসের এক শীর্ষ কর্তার কথায়, “ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওদের আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল। নিষেধাজ্ঞা জারি করা ছাড়া আমাদের আর কোনও উপায় ছিল না। আমরা এটা করতে চাইনি, কিন্তু আমাদের হাত বাঁধা ছিল।”

পরে অ্যানথ্রপিকের তরফে জানানো হয়, দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে জারি করা এই নির্দেশে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে কোনও বিদেশি নাগরিক এই মডেল ব্যবহার করতে পারবেন না। আর এই আইনি নিয়ম মানতে গিয়েই বিশ্বজুড়ে সমস্ত ব্যবহারকারীর জন্য সিস্টেম দুটি রাতারাতি বন্ধ করে দিতে হয়েছে।

‘৯০ মিনিটের’ চরম সময়সীমা-

এদিকে সংস্থার ঘনিষ্ঠ মহলের পাল্টা দাবি, নিষেধাজ্ঞা চাপানোর আগে অ্যানথ্রপিককে একসঙ্গে কাজ করার কোনও সুযোগই দেওয়া হয়নি।

সংস্থার এক ঘনিষ্ঠ সূত্র সংবাদমাধ্যমকে ক্ষোভের সঙ্গে জানান, “হোয়াইট হাউস মডেল দুটি বন্ধ করার জন্য মাত্র ৯০ মিনিটের সময় দিয়েছিল। এমনকী ঠিক কী ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে, তার কোনও বিবরণও দেওয়া হয়নি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনুরোধ করার যে কথা বলা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। স্রেফ ৯০ মিনিটের একটা ডেডলাইন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।”

প্রসঙ্গত, হোয়াইট হাউসের সঙ্গে অ্যানথ্রপিকের সংঘাত এই প্রথম নয়। এর আগে গত ফেব্রুয়ারি মাসেও মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়েছিল এই এআই সংস্থা। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র তৈরি এবং দেশের মানুষের ওপর নজরদারি চালানোর জন্য এআই-এর নিরাপত্তা শিথিল করার দাবি জানিয়েছিল পেন্টাগন। তা মানতে অস্বীকার করায় অ্যানথ্রপিক-কে দেশের জাতীয় সুরক্ষার জন্য বিপজ্জনক বলে ঘোষণা করেছিল মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রক।